কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থীদের আন্তঃসেশন খেলায় জুনিয়র কর্তৃক সিনিয়রকে মারধরের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনার ভিডিও করতে গেলে বিশ্বদ্যিালয়ে কর্মরত তিন সাংবাদিকের ফোন কেড়ে নিয়ে দফায় দফায় তাদের মারধর করা হয়। শনিবার (১২ জুলাই) বিকাল ৫টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ফুটবল মাঠে এ ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনায় হামলাকারীদের শাস্তির দাবি ও নিরাপত্তা চেয়ে প্রক্টর বরাবর লিখিত অভিযোগ জমা দিয়েছেন মারধরের আহত সাংবাদিকরা।
আহত সংবাদিকরা হলেন- ল’ এন্ড ল্যান্ড ম্যানেজমেন্ট বিভাগের বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেস ক্লাবের সদস্য ও ‘আমাদের বার্তা’ ক্যাম্পাস প্রতিনিধি আরিফ বিল্লাহ, একই বিভাগের শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয় রিপোর্টার্স ইউনিটির কোষাধ্যক্ষ ও ‘দৈনিক আজকালের খবর’ ক্যাম্পাস প্রতিনিধি রবিউল আলম ও কমিউনিকেশন এন্ড মাল্টিমিডিয়া জার্নালিজম বিভাগের ‘দৈনিক বার্তা ২৪’ ক্যাম্পাস প্রতিনিধি নূর ই আলম।
অন্যদিকে অভিযুক্ত শিক্ষার্থীরা হলেন- অর্থনীতি বিভাগের ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের নাহিদ হাসান, সাব্বির, আফসানা পারভীন টিনা, মিনহাজ, সৌরভ দত্ত ও পান্না। একই বিভাগের ২০২৩-২৩ শিক্ষাবর্ষের অজিল, সাইফুর, মশিউর রহমান রিয়ন ও হৃদয়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ফুটবল মাঠে অর্থনীতি বিভাগের আন্তঃসেশন ফুটবল খেলা চলাকালীন জুনিয়র শিক্ষার্থী সিনিয়র গায়ে হাত তুলেন। এ নিয়ে দু’পক্ষের মধ্যে মারামারি ঘটনা ঘটলে সাংবাদিক আরিফ বিল্লাহ ভিডিও করা শুরু করেন। এ সময় অভিযুক্ত আফসানা পারভীন টিনা ক্ষিপ্ত হয়ে আরিফের হাত থেকে মোবাইল কেড়ে নেয়। পরে তিনি তার বিভাগের শিক্ষার্থীদের উসকানি দিলে তারা দল বেঁধে এসে আরিফকে এলোপাতাড়ি মারধর করেন। এ সময় ঘটনাস্থলের পাশে অবস্থান করা অন্য সাংবাদিক নূর ই আলম আরিফকে মারধর থেকে বাঁচাতে এবং ভিডিও ধারণ করতে গেলে তাকেও এলোপাতাড়ি মারধর করেন অভিযুক্তরা। এ সময় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কয়েকজন নেতা ঠেকানোর চেষ্টা করলে তাদের সামনেই তাদেরকে মারধর করে। পরে আরেক সাংবাদিক রবিউল আলম ঠেকাতে গেলে ও ঘটনার ভিডিও করতে গেলে তাকেও মারধর করা হয়। এ সময় তারা রবিউলের তলপেটে লাথি মারাসহ এলোপাতাড়ি কিলঘুষি ও চড়-থাপ্পড় মারে।
প্রত্যক্ষদর্শী ইশতিয়াক ফেরদৌস ইমন ইত্তেফাককে বলেন, ‘আমি হট্টগোলের শব্দ শুনে মাঠের দিকে এগিয়ে যাই। গিয়ে দেখি কয়েকজন মিলে একজন সাংবাদিককে মারধর করছে। পাশে থাকা আরেক সাংবাদিক ওই ঘটনার ভিডিও করছিলেন। তাকে ভিডিও বন্ধ করতে বলা হয়, কিন্তু তিনি বন্ধ না করায় একপর্যায়ে তাকেও এসে লাথি মারে একজন।’
মারধরের শিকার আরিফ বিল্লাহ ইত্তেফাককে বলেন, সাংবাদিক হিসেবে পেশাগত দায়িত্ব পালন করছিলাম। এমন সময় আমার ফোন কেড়ে নেওয়া হয় এবং দল বেঁধে মারধর করা হয়। নিঃসন্দেহে এটি গুরুতর অপরাধ। আমরা প্রশাসনের নিকট দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিতের জোর দাবি জানাচ্ছি।
মারধরের শিকার আরেক সাংবাদিক নূর ই আলম বলেন, আমি প্রতিদিনের মতো আজকেও মাঠে ফুটবল খেলতে আসি। এ সময় অর্থনীতি বিভাগের দু’পক্ষের খেলা চলছিল। একপর্যায়ে দু’পক্ষের মধ্যে মারামারি হলে সাংবাদিক আরিফ তথ্য সংগ্রহের জন্য মোবাইলে ভিডিও করতে যায়, এ সময় একজন তার মোবাইল কেড়ে নেয় ও তাকে কয়েকজন শিক্ষার্থী ঘিরে কিল, ঘুষি মারে। তৎক্ষনাৎ আমি মোবাইল দিয়ে ভিডিও ধারণ করতে গেলে তারা আমাকেও মারধর করে। এসময় অর্থনীতি বিভাগের ২০২০-২১ বর্ষের মিনহাজ ও একই ২০২২-২৩ বর্ষের অজিল, সাইফুল, মশিউর রহমান ও হৃদয়সহ ১০/১৫ জন আমাকে কিল, ঘুষি ও ঘাড়ে আঘাত করে। এসময় সমন্বয়ক সুইট ও রব্বানী ভাই হামলা থেকে উদ্ধার করে। সাংবাদিকদের ওপর এ অতর্কিত হামলার সুষ্ঠু তদন্তপূর্বক হামলাকারীদের বিচার ও প্রশাসনের নিকট নিরাপত্তা চাচ্ছি।
ভুক্তভোগী সাংবাদিক রবিউল জানান, আমি বিকাল ৫টার সময় অফিসে অবস্থান করছিলাম। তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ফুটবল মাঠে অর্থনীতি বিভাগের আন্ত:সেশন ফুটবল খেলা চলছিলো। একপর্যায়ে দু’পক্ষের মারামারির ভিডিও করতে গেলে সাংবাদিক আরিফ বিল্লাহ হামলার শিকার হন। বিষয়টি জানতে পেরে সেখানে গেলে দেখি আরিফ বিল্লাহকে তারা ঘিরে রেখেছে। ওই সময় ভিডিও ধারণ করতে গেলে কয়েকজন এসে মোবাইল কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। আমি বলেছিলাম, আমি সাংবাদিক এভাবে আপনারা চার্জ করতে পারেন না। তখন কয়েকজন আমার মোবাইল কেড়ে নেয়। আর বলে- ‘ওরে ধর, ভিডিও থাকলে ডিলিট দে’ বলে চারদিক থেকে এলোপাথারি কিল ঘুষি মারে। বিশেষ করে অর্থনীতি বিভাগের ২০২০-২১ বর্ষের নাহিদ ইসলাম আমার তলপেটে লাথি মারে। তখন আমি মাটিতে পড়ে যাই। এসময় সমন্বয়ক সুইটি, রব্বানী ভাইসহ কয়েকজন আমাকে উদ্ধার করে।
উল্লেখ্য, এর আগে গত ২০ এপ্রিল একটি সংবাদ প্রকাশের জেরে আমাকে দেখে নেওয়ার হুমকিও দিয়েছিলেন নাহিদ। পেশাদারি কাজে বাঁধা প্রদান এবং মারধরের ঘটনায় আমি যথাযথ বিচার এবং নিরাপত্তা নিশ্চিতের জোর দাবি জানাচ্ছি।
এ বিষয়ে অভিযুক্ত নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘আমাদের বিভাগের আন্তঃসেশন খেলা হচ্ছিল। তখন বল আউট হওয়া না হওয়া নিয়ে নিজেদের মধ্যে ঝামেলা হয়। জুনিয়র একজন সরি বলে সমাধান করা হয়। এসময় আমি সাংবাদিক কাউকে মারিনি। পরে তিনি বলেন, ‘আমার গলা ধরছে তখন আমি কি করব।’ এ কথা বলেই তিনি প্রতিবেদকের কল কেটে দেন।
এ বিষয়ে অভিযুক্ত আরেক শিক্ষার্থী আফসানা পারভীন টিনাকে একাধিকবার ফোন দিলেও পাওয়া যায়নি।
মারধরের ঘটনা ‘লজ্জাজনক’ উল্লেখ করে ইবি প্রেস ক্লাবের সভাপতি মুনজুরুল ইসলাম নাহিদ বলেন, সংবাদ সংগ্রহকালে সাংবাদিকের মোবাইল কেড়ে নেওয়া ও মারধর কোনোভাবেই মেনে নেওয়ার মতো নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের আঙ্গিনায় এমন ঘটনা লজ্জাজনক। এটি গণমাধ্যমকর্মীদের পেশাগত কাজে বাধা দেওয়ার পাশাপাশি ফৌজদারি অপরাধও। আমরা প্রশাসনের কাছে এ ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ ও ক্যাম্পাসে মুক্ত গণমাধ্যম চর্চার পরিবেশ নিশ্চিতের দাবি জানাচ্ছি।
হামলায় জড়িতদের বিচারের আওতায় আনার দাবি করে ইবি রিপোটার্স ইউনিটির সভাপতি ফারহানা নওশীন তিতলী বলেন, সাংবাদিকদের এইরকম হীন কর্মকাণ্ড কোনভাবেই যুক্তিযুক্ত নয়। ক্যাম্পাসের সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় রাখতে ও গণমাধ্যম কর্মীদের পেশাগত কাজে নিরাপত্তা দেওয়া প্রশাসনের দায়িত্ব। অবশ্যই সাংবাদিকদের ওপর হামলায় জড়িতদের বিচারের আওতায় আনতে হবে।
অর্থনীতি বিভাগের সভাপতি ড. পার্থ সারথি লস্কর বলেন, আজকে অর্থনীতি বিভাগের আন্তঃশিক্ষাবর্ষ খেলা ছিল। সেখানে ২০১৯-২০,২০২০-২১, ২০২১-২২, ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীদের খেলা ছিল। শুনেছি মারামারি ঘটনা ঘটেছে। তবে সেখানে ঠিক কি হয়েছে জানি না। বিষয়টি নিয়ে বসে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবো।
অভিযোগপত্র পাওয়ার সত্যতা নিশ্চিত করে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. শাহীনুজ্জামান বলেন, অভিযোগপত্র হাতে পেয়েছি। আমরা প্রক্টরিয়াল বডি এ নিয়ে আলোচনায় বসবো। পরবর্তীতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
ঘটনায় জড়িতদের ‘ছাড় না দেওয়ার’ কথা জানিয়ে উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. এম. এয়াকুব আলী ইত্তেফাককে বলেন, ‘সাংবাদিকদের অবমাননা করা উচিত হয়নি। প্রশাসনকে আনুষ্ঠানিকভাবে অবগত করলে তদন্তপূর্বক যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সাংবাদিকদের সঙ্গে এ ধরনের আচরণ ছাড় দেওয়া হবে না। সাংবাদিকদের তাদের পেশাগত দায়িত্ব সম্মানের সাথে পালনের সুযোগ দেওয়া উচিত। এক্ষেত্রে সাংবাদিকদের অধিকার রক্ষায় প্রশাসনেরও সহযোগিতা করা উচিত।