ইতিহাস ঐতিহ্যের খড়ম

প্রেমিকাকে বিয়ের প্রস্তাব দেওয়ার সময় কোনো প্রেমিক যদি উপহার হিসেবে খড়ম হাতে হাজির হন—কেমন লাগবে ব্যাপারটা? শুনে অনেকে চমকে গেলেও তরুণ-তরুণীদের মধ্যে এমন ঘটনার চল আছে খড়মের আদিনিবাস নেদারল্যান্ডে। জলাভূমিময় ব-দ্বীপখ্যাত দেশটির কৃষক ও শ্রমিকেরা কর্দমাক্ত জমিতে কাজের সুবিধার জন্য ১২০০ শতকে প্রথম কাঠের তৈরি জুতা ‘ক্লোম্পেন’ ব্যবহার শুরু করেছিলেন। জনপ্রিয় হওয়ায় তা কালক্রমে ছড়িয়ে পড়ে ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্যসহ সারা বিশ্বে। বাংলার খড়মের আদিপুরুষ মূলত সেই ‘ক্লোম্পেন’ই।

ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃ-বিজ্ঞানী এরিক ট্রিঙ্কাউস তুষারযুগের মানুষদের নিয়ে গবেষণা করে দেখিয়েছেন যে, মানুষ জুতা পরতেন খ্রিষ্টপূর্ব প্রায় ৪০ হাজার বছর আগে। তবে পৃথিবীর প্রাচীনতম কাঠের জুতা বা খড়মের প্রথম সন্ধান মিলেছে যুক্তরাষ্ট্রের অরেগন অঙ্গরাজ্যে, যা ছিল ৭-৮ হাজার বছর আগের তৈরি। অনেকের মতে, কাঠের টুকরা দিয়ে তৈরি প্রাচীনতম খড়মটি ছিল ১৩০০ শতকের, যা ব্যবহৃত হয়েছিল নেদার‌ল্যান্ডে। ডাচ কৃষক, কারিগর ও জেলেদের কাছে তখন সাশ্রয়ী ও টেকসই পাদুকা হিসেবে সেগুলোর ছিল দারুণ সমাদর।

তবে শুধু ডাচরাই নন, পশ্চিম থেকে পূর্ব বিশ্বের বহু উন্নত জাতির মধ্যেই খড়মের ব্যবহার দেখা গেছে। ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায়, বাংলায় আজ থেকে ১২০০ বছর আগে খড়মের আগমন ঘটেছিল। ১৩০৩ সালের দিকে সুদূর তুরস্ক থেকে বিখ্যাত সুফি দরবেশ হজরত শাহজালাল (রহ.) যখন সিলেটে পা রাখেন, তখন তার পায়ে ছিল খড়ম। যে খড়মটি আজও সংরক্ষিত আছে তার সমাধিস্থলের পাশে। সেই সময় থেকে বাংলার ভূস্বামী, জমিদার ও সম্ভ্রান্ত পরিবারের লোকজনের মধ্যে খড়মের জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে। 

উপমহাদেশ তথা বাংলায় পাদুকা বা জুতা বলতে তখন কাঠের তৈরি সেই খড়মকেই বোঝানো হতো। অজু করে ঘাট থেকে মসজিদে যেতে কিংবা রাতে শোবার আগে পুকুর থেকে পা ধুয়ে আসতে খড়ম ব্যবহার করা হতো। সম্ভ্রান্ত পরিবারের সদস্যরা তখন খড়মকে আভিজাত্যের প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করতেন। ভারতীয় উপমহাদেশ তথা বাংলার ইতিহাস, ঐতিহ্যের সঙ্গে খড়ম নামটি জড়িয়ে আছে নিবিড়ভাবে। শত শত বছর ধরে বাংলার জমিদারদের কাছে পাদুকা হিসেবে যা ছিল অদ্বিতীয়। 

তথ্যমতে, বর্তমানে যে চামড়া বা ফোম জুতা তৈরিতে ব্যবহৃত হয়, অতীতে তা সহজলভ্য না হলেও কাঠের প্রাচুর্য ছিল সবখানে। কাঠ দিয়ে পাদুকা বা খড়ম তৈরি যেমন সহজ ছিল, তেমনি সাধারণ কারিগর বা কাঠমিস্ত্রিরা অনায়াসেই বানিয়ে ফেলতেন। অনেকের মতে, সত্তরের দশক পর্যন্ত বাংলায় খড়মের ব্যাপক ব্যবহার ছিল। পরবর্তীকালে জুতা বা স্যান্ডেল তৈরির উপকরণ চামড়া, প্লাস্টিক ও ফোম সহজলভ্য হওয়ায় খড়মের চাহিদা পড়তে থাকে। বর্তমানে বাংলাদেশে খড়মের ব্যবহার নেই বললেই চলে। নতুন প্রজন্মের অনেকে তো চেনেনই না, কেউ কেউ আবার নামও শোনেননি খড়মের।

নামকরণ

বাংলায় ‘খড়ম’ শব্দটির উৎপত্তি হিন্দি ‘খড়ৌঙ’ থেকে। সংস্কৃতে খড়ম ‘পাদুকা’ নামে পরিচিত। গঠনশৈলীর দিক থেকে নেদারল্যান্ডে খড়ম ‘ডাচ ক্লগ’ হিসেবে স্বীকৃত। ১৭০০ শতকে ইউরোপে তৈরি যে খড়ম ফ্রান্সের সম্রাট পঞ্চদশ লুই প্রথম ব্যবহার করেছিলেন তার নাম ছিল ‘হাইহিল’। বৃষ্টির দিনে নারীদের ব্যবহারের জন্য ১৮০০ শতকে জাপানে লালফিতা বিশিষ্ট ১৪ সেন্টিমিটার লম্বা যে খড়ম তৈরি হতো সেগুলোর নাম ছিল ‘ওকোবো’। চতুর্দশ থেকে সপ্তদশ শতক পর্যন্ত লেবানিজদের ব্যবহৃত খড়ম ‘কাবকাবস’ নামে পরিচিত ছিল। জাপানে খড়মের নাম ‘গেটা’। আর স্পেনে ‘আলবারকাস’। বিভিন্ন নামে হলেও এসবই আসলে বাংলার খড়মের আদিরূপ।

খড়মের আধুনিকায়ন

প্রাচীন খড়মের আধুনিকায়ন শুরু হয় ৪০০ বছর আগে। একেক সময় একেক ধরনের খড়ম তৈরি করে নতুন নামকরণ যেমন হয়েছে, তেমনি ডিজাইন তথা সৌন্দর্যেও যোগ হয়েছে নতুন মাত্রা। তথ্যমতে, খড়মের প্রথম আধুনিকায়ন শুরু করে ইউরোপীয়রা। ধীরে ধীরে তা পৃথিবীর অন্যসব দেশেও অনুসরণ করা হয়। ভারতবর্ষে খড়মের জনপ্রিয়তা ১৭০০ শতকে এসে দারুণভাবে বেড়ে যায়। নবম শতকে প্রাচীন আফ্রিকার মরিসাসের প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে মানুষ খড়ম ব্যবহার করতেন। সেই খড়মে অনুপ্রাণিত হয়ে উনিশ শতকে এসে ফ্রান্সে বিয়ের পাদুকা হিসেবে খড়মের প্রচলন ঘটে।

বিংশ শতকের মাঝামাঝিতে ফিনল্যান্ডে বৃষ্টি, কাদা ও বরফাচ্ছিত পথ পাড়ি দিতে গাছের ছাল দিয়ে বিশেষ পাদুকা তৈরি করা হতো। পরে তার আধুনিকায়ন করে নরওয়ে, সুইডেন ও রাশিয়া। পঞ্চদশ শতকের শেষ দিকে ইতালিতে নারীদের ব্যবহারের জন্য পাঁচ ইঞ্চি খড়ম তৈরি করা হয়েছিল। বিগত শতকের শেষ দশক থেকেই বাংলাদেশে খড়মের ব্যবহার কমতে শুরু করে। তবে শৌখিন খড়মপ্রেমীদের অনেকে এখনো ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন। ফলে এখনো কিছু বিশেষ দোকানে খড়মের সন্ধান মেলে। যদিও আকার-আকৃতি আর সৌন্দর্যের দিক দিয়ে আমূল বদলে গেছে খড়মের চেহারা। 

নির্মম ইতিহাস

আধুনিকায়নের হাত ধরে খড়ম থেকে আজকের ফ্যাশন দুনিয়ায় জুতার দৃষ্টিকাড়া সৌন্দর্যের যে বিবর্তন তার পেছনে রয়েছে বহু নির্মম ইতিহাস। তথ্যমতে, ইউরোপের কিছু অঞ্চলে পাদুকা ছিল শুধু রাজাদের পরার জন্য। কোনো প্রজা যদি ভুলে কখনো পাদুকা পরতেন রাজার আদেশে তাকে হত্যা পর্যন্ত করা হতো। একই রকম ঘটনা দেখা যায় এশিয়াতেও। রাজা যে পথে যেতেন সে পথে প্রজাদের পাদুকা পায়ে হাঁটা নিষিদ্ধ ছিল। ফ্রান্সের রাজা ষোড়শ লুই প্রথম যে হাইহিল জুতার প্রচলন করেছিলেন তা সর্বসাধারণের জন্য নিষিদ্ধ ছিল। হাইহিলকে কেন্দ্র করেই ফ্রান্সে দফায় দফায় যুদ্ধ হয়েছিল, যাতে বিপুলসংখ্যক মানুষ প্রাণ হারিয়েছিলেন। ফ্রান্সের হাইহিল লন্ডনের রাজপরিবারেও একসময় জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ফলে যুক্তরাজ্যে প্রায় শত বছর ধরে হাইহিল জনসাধারণের জন্য নিষিদ্ধ ছিল।

সাহিত্যে খড়ম

খড়ম পায়ে হাঁটার সময় চটাস চটাস যে শব্দ হয়, তার মধ্যে যেন সব সময় জমিদার বা ভূস্বামীদের অভিজাত্যের গন্ধ পান কবি, সাহিত্যিকরা। সাহিত্যে খড়ম হাজির হয়েছে তাই বহুমুখী অর্থ নিয়ে। যেমন—রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এক ছড়ায় লিখেছেন, ‘পাঁড়েজি তাঁর খড়ম নিয়ে চলেন খটাৎ খটাৎ,/ কোথা থেকে ধোবার গাধা চেঁচিয়ে ওঠে হঠাৎ।’ কবিতায় খড়ম নিয়ে ব্যঙ্গ করেছেন কবি যাদব চৌধুরী। ...খড়ম মেলে ধরমপুরে খ্যাতি জগেজাড়া/ পাকা কাঠের নিখুঁত গড়ন খড়ম মনোহরা। / সেই খড়মে পা সিঁধিয়ে নতুন বামুন খোকা/ হাঁটতে গিয়ে খটাস খটাস চালাক ছেলে বোকা। ’

বাংলার লোকজ সাহিত্যেও খড়ম এসেছে দারুণ ছন্দ নিয়ে। যেমন ‘হরম বিবি খড়ম পায়/ খটটাইয়া হাঁইটা যায়/ হাঁটতে গিয়া হরম বিবি/ ধুম্মুড় কইরা আছাড় খায়/আছাড় খাইয়া হরম বিবি/ ফিরা ফিরা পিছন চায়...’। আরেক ছড়ায় খড়ম নিয়ে লেখা হয়েছে, ‘করম দাদার খড়ম জোড়া/ রাজার বাড়ির টাট্টু ঘোড়া।’ শুধু বাংলা সাহিত্য নয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সাহিত্যেও খড়ম প্রসঙ্গ নানাভাবে এসেছে। জাপানের প্রাচীন মিথ সাহিত্যেও খড়মের ব্যবহার দেখা যায়।