দেশের তরুণদের মধ্যে মহাকাশ বিজ্ঞান বিষয়ক শিক্ষার আগ্রহ তৈরি করতে, মহাকাশ গবেষণা যন্ত্রপাতি নিয়ে রকেট টেকনোলজির দক্ষতা বৃদ্ধি, গ্রাউন্ড স্টেশনের বিভিন্ন কার্যক্রম সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে গত ১৯ থেকে ২০ জুলাই দেশে দ্বিতীয়বারের মতো অনুষ্ঠিত হয়েছে দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তম স্পেস ইনোভেশন সামিট। বাংলাদেশ ইনোভেশন ফোরাম এবং নাসা সাইন্টিফিক প্রবলেম সলভার বাংলাদেশ কর্তৃক আয়োজিত এই কার্যক্রমে অংশ নেয় দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে আসা ১৫০০ জন শিক্ষার্থী। দুদিনের আয়োজনে ১৬টি টেকনিক্যাল সেমিনার এবং হাতে কলমে প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য ২টি ওয়ার্কশপের আয়োজন করা হয়। এছাড়াও স্পেস গেমিং কম্পিটিশন, প্রোজেক্ট শোকেসিংসহ আরো অনেক সৃজনশীল কার্যক্রম ছিল এই আয়োজনের অন্যতম আকর্ষণ। আয়োজনটিতে বিশেষ চমক হিসেবে ছিল অ্যাপোলো-১১ চাঁদে ভ্রমণের ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে এক ঘণ্টাব্যাপী বিশেষ আয়োজন।
সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক। বিশেষ অতিথি হিসেবে ছিলেন বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সদস্য এবং বাংলাদেশ কমিউনিকেশন স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেডের পরিচালক প্রফেসর ড. সাজ্জাদ হোসেন। সামিটের উদ্বোধনী সেশনে সভাপতিত্ব করেন আইইউবির ট্রেজারার খন্দকার ইফতেখার হায়দার। এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন স্পেস ইনোভেশন সামিট ১৯-এর চিফ পেট্রন এবং মূল সমন্বয়ক বাংলাদেশ ইনোভেশন ফোরাম ও নাসা সলভ বিডি-এর প্রতিষ্ঠাতা আরিফুল হাসান অপু।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে জুনাইদ আহমেদ পলক বলেন, ‘স্পেস টেকনোলোজি নিয়ে আমাদের দেশের তরুণদের আগ্রহ দেখে আমি মুগ্ধ!’ তিনি আশা প্রকাশ করেন, ‘এ ধরনের আয়োজনের মাধ্যমে বাংলাদেশের তরুণদের মাঝে স্পেস বিষয়ক কাজ করার আগ্রহ তৈরি হবে। যার ফলে আগামীতে বাংলাদেশে আরো বেশি মহাকাশ সম্পর্কিত কার্যক্রম চলবে।’
এছাড়াও তিনি দেশে মহাকাশ গবেষণা ও মহাকাশ নিয়ে কাজ করার জন্য বিশেষায়িত স্পেস ল্যাব স্থাপন করার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। শিশু-কিশোরদের মহাকাশ গবেষণার জন্য ছোট থেকেই আগ্রহী করার জন্য দেশ স্পেস সিটি করার পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ ইনোভেশন ফোরামের প্রতিষ্ঠাতা আরিফুল হাসান অপু। তিনি বলেন, ‘আমরা দেশে মহাকাশ গবেষণা নিয়ে বিস্তর কাজ করতে চাই। সেজন্য আমাদের যথোপযুক্ত ল্যাব দরকার। যেখানে শিক্ষার্থীরা বসে গবেষণা করতে পারবে।’
তিনি প্রধান অতিথির কাছে দাবি জানান, দেশে যুক্তরাষ্ট্রের আদলে একটি স্পেস সিটি তৈরির। যেখানে স্পেস বা মহাকাশ নিয়ে বিস্তর জানার সুযোগ পাবে শিশু-কিশোর-তরুণেরা। যেখান থেকে তারা আগ্রহী হবে।
বক্তব্যে আরিফুল হাসান অপু বলেন, ‘নাসায় এক প্রশিক্ষণে গিয়ে দেখেছি, সেখানে কত ধরনের কাজ করতে হয়। আমরা প্রাথমিকভাবে কথাও বলেছি। তারা আমাদের স্পেস ল্যাব ও স্পেস সিটি তৈরির জন্য সহযোগিতা করতে চেয়েছেন। আমরা চাই সরকার এখন এ বিষয়টিতে এগিয়ে আসুক।’
তাঁর বক্তব্যের প্রেক্ষিতেই প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক বলেন, ‘আমি প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি না, তবে সংকল্প করছি। আমাদের কালিয়াকৈরে বঙ্গবন্ধু হাইটেক সিটিতে বড় জায়গা আছে। আমি কথা বলব মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এবং তার তথ্যপ্রযুক্তি উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়ের সঙ্গে। আপনাদের এই দাবিগুলো তুলে ধরব। যেখানে একটি স্পেস ল্যাব এবং একটি স্পেস সিটি তৈরির। যেখানে শিশু-কিশোর, তরুণ-তরুণীরা গিয়ে সরেজমিনে দেখতে পাবে কিভাবে তারা মহাকাশে যেতে পারে, সেখানে কোন ধরনের রোবট লাগে, কোন ধরনের অ্যাপ্লিকেশনগুলো প্রয়োজন, সেগুলো সম্পর্কে জানতে পারবে।’
প্রথম স্যাটেলাইট পাঠানোর মাইলফলক অতিক্রম করেছে বাংলাদেশ। এরপর যেসব স্যাটেলাইট পাঠানো হবে সেগুলোতে দেশের তরুণ বিজ্ঞানীরা যাতে কাজ করতে পারেন, সে বিষয়ে জোরারোপ করে পলক বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী চান, আমরা যেন দেশ থেকেই স্যাটেলাইট তৈরি করতে পারি। আমাদের তরুণেরাই যেন সেটা করতে পারে, সেজন্য যে ধরনের সহযোগিতা দরকার তা দেওয়ার প্রস্তুতি গ্রহণ করেছি। এই কাজের জন্য যা দরকার, তার মধ্যে আছে এই স্পেস নিয়ে সামিট, যেখান থেকে স্পেস বা মহাকাশ সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যাবে। গবেষণায় উত্সাহ পাওয়া যাবে। দ্বিতীয়ত দরকার একটা ল্যাব সেটআপ। স্পেস ল্যাব। আমরা দেশের ১৫২টি বিশ্ববিদ্যালয়ে একটা করে স্পেশালাইজড ল্যাব স্থাপন করছি। ২০৪১ সালে দেশকে উন্নত দেশের কাতারে নিয়ে যেতে যে জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠনের কথা বলছি, সেখানে তরুণদের ভবিষ্যত্ প্রযুক্তির সঙ্গে খাপ খাওয়াতে হলে গবেষণার বিকল্প নেই।’ বিশেষ অতিথি প্রফেসর ড. সাজ্জাদ হোসেন বলেন, ‘বাংলাদেশ এগিয়ে চলেছে নতুন এক দিগন্তে। এই অগ্রযাত্রা বেগবান রাখতে মহাকাশ বিষয়ক শিক্ষা ছড়িয়ে দিতে হবে সকল পর্যায়ে।’ তিনি বলেন, ‘আগামীতে বাংলাদেশ মহাকাশ শিক্ষায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে।’ আগামী বছর থেকে ছোট পরিসরে হলেও স্পেস ইনোভেশন সামিটের সঙ্গে তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগ কাজ করবে বলে জানান তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক।
আয়োজনটিতে ভেন্যু পার্টনার হিসেবে ছিল ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ এবং সহযোগিতায় স্পেস অ্যান্ড রকেট সেন্টার বাংলাদেশ ও আইইউবিইইই ডিপার্টমেন্ট। লাইভস্ট্রিমিং পার্টনার হিসেবে ছিল লাইভ টু ওয়েব।