ডব্লিউএইচও কি বৈশ্বিক স্বাস্থ্যনীতি থেকে বিচ্যুত হচ্ছে? 

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) বহু বছর ধরেই বিশ্বের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে। সংস্থাটি টিকাদান কর্মসূচি, সংক্রামক রোগ প্রতিরোধ, মাতৃ ও শিশু স্বাস্থ্য উন্নয়ন, পুষ্টি ও জরুরি স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাপনায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও সমন্বয় করে থাকে। বাংলাদেশেও এই সংস্থার সহায়তায় স্বাস্থ্যখাতে অনেক ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে।

তবে সাম্প্রতিক সময়ে ডব্লিউএইচও-এর কিছু কর্মকাণ্ড ও অবস্থান নিয়ে নানা আলোচনা হচ্ছে। অনেকেই মনে করছেন, সংস্থাটি এখন বৈজ্ঞানিক তথ্যের চেয়ে কখনও কখনও প্রশাসনিক জটিলতা, রাজনৈতিক প্রভাব এবং কিছু বড় দাতার চাহিদাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। এই বাস্তবতা আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য ভাবনার বিষয় হয়ে উঠেছে।

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্য ও মানবসেবা মন্ত্রী রবার্ট এফ. কেনেডি জুনিয়র ডব্লিউএইচও-কে ‘অকার্যকর ও জটিলতায় বিপর্যস্ত’ বলে উল্লেখ করে দেশটিকে সংস্থা থেকে বেরিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, অন্যান্য দেশগুলোকেও আহ্বান জানিয়েছেন যেন তারা ডব্লিউএইচও-এর উপর অতিরিক্ত নির্ভরতা থেকে সরে এসে নিজেদের স্বাস্থ্যনীতি নিয়ে আরও স্বাধীনভাবে চিন্তা করে। যুক্তরাষ্ট্র তাদের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক শক্তি দিয়ে এধরনের সিদ্ধান্ত নিতে পারে। কিন্তু আমাদের মতো দেশ, যাদের স্বাস্থ্যখাত এখনো উন্নয়নশীল এবং বহুলাংশে আন্তর্জাতিক সহায়তার উপর নির্ভরশীল, তাদের জন্য এধরনের পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব নয়। তবুও, কেনেডির বক্তব্যে এমন কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক উঠে এসেছে, যা উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশেরও গভীরভাবে বিবেচনা করা উচিত। 

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সাম্প্রতিক একগুচ্ছ নীতি, বিশেষ করে ধূমপান নিয়ন্ত্রণে নিরাপদ বিকল্পের বিরুদ্ধে অবস্থান, আজ আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। একদিকে ডব্লিউএইচও ধূমপানকে বৈশ্বিক মহামারি হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে, অপরদিকে তুলনামূলকভাবে কম ক্ষতিকর পণ্য যেমন, ই-সিগারেট, নিকোটিন পাউচ, বা হিটেড টোব্যাকো ডিভাইসের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। অথচ বহু গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে, এই বিকল্পগুলো প্রচলিত সিগারেটের তুলনায় ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ কম ক্ষতিকর, এবং অনেক দেশে ধূমপায়ীদের ধূমপান ছাড়তে উৎসাহিত করতে এই বিকল্পগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। কিন্তু ডব্লিউএইচও এই প্রযুক্তিগুলোকে একই মাপকাঠিতে নিষিদ্ধ করতে চায়, যেমনটি প্রচলিত সিগারেটের বেলায় প্রযোজ্য। এর ফলে ক্ষতি হচ্ছে তিনটি দিক থেকে- জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি বাড়ছে, কালোবাজার বাড়ছে, এবং নীতি-নির্ধারণে বিজ্ঞান নয় বরং দাতাদের প্রভাব বড় হয়ে উঠছে।   

বাংলাদেশ সরকার এখনো ডব্লিউএইচও-এর ওপর আস্থাশীল এবং আনুষ্ঠানিকভাবে সংস্থাটি থেকে সরে যাওয়ার কোনো পরিকল্পনা নেই। এটি বাস্তবসম্মতও বটে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, সংস্থাটির নীতিতে যদি আমাদের দেশের স্বার্থ উপেক্ষিত হয়, তবে আমরা কী শুধুই চুপ করে থাকব? 

জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষকরা আশঙ্কা করছেন, ডব্লিউএইচও যদি শুধুই ধনী দেশের দৃষ্টিভঙ্গি ও কিছু ফাউন্ডেশনের তহবিলের প্রভাব বিবেচনায় নিয়ে নীতি গ্রহণ করে, তাহলে এর ফলে আমাদের দেশের বহু স্বাস্থ্য প্রকল্প হুমকির মুখে পড়বে। এর মধ্যে রয়েছে মা-শিশুর পুষ্টি, প্রজনন স্বাস্থ্য, প্রাথমিক চিকিৎসা, এবং বিশেষ করে তামাক নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত প্রকল্প। বর্তমানে যেসব সহায়তা আমরা পাচ্ছি, তার একটি বড় অংশ ডব্লিউএইচও-এর মাধ্যমেই বাস্তবায়িত হয়। যদি সংস্থাটির অর্থনৈতিক ভিত্তি দুর্বল হয় বা নীতিগত ভারসাম্য হারায়, তাহলে এর প্রভাব সরাসরি আমাদের নাগরিকদের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায় পড়বে।
 
ডব্লিউএইচও এখনো বিশ্বে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি স্বাস্থ্য সংস্থা। কিন্তু সেই গুরুত্ব ধরে রাখতে হলে, তাদের আরও বাস্তবধর্মী হতে হবে। আমাদের এমন একটি সংস্থা দরকার, যারা সিদ্ধান্ত নেবে বৈজ্ঞানিক প্রমাণের ভিত্তিতে, স্বচ্ছতা বজায় রাখবে, এবং উন্নয়নশীল দেশের বাস্তবতা মাথায় রাখবে। বাংলাদেশ, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন ও ভিয়েতনামের মতো দেশগুলো চাইলে একত্রিত হয়ে নীতিমালায় পরিবর্তনের দাবি তুলতে পারে। যেমন, ধূমপানের নিরাপদ বিকল্প নিয়ে তারা চাইলে বৈজ্ঞানিক তথ্যভিত্তিক এবং দেশের প্রেক্ষাপটে নমনীয় নীতির পক্ষে যৌথভাবে দাবিপত্র দিতে পারে।

যদি ডব্লিউএইচও সত্যিই 'বিশ্বের' স্বাস্থ্য সংস্থা হতে চায়, তবে শুধু ধনী দেশ বা বড় দাতাদের কথা শুনলেই চলবে না। তাদের উচিত, দরিদ্র ও উন্নয়নশীল দেশের পরিস্থিতি, সক্ষমতা ও সংস্কৃতিকে সম্মান জানিয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া। না হলে, এই সংস্থার গ্রহণযোগ্যতা দিনে দিনে কমে যাবে।

বাংলাদেশের ডব্লিউএইচও ত্যাগ করার প্রশ্নই আসে না, বরং আমাদের উচিত, চোখ বুঁজে অনুসরণ না করে, যুক্তিভিত্তিক প্রশ্ন তোলা। সময় এসেছে আলোচনায় সক্রিয়ভাবে অংশ নেওয়ার, এবং গঠনমূলক পরিবর্তনের জন্য অন্যান্য দেশের সঙ্গে মিলেই একটি শক্ত অবস্থান নেওয়া।

লেখক: পিএইচডি গবেষক, স্বাস্থ্য বিজ্ঞান, হিরোশিমা বিশ্ববিদ্যালয়, জাপান