ফুটপাতের কেতলিতে এক পরিবারের বেঁচে থাকার লড়াই

জীবনের সবচেয়ে বড় লড়াইটা শুরু হয়েছিল মাত্র ১০ বছর বয়সে—যখন অন্যরা স্কুলব্যাগ কাঁধে নিয়ে শ্রেণিকক্ষে বসত, তখন সাখাওয়াত হোসেন বাবু দাঁড়াতেন বাবার ফুটপাতের চায়ের দোকানে। সময়ের ঘূর্ণিতে স্কুল ফেলে বাবু শিখে নিয়েছিলেন সংসার চালানোর বিদ্যা—এক কাপ চায়ের ঘ্রাণেই যেখানে ভরসা খোঁজে তিনজন মানুষের জীবনের গল্প।

ফেনীর ফুলগাজীর দরবারপুর ইউনিয়নের উত্তর শ্রীপুর গ্রামের মৃত আবুল কালামের একমাত্র ছেলে বাবু। বয়স ২৪। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাবার মৃত্যু হয়। তখন থেকেই পুরো পরিবার—মা ও ২১ বছর বয়সী অবিবাহিত ছোট বোন কারিনা—এই দুইজনকে নিয়ে বাবু আজও লড়ে যাচ্ছেন।

গত জুলাইয়ে ভয়াবহ বন্যায় ভেসে যায় তাদের বসতভিটা। আশ্রয় নিতে হয়েছিল আলী আজম স্কুলের একটি ত্রাণ শিবিরে। চারদিনের মাথায় যখন তারা ফিরে আসে, তখন ভাঙা ঘর, তলিয়ে যাওয়া আসবাব, আর অচেনা জীবনের সামনে দাঁড়ানো এক বিশাল বাস্তবতা—তবুও বাবু হাল ছাড়েননি।

তিনি বলেন, বন্যা সব কেড়ে নিলেও আমি মা-বোনকে না খাইয়ে রাখব না। ফুটপাতে চা বিক্রি করেই হোক, আমরা বাঁচব।

মুন্সীরহাট বাজারের পাশে বাবুর ছোট্ট চা দোকানটা এখন শুধু উপার্জনের নয়, সাহসেরও প্রতীক। ভোর থেকে রাত—চা, বিস্কুট, আর মৌসুমি কিছু ফল বিক্রিই তাদের রোজগারের ভরসা।

বাবু শুধু নিজের নয়, মৃত পিতা আবুল কালামের রেখে যাওয়া সম্মান ও আদর্শও ধরে রাখতে চান। প্রতিবেশীরা বলেন, কালাম ছিলেন বড় মনের মানুষ—অসুস্থ হলেও কাউকে না বলে কাজ করে গেছেন। আর সেই রক্তই বইছে বাবুর শরীরে।

প্রতিবেশী রফিক জানালেন, কালাম ভাই জীবনে একবারও কারও কাছে অভিযোগ করেননি। তাঁর ছেলে বাবু আজও সেই অভ্যাস ধরে রেখেছে। মুখে হাসি, ভেতরে যত দুঃখই থাকুক।”

বাবুর ছোট বোন কারিনা—এক সময়ের স্কুলছাত্রী, এখন জীবনের সঙ্গে বোঝাপড়ার খাতা খুলেছেন। সামাজিক অবস্থান, আর অর্থের অভাবে এখনো তার বিয়ের কথাও হয়নি। কিন্তু কারিনার চোখে এখনো স্বপ্ন আছে—নিজের একটা পরিচয়ের, নিজের মতো করে বাঁচার।

মুন্সীরহাট বাজারের ব্যবসায়ী মেহেদী হাসান বলেন, এই পরিবার শুধু সাহায্য চায় না, তারা চায় সুযোগ। যদি সমাজ একটু সহানুভূতির হাত বাড়ায়, তাহলে হয়তো এই একটি পরিবার বদলে যেতে পারে।

তাদের স্বপ্নের তালিকা খুব বড় নয়—একটি বাসযোগ্য ঘর, মাথার ওপর নিরাপদ ছাদ, মেয়ের বিয়ে আর বাবুর ছোট চায়ের দোকানটা একটু পাকা করে দাঁড় করানো। যদি কেউ পাশে দাঁড়ায়, হয়তো ফুটপাতের কেটলির এই গল্প একদিন হবে সম্মানের, স্বপ্নের, সাহসের।