সিরিয়ার ওপর দীর্ঘদিন ধরে আরোপিত কঠোর নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার ঘোষণা দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সোমবার (১ জুলাই) এক নির্বাহী আদেশে তিনি দেশটির কিছু ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের নির্দেশ দিয়েছেন। এর ফলে যুদ্ধবিধ্বস্ত সিরিয়ায় আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ ও পুনর্গঠনের পথ উন্মুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
এই পদক্ষেপ এল সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার ছয় মাস পর। নতুন অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারার নেতৃত্বে দেশটির প্রশাসনিক ও সামাজিক পুনর্গঠনের প্রক্রিয়া শুরুর পটভূমিতেই এই ঘোষণা আসে।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গতকাল সোমবার ট্রাম্পের জারি করা আদেশে বলা হয়েছে, সিরিয়ার উন্নয়ন, সরকার পরিচালনা এবং সামাজিক কাঠামো পুনর্গঠনের জন্য ‘গুরুত্বপূর্ণ’ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হবে। এক বিবৃতিতে এ তথ্য জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ বিভাগ।
এর আগে, ২০১১ সালে সিরিয়ায় গৃহযুদ্ধ শুরু হওয়ার আগেই দেশটির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর আর্থিক নিষেধাজ্ঞা ছিল। সাবেক সরকারের মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এসব দীর্ঘমেয়াদি নিষেধাজ্ঞা সিরিয়ার পুনর্গঠনে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। একই সঙ্গে এসব নিষেধাজ্ঞা আল-আসাদের শাসনামলে সিরিয়ার অর্থনীতিকে প্রায় ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়।
মধ্যপ্রাচ্য সফরের সময় গত মে মাসে ট্রাম্প সিরিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। সোমবার এক বিবৃতিতে ট্রাম্প বলেন, ‘সিরিয়াকে স্থিতিশীল, ঐক্যবদ্ধ এবং নিজ দেশের ভেতরে ও প্রতিবেশীদের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ অবস্থানে দেখতে যুক্তরাষ্ট্র প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। সিরিয়ার মাটি যেন সন্ত্রাসীদের জন্য নিরাপদ আশ্রয় না হয় এবং দেশটির ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। এটাই আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও উন্নয়নের জন্য সহায়ক হবে।’
এ ছাড়া, গত সপ্তাহে ডেমোক্র্যাট দলীয় মার্কিন কংগ্রেস সদস্য ইলহান ওমর এবং রিপাবলিকান আইনপ্রণেতা আনা পলিনা লুনা একটি যৌথ বিল উত্থাপন করেছেন, যাতে সিরিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা আইনিভাবে তুলে নেওয়ার মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি স্বস্তি দেওয়ার প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশে আরও বলা হয়েছে, তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওকে নির্দেশ দিয়েছেন যেন তিনি সিরিয়ার অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারাকে ‘বৈশ্বিক বিশেষ সন্ত্রাসী’ তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করেন। এ ছাড়া আল-শারার নেতৃত্বাধীন আল-নুসরা ফ্রন্টের (বর্তমানে হায়াত তাহরির আল-শাম) নাম ‘বিদেশি সন্ত্রাসী সংগঠনের’ তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার বিষয়টিও পর্যালোচনার নির্দেশ দিয়েছেন ট্রাম্প। উল্লেখ্য, আল-নুসরা ছিল আল-কায়েদার সিরিয়া শাখা। তবে ২০১৬ সালে আল-শারা ওই সংগঠনের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেন।
পরে আল-নুসরা নাম পরিবর্তন করে জাবহাত ফাতেহ আল-শাম রাখে। এরপর আরও কয়েকটি বিদ্রোহী সংগঠনের সঙ্গে মিলে তারা হায়াত তাহরির আল-শাম (এইচটিএস) গঠন করে। উত্তর-পশ্চিম সিরিয়ার ইদলিবে দীর্ঘদিন ধরে বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলে আল-শারা ছিলেন দখলদার নেতা। পরে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাসে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদকে ক্ষমতা থেকে সরানোর অভিযানে নেতৃত্ব দেন তিনি।
গত মে মাসে সৌদি আরবে আল-শারার সঙ্গে বৈঠক করেন ট্রাম্প। সেখানে তিনি সিরিয়ার এই অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্টকে ‘আকর্ষণীয়’ ও ‘দৃঢ়চেতা’ বলে প্রশংসা করেন। আবু মোহাম্মদ আল-জোলানি নামেও পরিচিত আল-শারা সিরিয়ায় সব ধর্ম ও জাতিগত সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণ নিশ্চিতের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তবে সম্প্রতি আল-আসাদের আলাওয়ি সম্প্রদায়ের সদস্যদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী যোদ্ধাদের সহিংসতা ও অপহরণের ঘটনা উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।