তৃতীয় বিশ্বের দেশসমূহে সমস্যার অন্ত নাই। এই সকল দেশের অবস্থা বাংলা সেই প্রবাদবাক্যের মতো-সর্বাঙ্গে ব্যথা, ঔষধ দিব কোথা? একটি রাষ্ট্রের প্রধানত তিনটি অঙ্গ-নির্বাহী বিভাগ বা সরকার, আইন বিভাগ বা জাতীয় সংসদ এবং বিচার বিভাগ বা আদালত। ইহার পর গণমাধ্যমকে ফোর্থ স্টেট বা চতুর্থ অঙ্গ হিসাবে বিবেচনা করা হয়। উন্নয়নশীল বিশ্বে দেখা যায়, এই চারটি অঙ্গেরই অঙ্গহানি হইয়াছে। রাষ্ট্রীয় ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলির প্রতি মানুষের আস্থা হারাইয়া যাইতেছে। সাধারণ মানুষ সরকার ও পার্লামেন্টের মাধ্যমে তাহার সমস্যার সমাধান না পাইলে বিচার ও গণমাধ্যমের উপর ভরসা করে; কিন্তু এই সকল দেশে শেষ আশ্রয় ও ভরসাটুকুও আজ বিনষ্ট হইয়া পড়িয়াছে বলিলেও অত্যুক্তি হয় না।
তৃতীয় বিশ্বের দেশসমূহে সাধারণ মানুষ এমনকি শিক্ষিত মানুষও আজ কনফিউজড বা বিভ্রান্ত। কোনটা সত্য, কোনটা অসত্য, কোনটা ন্যায় আর কোনটা অন্যায়, কোনটা অপরাধ আর কোনটা অপরাধ নহে-তাহা সঠিকভাবে বুঝিয়া উঠিতে পারিতেছেন না। তাহারা আজ পড়িয়া গিয়াছেন এক গোলক ধাঁধায়। বলা হয়, আইনের চোখে সকলেই সমান; কিন্তু আসলেই কি আইন সকলকে সমান দৃষ্টিতে দেখিতেছে? তাহা ছাড়া দেখা যাইতেছে, আইনের চোখে আজ যাহারা দোষী, অপরাধী ও সাজাপ্রাপ্ত, কালের প্রবাহে ও ক্ষমতার পট পরিবর্তনে তাহারাই হইয়া উঠিতেছেন নির্দোষ ও নিরপরাধী। একসময় যেই বিচারালয়ের বিবেচনায় যাহারা ছিলেন আসামি ও ঘৃণিত, পট পরিবর্তনের পর এক জাদুর ছোঁয়ায় তাহারা হইয়া উঠিতেছেন পূত-পবিত্র ও ফুলের মালায় অভিষিক্ত। যদি পূর্বের বিচারে কেহ অন্যায়ভাবে শাস্তি পাইয়া থাকেন, তাহা হইলে তিনি যে এতদিন কারাভোগ করিলেন, দুর্ভোগ পোহাইলেন, কষ্ট ও ত্যাগ স্বীকার করিলেন, তাহার জন্য কি তাহাকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হইবে না? ছবি বিশ্বাসের 'সবার উপরে' ছবির সেই বিখ্যাত সংলাপের কথা মনে পড়িয়া যায়। মিথ্যা মামলায় দোষী সাব্যস্ত হইয়া ১২ বৎসর জেলের ঘানি টানিবার পর একপর্যায়ে মুক্তি পাইলে সেই অসহায় বৃদ্ধ এজলাসে দাঁড়াইয়া কাতর কণ্ঠে উচ্চারণ করেন- 'দাও ফিরিয়ে দাও, ফিরিয়ে দাও আমার সেই বারোটা বছর!'
বিচারালয়ের মাধ্যমে এই রকম অন্যায়-অবিচার হয় বলিয়া গীতিকার সলিল চৌধুরী লিখিয়াছেন তাহার সেই বিখ্যাত গান- 'বিচারপতি তোমার বিচার করবে যারা/ আজ জেগেছে এই জনতা এই জনতা।।/ তোমার গুলির, তোমার ফাঁসির,/ তোমার কারাগারের পেষণ শুধবে তারা/ ও জনতা এই জনতা এই জনতা।।' প্রকৃতপক্ষে সত্য ও ন্যায় একেক সময় একেক রকম হইতে পারে না। যাহারা ক্ষমতা, অর্থ-সম্পদ, প্রভাব-প্রতিপত্তি বা রক্তচক্ষুর সম্মুখে অথবা একটা টেলিফোনের নিকট আত্মসমর্পণ করেন বা আত্মবিক্রয় করিয়া দেন, তাহারা কি প্রকৃত বিচারক হইতে পারেন? এমন হতাশাজনক পরিস্থিতি বিরাজ করিবার কারণে এই সকল দেশের মানুষ কোনটা বিচার আর কোনটা অবিচার তাহা বুঝিতে পারিতেছেন না। ইহাতে এই প্রশ্নও উঠিতে পারে, তাহা হইলে এই সকল দেশে কি কোনো অন্যায় ও অপরাধ সংঘটিত হয় না? কাহারও উপর বোমা হামলা হইলে, কাহাকে নির্মমভাবে হত্যা করা হইলে, ব্যাংক লোপাট করা হইলে বা দুর্নীতি-অনিয়ম করা হইলে তাহা কি বাস্তবে সংঘটিত হয় না? এই সকল ঘটনায় যিনি বা যাহারা নির্দোষ হইয়া কারাগার হইতে বাহির হইয়া আসেন হয়তো তিনি বা তাহারা নির্দোষ: কিন্তু প্রশ্ন হইল, তাহা হইলে দোষী কাহারা? তাহাদের খুঁজিয়া বাহির করা কি রাষ্ট্রের কাহারও দায়িত্বের মধ্যে পড়ে না?
একসময় গ্রাম-গঞ্জে জিনের আসরের কথা বেশি বেশি শোনা যাইত। আমাদের প্রতীয়মান হয়, তৃতীয় বিশ্বের দেশসমূহে আজ জিনের আসর বসিয়াছে! সেইখানে যত অন্যায়-অপকর্ম হইতেছে সকল জিনে করিতেছে!! আমাদের দৃষ্টিসীমার (ভিজিবল স্পেকট্রাম) সীমাবদ্ধতার কারণে তাহাদের দেখিতে পাই না, ধরিয়া বিচার করিতে পারি না (?) তাই সকল দোষ যেমন নন্দঘোষের, তেমনি সকল দোষ আজ জিনেদের! আমরা আশরাফুল মাখলুকাত বিধায় ধোয়া তুলসী পাতা (?)