যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যৌন অপরাধে অভিযুক্ত জেফ্রি এপস্টিন সংক্রান্ত তদন্তে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে ‘বিশ্বাসযোগ্য’ তথ্য প্রকাশের আহ্বান জানিয়েছেন। হোয়াইট হাউজে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, অ্যাটর্নি জেনারেল পাম বন্ডি যদি কোনো তথ্য বিশ্বাসযোগ্য মনে করেন, তবে তা জনগণের সামনে আনা উচিত। খবর বিবিসির।
ট্রাম্পের এই মন্তব্য এসেছে এমন এক সময়ে, যখন তার নিজের সমর্থকদের ভেতরে এপস্টিন ফাইল নিয়ে ক্ষোভ বাড়ছে। অভিযোগ উঠছে, প্রভাবশালীদের রক্ষায় প্রশাসন এসব নথি গোপন করছে।
এর আগে নির্বাচনী প্রচারে ট্রাম্প এপস্টিন ফাইল প্রকাশের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু সম্প্রতি বিষয়টি আবার সামনে আসে যখন ধনকুবের ইলন মাস্ক সামাজিক মাধ্যমে ট্রাম্পকে উদ্দেশ করে প্রশ্ন তোলেন— কেন এখনো এপস্টিনের গোপন তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। মাস্ক এক পর্যায়ে এপস্টিন ফাইল ফাঁসের হুমকিও দেন।
পাম বন্ডি এক সময় বলেছিলেন, তার ডেস্কেই এপস্টিনের ‘ক্লায়েন্ট তালিকা’ রয়েছে পর্যালোচনার জন্য। কিন্তু পরে তার মুখপাত্র দাবি করেন, তিনি মূলত মামলার অন্যান্য কাগজপত্রের কথা বলেছিলেন। কিছুদিন আগে বন্ডির দপ্তর জানায়, তাদের কাছে এমন কোনও ক্লায়েন্ট লিস্টের অস্তিত্ব নেই। এই বক্তব্য রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়।
এফবিআই ও বিচার বিভাগ এই মাসের শুরুতে একটি স্মারকে জানায়, তারা এপস্টিনের ব্ল্যাকমেইল বা ক্লায়েন্ট তালিকার কোনও প্রমাণ খুঁজে পায়নি। একইসঙ্গে স্মারকে বলা হয়, এপস্টিন আত্মহত্যা করেছেন এবং এ নিয়ে আর কিছু প্রকাশ করা অনুচিত। ৩০০ গিগাবাইটের বেশি তথ্য বিশ্লেষণ করেও তারা নতুন কিছু খুঁজে পায়নি বলে উল্লেখ করা হয়।
এই ঘোষণার পর রিপাবলিকান দলের অভ্যন্তরেও অসন্তোষ বাড়তে থাকে। ট্রাম্পের পুত্রবধূ ও রাজনৈতিক সহযোগী লারা ট্রাম্প বলেন, 'স্বচ্ছতা না থাকলে জনগণের আস্থা হারিয়ে যাবে।' কংগ্রেসের স্পিকার মাইক জনসন এ বিষয়ে অ্যাটর্নি জেনারেলকে ব্যাখ্যা দিতে বলেন, 'সব তথ্য প্রকাশ হোক, জনগণ নিজেরাই বিচার করবে।'
রক্ষণশীল কংগ্রেসওম্যান মারজরি টেলর গ্রিন বলেন, 'আমরা জনগণকে স্বচ্ছতা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছি, সেটাই পালন করতে হবে।' অপর এক কংগ্রেসওম্যান লরেন বোয়েবার্ট বলেন, যদি আরও তথ্য প্রকাশ না করা হয়, তবে আলাদা বিশেষ কৌঁসুলির মাধ্যমে তদন্ত হওয়া উচিত।
তবে রিপাবলিকানদের একটি বড় অংশ ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের প্রতি আস্থা রাখছে। সিনেটর জন থুন এবং কংগ্রেসম্যান জিম জর্ডান বলেছেন, বিষয়টি পুরোপুরি প্রেসিডেন্টের বিবেচনার ওপর নির্ভর করছে।
তবে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নে ট্রাম্প জানান, বন্ডি তাকে কখনো বলেননি যে কোনো ফাইলে তার নাম আছে কিনা। এপস্টিন ইস্যুতে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ট্রাম্প আরও বলেন, 'আমি বুঝি না কেন মানুষ এত আগ্রহ দেখাচ্ছে। এটা খুবই জঘন্য এবং বিরক্তিকর।'
এই মন্তব্যে হতাশ অনেক ‘মেগা’ (Make America Great Again) আন্দোলনের অনুসারী, যারা মনে করেন, প্রভাবশালীদের রক্ষা করতেই এপস্টিন ফাইল চেপে রাখা হচ্ছে।
ডেমোক্র্যাট সদস্যরা কংগ্রেসে ফাইল প্রকাশে ভোটের প্রস্তাব আনলেও তা ব্যর্থ হয়। পাল্টা যুক্তিতে রিপাবলিকানরা বলেন, ডেমোক্র্যাট প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রশাসনও এসব ফাইল প্রকাশ করেনি।
জেফ্রি এপস্টিনের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, তিনি আন্তর্জাতিকভাবে যৌনদাসী চক্র চালাতেন এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিদের অবৈধ যৌন সম্পর্কের জন্য নাবালিকাদের সরবরাহ করতেন। বলা হয়ে থাকে, তার ব্যক্তিগত বিমানে করে এসব অতিথিদের নিয়ে যাওয়া হতো ‘পিডো দ্বীপে’—যেখানে বিলাসবহুল প্রাসাদে এসব কার্যকলাপ চলত।
এপস্টিন কেলেঙ্কারিতে ট্রাম্প, সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিন্টন, বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং, এমনকি সঙ্গীতশিল্পী মাইকেল জ্যাকসনের নামও শোনা যায়—যদিও অধিকাংশ অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি।
লুইজিয়ানার সিনেটর জন কেনেডি বলেন, 'আমেরিকান জনগণ জানতে চায়, এপস্টিন কার জন্য মেয়েদের পাচার করত এবং কেন তাদের বিচার হয়নি।'
তবে, ট্রাম্প প্রশাসন এবং বিচার বিভাগ এখন পর্যন্ত স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ—এমন অভিযোগ থেকেই যাচ্ছে। যতক্ষণ না পুরো ফাইল উন্মুক্ত হয়, ততক্ষণ বিতর্কের আগুনও থামছে না।