মহাবিপন্ন হওয়ার পথে প্রকৃতির পরিচ্ছন্নতাকর্মী শকুন

ফিরতে হয় আবার রূপসী বাংলার কবির কাছেই। ‘শকুন’ কবিতায় জীবনানন্দ দাশ লিখেছেন, ‘মাঠ থেকে মাঠে-মাঠে সমস্ত দুপুর ভ’রে এশিয়ার আকাশে-আকাশে/ শকুনেরা চরিতেছে...। নাহ, শকুনেরা শুধু এশিয়ার আকাশেই নয়, অন্যান্য মহাদেশেও চরে বেড়ায়। আর শকুন মানেই অমঙ্গল, অশুভ প্রতীক বা মৃত্যুর পূর্বাভাস নয়। বরং আমাদের জীবন্ত বাস্তুসংস্থানের ভরসা। প্রাকৃতিকভাবে মৃত প্রাণীর মাংস খেয়ে শকুন পরিবেশকে রাখে জীবাণুমুক্ত। অথচ প্রকৃতির এই পরিচ্ছন্নতাকর্মী এখন নাম তুলতে বাধ্য হয়েছে মহাবিপন্ন প্রজাতির তালিকায়।

আচ্ছা বলুন তো, শেষ কবে এলাকায় শকুন উড়তে দেখেছিলেন? মনে করতে পারছেন না তো! ঠিক আপনার মতো অভিজ্ঞতা প্রায় সবার। প্রকৃতি সংরক্ষণ বিষয়ক আন্তর্জাতিক ইউনিয়নের (আইইউসিএন) মতে, প্রকৃতি থেকে কোনো প্রাণীর মোট সংখ্যার ৯০ শতাংশই হারিয়ে গেলে সেটা লাল তালিকাভুক্ত প্রাণী। জরিপ বলছে, ১৯৭০ সালে তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তানে শকুনের সংখ্যা ছিল ৫০ হাজারের মতো। স্বাধীনতার পর কমতে কমতে ২০১৪ সালে এসে সেই সংখ্যা দাঁড়ায় মাত্র ২৬০টিতে। সর্বশেষ ২০২৩ সালের জরিপে দেশে ২৪৫টি শকুনের অস্তিত্ব মিলেছে। ফলে আইইউসিএন সংস্থার লাল তালিকাভুক্ত হয়েছে শকুন।

ইতিহাস

প্রায় চার কোটি বছর আগে শকুনের অস্তিত্বের প্রমাণ পাওয়া যায়। মৃতদেহ খাওয়ার মাধ্যমে যারা পরিবেশ-প্রকৃতিকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখত। গোটা আমেরিকা মহাদেশ নতুন পৃথিবীর শকুন আর আফ্রিকা, ইউরেশিয়া ও এশিয়াতে পুরাতন পৃথিবীর শকুন ভিন্ন ভিন্নভাবে বিবর্তিত হলেও বিস্ময়করভাবে তাদের জীবনধারা প্রায় একই রকম। ৩-৪ কোটি বছর আগে পুরাতন গোষ্ঠীর বিবর্তন আগে শুরু হয়েছিল। আর ২ কোটি থেকে আড়াই কোটি বছর আগে থেকে নতুন গোষ্ঠীর অভিযোজন প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। যারা বিশ্ব জুড়েই ছড়িয়ে পড়েছিল।

মিথ

শকুন নিয়ে বিশ্বের বহু দেশের সংস্কৃতিতে ছড়িয়ে রয়েছে নানা মিথ, কুসংস্কার ও প্রতীকী ব্যাখ্যা। প্রাচীন মিশরে শকুন ছিল দেবী ‘নেখব’ বা মায়ের প্রতীক। রাজপরিবারের নারীরা শকুন-ডানা চিত্রবিশিষ্ট মুকুট পরতেন। ইনকা সভ্যতায় শকুনকে আকাশ ও মৃত আত্মার রক্ষক হিসেবে গণ্য করা হতো। প্রাচীন রোমে শকুনকে ‘ঈশ্বরের দূত’ হিসেবেও দেখা হতো। তারা বিশ্বাস করত শকুনের আকাশে ওড়ার ধরন দেখে ভবিষ্যত্ বলা যায়। মধ্যযুগীয় ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যে শকুনকে যুদ্ধ, রোগ মহামারি বা দুর্ভিক্ষের পূর্বাভাস হিসেবে ধরা হতো। বাংলাদেশসহ বিভিন্ন সংস্কৃতিতে শকুন মানেই অমঙ্গল, মৃত্যুর পূর্বাভাস, মৃত্যুদূতও বলা হয়। বিশ্বাস করা হয় যে, শকুন যেখানে ঘোরাফেরা করে, সেখানে কেউ মারা যেতে পারে।

বাংলাদেশে শকুন

দেশে এক সময় ৬-৮ প্রজাতির শকুন দেখা যেত। যার মধ্যে ‘বাংলা শকুন’, ‘কালা শকুন’, ‘রাজ শকুন’, ‘হিমালয়ী গৃধিনী’, ‘সরুঠুঁটি শকুন’ ছিল উল্লেখযোগ্য। ‘রাজ শকুন’ তো পুরোপুরিই বিলুপ্ত। শকুনের দুটি প্রজাতি হিমালয়ান ও ইউরেশীয় মূলত পরিযায়ী। এরা শীত মৌসুমে দেশে আসে। এপ্রিল মাস পর্যন্ত অবস্থান করে। নব্বইয়ের দশকে গ্রামগঞ্জে প্রচুর শকুন দেখা যেত। কোথাও কোনো মরদেহ পড়ে থাকতে দেখলে মুহূর্তেই খবর যেত শকুনের দলের কাছে। মাত্র ২০ মিনিটের মধ্যেই মৃত গবাদি পশুর মাংস সাবাড় করে প্রকৃতিকে পরিষ্কার করে ফেলত।

শকুন কমায় মহাবিপদ

আমেরিকান ইকোনমিক অ্যাসোসিয়েশন সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণার ফলাফলে দেখা গেছে, মৃত পশুর দেহাবশেষ খেয়ে বেঁচে থাকা শকুনের সংখ্যা আশঙ্কাজনকহারে কমে যাওয়ায় ভারতে প্রাণঘাতী ব্যাকটেরিয়া ও নানা সংক্রমণে পাঁচ বছরে প্রায় ৫ লাখ মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। দুই দশকের বেশি আগে থেকে ভারতে অসুস্থ গরুর চিকিত্সায় ব্যাপকহারে সস্তা নন-স্টেরয়েডাল ব্যথানাশক ‘ডাইক্লোফেনাক’ ব্যবহার হতে থাকে। আর এই ওষুধে চিকিত্সা করা পশুর মৃতদেহ খেয়েই নির্বিচার প্রাণ হারাতে থাকে শকুন।

নব্বই দশকের মাঝামাঝি ভারতে শকুন ছিল ৫ কোটির বেশি। পশু চিকিত্সায় ‘ডাইক্লোফেনাক’ ব্যবহার শুরুর পর তা কমতে শুরু করে। কমতে কমতে বর্তমানে প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমেছে শকুনের সংখ্যা। ঠিক একইভাবে বাংলাদেশেও পশু চিকিত্সায় ‘ডাইক্লোফেনাক’ ও ‘কিটোপ্রোফেন’ ওষুধের নির্বিচার ব্যবহার শুরু হলে ব্যাপকহারে শকুন মারা যেতে থাকে। ২০০৯ সালে দেশে শকুন ছিল ১ হাজার ৯৭২টি। মাত্র দেড় দশকের ব্যবধানে প্রায় ১ হাজার ৮০০ শকুন মারা পড়ে মহাবিপন্ন পাখির তকমা পায়।

প্রজাতি

পৃথিবীর নানা প্রান্তে বিভিন্ন পরিবেশে বৈচিত্র্যময়ভাবে ছড়িয়ে থাকা শকুনের প্রজাতির সংখ্যা ১৮টি। তবে বৈশিষ্ট্য ও দক্ষতা বিচারে এসব প্রজাতিকে প্রধানত দুটি ভাগে ভাগ করা হয়। একটি ‘নতুন’ পৃথিবীর শকুন, আরেকটি ‘পুরাতন’। মূলত উত্তর আমেরিকা, কানাডা, মেক্সিকো, দক্ষিণ আমেরিকায় বাস করা শকুন নতুন পৃথিবীর শকুন হিসেবে পরিচিত। আর পুরাতন পৃথিবীর শকুনদের বাস ইউরোপ, এশিয়া আর আফ্রিকার দেশগুলোতে। বাংলাদেশের শকুন পুরাতন পৃথিবীর প্রজাতিভুক্ত। তবে দুই ধরনের শকুনই মৃত প্রাণীর ওপর নির্ভর করে বেঁচে থাকলেও আকার, আকৃতি, গঠন, বংশবৃদ্ধিতে তারা ভিন্ন।

নতুন পৃথিবীর শকুনদের মস্তিষ্কে থাকে সুগঠিত ‘অলফ্যাক্টরি লোব’। যার মাধ্যমে গন্ধ শুঁকেই লক্ষ্যবস্তু খুঁজে বের করায় পারদর্শী। আর পুরাতন পৃথিবীর শকুনেরা গন্ধ শোঁকায় নতুনদের থেকে পিছিয়ে থাকলেও তাদের আছে সুগঠিত ‘অপটিক লোব’। যা উড়ন্ত অবস্থাতেই বহুদূরের লক্ষ্যবস্তু চিহ্নিত করতে সক্ষম হয়। এক সময় বাংলাদেশের সব অঞ্চলে বৃহদাকার পাখিটির বিচরণ ছিল। তবে সময়ের পরিবর্তনে বর্তমানে শুধু সিলেট ও সুন্দরবনের সীমিত পরিসরে কিছু শকুনের দেখা মেলে।

আকৃতি-প্রকৃতি

শকুন বড় ডানাওয়ালা বৃহদাকার পাখি। যারা তীক্ষ দৃষ্টির অধিকারী শিকারি পাখিবিশেষ। এদের মাথা, ঘাড় ও গলায় কোনো পালক নেই। তবে ঠোঁট খুবই ধারালো। এরা ময়লার ভাগাড় থেকে খাবার খুঁজে খায়। অনেক দূর থেকে শকুন মৃতপশুর দেহ দেখতে পায়। এরপর তারা দলবেঁধে সেখানে নেমে এসে দ্রুত সাবাড় করে দেয়। শকুনের পাকস্থলীর জারণ ক্ষমতা অসাধারণ। মৃত পশুর দেহ তো বটেই, এমনকি এসব পশুর হাড় পর্যন্ত এরা হজম করে ফেলতে পারে।

প্রাকৃতিক পরিচ্ছন্নতাকর্মী

শকুন প্রাকৃতিক পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে পরিচিত। কারণ এরা প্রাকৃতিকভাবে মৃত প্রাণীর মাংস খেয়ে পরিবেশকে একেবারেই জীবাণুমুক্ত রাখে। তারা মৃতদেহ পচে যাওয়ার আগেই খেয়ে ফেলে। ফলে পরিবেশে ব্যাকটেরিয়া ও রোগ ছড়াতে পারে না। তাছাড়া শকুন র্যাবিস, অ্যানথ্রাক্স, কলেরা ইত্যাদি রোগ প্রতিরোধে সহায়তা করে থাকে। গবেষণায় দেখা গেছে, একেকটি শকুন বছরে ৩০০ কেজি পর্যন্ত পচনশীল মাংস খেয়ে পরিবেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখে। শকুন না থাকলে পচনশীল মাংস খেয়ে থাকে কুকুর বা ইঁদুরেরা। যারা ভয়ংকর রোগ ছড়িয়ে দিতে পারে।

শকুন রক্ষায় পদক্ষেপ

মহাবিপন্ন প্রজাতির পাখি শকুন রক্ষায় বাংলাদেশ সরকার ও আইইউসিএন কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। বন্যপ্রাণী আইন ২০১২ এ শকুনকে বিপন্ন প্রাণী হিসেবে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। ফলে বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয় ২০১৬-২০২৫ পর্যন্ত দশকব্যাপী শকুন সংরক্ষণ কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। যার অংশ হিসেবে সরকার ২০১০ সালে পশু চিকিত্সায় ডাইক্লোফেনাক ও ২০১৭ সালে দুই এলাকায় কিটোপ্রোফেনের ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছে। পাশাপাশি ২০১৩ সালে জাতীয় শকুন সংরক্ষণ কমিটিও গঠন করা হয়।

পরের বছর ২০১৪ সালে সিলেট, ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিভাগের কিছু অংশ আর খুলনা, বরিশাল ও ঢাকা বিভাগের কিছু অংশ মিলে মোট সাড়ে ৪৭ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকা শকুনের জন্য নিরাপদ ঘোষণা করা হয়েছে। এছাড়া আইইউসিএনের সঙ্গে যৌথ ব্যবস্থাপনায় শকুনের প্রজননকালীন রেমা-কালেঙ্গা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য ও সুন্দরবনে দুটি ফিডিং সেন্টারও স্থাপন করা হয়েছে। তাছাড়া অসুস্থ এবং আহত শকুন উদ্ধার ও পুনর্বাসনের জন্য দিনাজপুরে শকুন উদ্ধার ও পরিচর্যা কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে।