নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের সূচনা কোত্থেকে, কীভাবে শুরু হয়? এটা প্রাথমিকভাবে পরিবার থেকে শুরু হলেও পূর্ণতা পায় আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার ত্রুটিপূর্ণ ব্যবস্থাপনার কারণেই।
নৈতিকতা বা মূল্যবোধের অবক্ষয় বর্তমান সমাজের সবচেয়ে বড় সমস্যা। প্রতিটি মানুষ এটা স্বীকার করলেও মানছেন না সিংহভাগই। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে যদি আলোচনায় আসি; তাহলে আমরা দেখবো পারিবারিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয়সহ যত অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে তার প্রায় সবগুলোই নৈতিক স্খলন ও মূল্যবোধের অবক্ষয়জনিত কারণে হচ্ছে। ভয়াবহ এই অবক্ষয়ের সূচনা বা কারণ নিয়ে আমার ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ ও উপলব্ধি তুলে ধরলাম। পাশাপাশি আমি আমাদের সময়কালের শিক্ষকদের প্রতি আমাদের আচরণ এবং আমাদের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধেয় শিক্ষকদের কিছু আচরণ তুলে ধরলাম।
আমি যখন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলাম আমার প্রধান শিক্ষকের নাম ছিল শ্রদ্ধেয় স্বর্গীয় জয়নাল আবেদীন স্যার, পড়া না পারলে স্যার কানের পাশের চুলের জুলফি ধরে উপরের দিকে টান দিতেন— খুব ব্যথা লাগতো। গণিতের শিক্ষক শ্রদ্ধেয় আব্দুল মালেক স্যার, গণিতে কোথাও ভুল করে ফেললে স্যার টেবিলের উপরে দাঁড় করিয়ে বেত দিয়ে দাঁত কিরমির করে পিঠে বাড়ি দিতেন এবং প্রাথমিকে আমার প্রিয় শিক্ষক ছিল শ্রদ্ধেয় স্বর্গীয় ইউসুফ স্যার, উনি কখনো মারেননি। উনি সবসময় বাদাম, মনেক্কা, বুট ভাজা এসব কিনে খাওয়াতেন এবং উনি নিজেও প্রচুর খেতেন এসব, উনি আমাদের পড়াতেন বাংলা, সমাজ, বিজ্ঞান বিষয়।
আমাদের ধর্ম শিক্ষক ছিল শ্রদ্ধেয় মাওলানা আব্দুর রশিদ স্যার, নামাজে না গেলে কিংবা আচরণে একটু উনিশ-বিশ দেখলেই স্যার কানে ধরাতেন এবং কঠিন শাসনে রাখতেন আমাদের। ওই সময়টাতে আমরা ক্লাসে পড়া না পারলে বেশিরভাগ সময় স্যাররা আমাদেরকে কান ধরিয়ে দাঁড় করিয়ে রাখতেন, কখনো কখনো বেত দিয়ে মারতেন, চোখ লাল করে চোখ রাঙানি দিয়ে ভয় দেখাতেন, কখনো কখনো গুরুতর কোনো অন্যায় করলে বেঞ্চের উপর দাঁড় করিয়ে বেত দিয়ে আঘাত করতেন।
প্রাথমিকে শাসন বা শাস্তি যেরকমটা ছিল মাধ্যমিকেও আমাদের সাথে এর ব্যতিক্রম ঘটেনি, বরং মাধ্যমিকে এর মাত্রা আরও বেড়ে গিয়েছিল। মাধ্যমিকে প্রধান শিক্ষক হিসেবে ছিলেন শ্রদ্ধেয় মহিউদ্দিন স্যার। অসাধারণ এক ব্যক্তিত্বের অধিকারী ছিলেন তিনি, বড় কোনো অন্যায় করলে স্যারের হাত থেকে রেহাই পাওয়ার কোনো উপায় ছিল না, শ্রদ্ধেয় শিক্ষক স্বর্গীয় শ্রী শ্রী বাবু জ্যোতি লাল দে, মানুষটা ছিল অন্যরকম একটা মানুষ— পড়াতেন, মারতেন, আদর করতেন, স্কুলের সময় শেষে উনি সন্ধ্যার পরে কোনো শিক্ষার্থী বাড়িতে পড়াশোনা ঠিকমতো করছে কিনা তাও লক্ষ্য রাখতেন! অনেক অস্বচ্ছল শিক্ষার্থীকে বই কিনে দিতেন, পড়ার খরচটা উনি দিতেন।
শ্রদ্ধেয় শিক্ষক সরদার লোকমান, ভাব গাম্ভীর্যের দিক দিয়ে স্যার ছিল অন্যতম, স্যার সব সময় বলতেন নিজে নিজে চেষ্টা করে শিখো, অধ্যবসায়ী হও, শুধু এটুকুই নয় পড়া না পারলে যে কি জোরে মারতেন… পিঠে দাগ কেটে যেত।
মাধ্যমিকে আমার প্রিয় শিক্ষকদের একজনের নাম হচ্ছে বাবু উত্তম কুমার দে স্যার, সব সময় পান খেয়ে ঠোঁট লাল করে রাখতেন, স্যার ক্লাস সেভেন পর্যন্ত গণিত এবং পরবর্তীতে ক্লাস নাইন এবং টেন পর্যন্ত জীববিজ্ঞান পড়াতেন, মজার বিষয় হচ্ছে স্যার আমাদেরকে ক্লাসে অনেক গল্প শুনাতেন মজার মজার।
আরো বেশ কয়েকজন শিক্ষক আছেন যাদের নাম না বললেই নয়– শ্রদ্ধেয় স্বর্গীয় মাওলানা আবু তাহের স্যার ষষ্ঠ এবং সপ্তম শ্রেণিতে আমাদের ধর্মীয় শিক্ষা পড়াতেন, শ্রদ্ধেয় আব্দুল মালেক স্যার, শ্রদ্ধেয় নাসির স্যার, শ্রদ্ধেয় বাবু হরিলাল দে স্যার, জসীম উদ্দিন স্যার, ক্যারানী স্যার। ওই সময়টাতে অন্যায় করলে, অতিরিক্ত দুষ্টামি করলে শাস্তি পেতেই হত। শিক্ষকরা যখন মারতো লজ্জা পেতাম, কান্না করতাম, মনে আঘাত লাগতো। মাঝেমধ্যে খুব মন খারাপ করে বাসায় গিয়ে নালিশ করতাম— আজকে স্যার আমাকে খুব মেরেছে, তখন আমাদের ফ্যামিলি মেম্বাররা বলতো, মেরেছে তোমার ভালোর জন্যই মেরেছে। অবশ্যই তুমি পড়া পারোনি, তাই মেরেছে, অথবা তুমি দুষ্টুমি করেছ তাই মেরেছে, শিক্ষকরা মারলে কখনো খারাপের জন্য মারেন না। আর এটাই আমরা তখন বিশ্বাস করতাম আর এখনো এটাই বিশ্বাস করি। এই বিশ্বাসটা মনের ভিতরে এতটাই দৃঢ়ভাবে বাসা বেধেছিল, যার জন্য আজ পর্যন্ত কোনদিন কোনো শিক্ষকের চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলতে পারি নাই। তাদের সাথে কোন রকমের বেয়াদবিমূলক আচরণ করিনি। এভাবেই শেষ হয়ে গেল প্রাথমিক এবং মাধ্যমিকের গণ্ডি।
এরপর যখন উচ্চ মাধ্যমিকের জন্য ভোলা সরকারি কলেজে পা রাখলাম উচ্চ মাধ্যমিকের সম্মানিত শিক্ষকদের সাথে তেমন একটা সখ্যতা গড়ে ওঠেনি তবে উচ্চ মাধ্যমিকের দুজন শিক্ষকের কথা না বললেই নয়, একজন হচ্ছে আমাদের বাংলার শিক্ষক শ্রদ্ধেয় ফিরোজ মাহমুদ স্যার, স্যারের কাছে বাংলা প্রাইভেট পড়তাম, তিনি কখনো টাকা নেননি এবং অন্যজন হচ্ছে রাশেদুজ্জামান স্যার, বিশাল ব্যক্তিত্ব এবং শিষ্টাচারের অধিকারী ছিলেন স্যার।
মাধ্যমিকের পরে উচ্চশিক্ষার জন্য যখন বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে পা রাখলাম তখনো আমাদের মনন এবং মানসিকতা শিক্ষকদের প্রতি ওই প্রাথমিক এবং মাধ্যমিকের মতোই ছিল। এই লেখাটা পড়ে হয়তো অনেকেই ভাবতে পারে আমরা বা আমি আধুনিক না, আমরা বা আমি বর্তমান সময় এবং সমাজের সাথে তাল মেলাতে পারিনি, এটাও বলতে পারে আমরা বা আমি পুরনো মেন্টালিটির মানুষ। হ্যাঁ আমরা হয়তো তাই কিন্তু এটা সত্য আমরা বেয়াদবি করতে পারিনি আমাদের শিক্ষকদের সাথে আমাদের গুরুজনদের সাথে কোনদিন। এসবের জন্য যদি আমাদেরকে কেউ সেকেলে বা পুরাতন মানসিকতার মানুষ ভেবে থাকে তাহলে সেটা আমি মনে করব ঠিক আছে, এতেই আমরা গর্ববোধ করি, আমাদের মহান শিক্ষকদের দেয়া শিক্ষার প্রতি এবং নিজেদের নৈতিকতার প্রতি।
আমার গ্রাজুয়েশনের মাঝামাঝি সময়ের দিক একদিন শুনলাম প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর এবং মাধ্যমিক উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর থেকে একটা প্রজ্ঞাপন জারি হল, শ্রেণিকক্ষে শিক্ষকরা বেত নিয়ে প্রবেশ করতে পারবে না, শ্রেণিকক্ষে শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদেরকে চোখ রাঙ্গানি দিতে পারবে না, শ্রেণিকক্ষে শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদেরকে ধমক দিয়ে কথা বলতে পারবে না। এবং পরবর্তী কয়েকদিন এটার পক্ষে নানান রকমের লেখালেখি দেখলাম সুশীল এবং বিজ্ঞজনদের। তারা সকলেই এই বিষয়টাকে সাধুবাদ জানিয়েছে। তবে আমার কাছে বিষয়টা খুব একটা সুন্দর এবং ভবিষ্যতের জন্য ভালো হবে বলে মনে হয়নি তখনই। যাইহোক আমি তখন একজন সাধারণ শিক্ষার্থী, আমার ভালো মনে না হওয়া, খারাপ মনে হওয়াতে কিছুই যাবে-আসবে না এটাও খুব ভালো করে জানতাম।
এরপরের চিত্রটা সারা বাংলাদেশে ঠিক এরকম—
স্কুলের শ্রেণি শিক্ষক শিক্ষার্থীকে ধমক দিয়েছে অভিভাবকরা সেই শ্রেণি শিক্ষকের নামে বিচার মিলিয়েছে। বিচারের নামে সামাজিকভাবে ওই শিক্ষককে হেনস্থা করা হয়েছে। স্কুলের শ্রেণিশিক্ষক কোনো শিক্ষার্থীদের দ্বারা সংঘটিত কোন অন্যায়ের জন্য বকাবকি করেছে, দুষ্টামির জন্য শাস্তি দিয়েছে সেই শ্রেণির শিক্ষকের নামে ওই ছাত্ররা স্কুলে পোস্টারিং করেছে, মিছিল করেছে, স্লোগান দিয়েছে এবং তাকে সামাজিকভাবে হেয় করেছে, এবং সেই শিক্ষার্থীদেরকে সমর্থন যুগিয়েছে অভিভাবকবৃন্দ। ক্লাসে প্রথম সাময়িক দ্বিতীয় সাময়িক এবং বার্ষিক পরীক্ষার ফলাফলে প্রথম স্থান, দ্বিতীয় স্থান এবং দ্বিতীয় স্থান নিয়ে নিয়ে শিক্ষকদেরকে হেনস্থা করা হয়েছে বাংলাদেশের বহু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে, প্রাথমিক এবং মাধ্যমিকের শিক্ষকদেরকে সামাজিকভাবে ছোট করা হয়েছে, তাদের গায়ে হাত দেয়া হয়েছে এবং স্কুলের ম্যানেজিং কমিটির মাধ্যমে বিচার বসিয়ে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে এমন ঘটনাও ঘটেছে এই দেশে।
নৈতিক অবক্ষয়ের জন্য আজ বিপর্যস্ত হচ্ছে মানুষ-পরিবার-সমাজ। অতিগ্রস্ত হচ্ছে হচ্ছেন উন্নত মূল্যবোধে বেড়ে ওঠা কিছু মানুষ। ক্ষতির মুখোমুখি হচ্ছে সাধারণ জনতা। অপর দিকে অর্থনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন, স্বজন কেন্দ্রিক ক্ষমতায়ন, দলান্ধ সুবিধা দান, বাহ্যিক চাকচিক্যের প্রতি টান ইত্যাকার সমস্যা মিলিয়ে আমাদের পরিবার ও সমাজ প্রায় ধ্বংসের মুখোমুখি!
ব্যক্তির যখন নৈতিকতা ও মূল্যবোধের অবক্ষয় শুরু হয়, তখন অবধারিতভাবে সে সংস্কৃতিক বিকলাঙ্গে ও আধ্যাত্মিক দেউলিয়ায় পরিণত হয়! তার কাছ থেকে বিদায় নেয় লজ্জা, মানবিকতা, আদব-আখলাকসহ যাবতীয় সুন্দর আচরণ। সেই ব্যক্তি তখন নিজের অবস্থানটাকেই মূখ্য মনে করে। তার চারপাশ হয়ে যায় কেবল আমিময়।
রাজনৈতিক ছত্রছায়ায়র কারণে নতজানু প্রশাসন, অর্থলোভী কর্মকর্তা, দলীয় প্রভাব, পারিবারিক শক্তি, এলাকা ভিত্তিক লালন-পালন, কোন প্রভাবশালী নেতার দলে ভীড়ে যাওয়া ইত্যাদি কারণে কেউ কেউ আরও আস্কারা পায়। কেউ কেউ হয়ে যায় ত্রাসের অপর নাম। চলতে থাকে পারিবারিক ও সামাজিক অশান্তি। চরম উদ্বেগে থাকে সমাজের সাধারণ মানুষ। আর সেই অবক্ষয় স্থান-কাল-পাত্রভেদে চলতেই আছে আমাদের সমাজে।
এখন বলার বিষয় হচ্ছে এটাই এতক্ষণ আমি যে ঘটনাগুলোর কথা বললাম, যে ঘটনাগুলো ঘটেছে, এই ঘটনাগুলোর সাথে জড়িত কারা? শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং স্কুলের ম্যানেজিং কমিটি এবং আমাদের সমাজের মানুষ। এখন আমি জানতে চাই এই শিক্ষার্থীরা আমাদের কাছ থেকে আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে অভিভাবকদের কাছ থেকে এবং বর্তমান সমাজ থেকে কি শিক্ষা গ্রহণ করল? এবং কতটা শিক্ষা গ্রহণ করল? এবং এদের কাছ থেকে ভবিষ্যৎ সমাজ, ভবিষ্যৎ প্রজন্ম কতটা আশা করবে কিংবা কি আশা করতে পারে?
আমি একটা কথা স্পষ্ট করে বলতে চাই এবং দৃঢ়তার সাথে বলতে চাই, যেদিন থেকে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে বেত উঠে গেছে, শাসন উঠে গেছে এবং শিক্ষকদেরকে প্রাথমিক এবং মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকদের দ্বারা হেনস্থা হতে দেখা গিয়েছে প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটির ধারা শিক্ষকদেরকে প্রাথমিক এবং মাধ্যমিক পর্যায়ে বিভিন্ন রকমের অপমান ও প্রবঞ্চনার শিকার হতে দেখা গিয়েছে, ঠিক তখন থেকেই আমাদের দেশে যে সামাজিক মূল্যবোধ নামে একটা বিষয় ছিল এই বিষয়টির কবর রচনার সূচনা হয়েছে।
এ ভাবে চলতে থাকলে নৈতিকতা, সামাজিকতা, সম্মান, সামাজিক মর্যাদা সামাজিক মানুষ বলতে কোনো কিছুই আর বাকি থাকবে না এই সমাজে।
লেখক : কবি ও গবেষক