এনবিআরে আন্দোলন: শাস্তি পেতে পারেন তিন শতাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী

সরকারি চাকরির শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) আন্দোলনরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ অব্যাহত রেখেছে সরকার। ইতোমধ্যে চারজনকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে এবং ২৩ জনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে আরও অন্তত ৩৪৬ জনের নামের একটি তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে। যাচাই-বাছাই শেষে এদের অনেকের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে নিশ্চিত করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

সরকারি সূত্রে জানা গেছে, আন্দোলনে অংশগ্রহণ, অফিস বন্ধ রাখা, কর্মসূচিতে সক্রিয় থাকা—এসব অভিযোগে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে খসড়া তালিকায় থাকা ৩৪৬ জনের মধ্যে যাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় কাজে ব্যাঘাত সৃষ্টির প্রমাণ পাওয়া যাবে, তাদের বিরুদ্ধেই চূড়ান্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে জানান, তালিকা দীর্ঘ হলেও এটি চূড়ান্ত নয়। সবাইকে শাস্তি দেওয়া হবে এমন নয়। এনবিআরের এক কর্মকর্তা বলেন, সংখ্যা নিয়ে নানা গুঞ্জন চলছে। চূড়ান্ত পদক্ষেপের পরেই সঠিক চিত্র বোঝা যাবে।

এনবিআরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে এই বিষয়ে ব্যাপক আতঙ্ক বিরাজ করছে। অনেকেই দাবি করেছেন, আগেই ক্ষমা চাওয়ার পরও একের পর এক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, যা হতাশাজনক। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্যাপকহারে শাস্তি দিলে এনবিআরের কর্মপরিবেশে অসন্তোষ বাড়বে এবং রাজস্ব আহরণে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

উল্লেখ্য, গত ১২ মে সরকার এনবিআর পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা নামে দুটি বিভাগ গঠনের অধ্যাদেশ জারি করে। এ সিদ্ধান্ত বাতিলের দাবিতে এনবিআরের কর্মকর্তারা আন্দোলনে নামেন। সরকারের পক্ষ থেকে সংশোধনের আশ্বাসের পর কিছুটা বিরতি এলেও চেয়ারম্যানের পদত্যাগ দাবিতে আন্দোলন চলতে থাকে।

পরবর্তীতে ২২ জুন কিছু কর্মকর্তাকে বদলি করে এনবিআর। বদলি আদেশ প্রত্যাখ্যান করে আন্দোলনকারীরা ২৪ জুন এক সংবাদ সম্মেলনে আদেশের কপি ছিঁড়ে ফেলেন। পরে ২৯ জুন ব্যবসায়ীদের মধ্যস্থতায় সরকার আশ্বাস দেয়, কারও বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে না—এরপর আন্দোলন স্থগিত হয়।

তবে এরপরও এনবিআরের তিন সদস্য ও এক কমিশনারকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়। চট্টগ্রাম কাস্টমসের কমিশনারসহ আরও ২১ জনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। একজন কর্মচারীকে এনবিআর চেয়ারম্যানকে নিয়ে কটূক্তি করার অভিযোগে বরখাস্ত করা হয়। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ১৬ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করেছে। আরও অনেকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।

এনবিআরের এক কর্মকর্তা বলেন, 'আমরা সংস্কারের পক্ষেই ছিলাম। কিন্তু যারা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তারাই এখন আমাদের বিরোধীপক্ষ বানিয়ে শাস্তি দিচ্ছেন। এতে রাষ্ট্রের লাভ হবে না।'

একাধিক কর্মকর্তা ও বিশ্লেষক আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, এভাবে শাস্তি চলতে থাকলে রাজস্ব বিভাগের কর্মীদের মনোবল ভেঙে পড়বে। আগেও দেখা গেছে, জুলাই অভ্যুত্থানের পর পুলিশের মনোবল ভেঙে গিয়েছিল, যা দীর্ঘ সময়েও ঠিক হয়নি। এনবিআরও একই ধরনের পরিস্থিতির মুখে পড়তে পারে।

জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক আমলা ফিরোজ মিয়া বলেন, 'গণহারে শাস্তি দিলে কর্মচারীদের মধ্যে ভয় কাজ করবে। এতে কাজের মান কমবে, রাজস্ব আদায়েও ভাটা পড়বে। সরকারের উচিত ছিল কৌশলগতভাবে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া। দমনপীড়ন দিয়ে কর্মীদের মন জয় করা যায় না।'

এ বিষয়ে জানতে চাইলে এনবিআর চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান বলেন, 'এগুলো সরকারের নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত। এ বিষয়ে তাদের সঙ্গে কথা বলাই উত্তম।'