কোনো সমাজের প্রকৃত মেরুদণ্ড হলো তার মানবিকতা। বর্তমানে আমাদের চারপাশে একের পর এক ঘটছে এমন ঘটনা, যা সামাজিক মেরুদণ্ডের ভঙ্গুরতার বহিঃপ্রকাশ। আমাদের সমাজে নৈতিক অবক্ষয় ধ্বংসাত্মক রূপ নিয়েছে। মা হলো সন্তানের জন্য সৃষ্টিকর্তার কাছে সন্তানের মুখে হাসি ফোটানোর একমাত্র প্রার্থনাকারী, সবচেয়ে বড়ো আপনজন। অথচ বর্তমান সমাজের চিত্র: সন্তানেরা তার বৃদ্ধ মাকে দায়িত্ব-কর্তব্য এড়িয়ে বৃদ্ধাশ্রমে রেখে আসছে, কেউ বাড়িতে অযত্নে অবহেলায় বাড়ির বাথরুমে, কেউ আলো-বাতাসহীন অন্ধকার কোনো এক অকেজো কক্ষে রেখে দিয়েছে। কেউ জঙ্গলে ফেলে রেখে আসছে। কোনো কোনো মা অসহায় হয়ে আত্মহত্যা করছে। যে মা সন্তানকে তার শরীরের পেটের ভিতরে নিজের নাড়ির সাথে বেঁধে রেখেছিল দশমাস দশদিন পরম যতনে, সেই সন্তান কিনা আজ মাকে বৃদ্ধাশ্রমে রেখে আসে। এ ধরনের অসংখ্য আত্মিক সম্পর্কেও অবক্ষয়ের ভয়ংকর ছবি অবিরত আমার হৃদয়কে ক্ষতবিক্ষত করছে। আমার হৃদয়ের নিঃশব্দ রক্তক্ষরণ থেকেই আজ ‘মা’-কে নিয়ে আমার কলম ধরা।
মাকে নিয়ে লিখতে চাই অনেক কিছু কিন্তু পারি না। মাকে মনে পড়ে আমার ভীষণভাবে, যখন মনে পড়ে মায়ের হৃদয় জুড়ানো ভালোবাসার স্মৃতিমালা তখন খুব কান্না পায়, দুচোখ অশ্রুতে ভরে যায়। শূন্যতার হাহাকারে ভরে উঠে আমার পৃথিবী। ডুকরে কেঁদে উঠে আমার আবেগীমন। মাকে নিয়ে কিছু লেখার ই”ছা আমার অনেক দিনের। মাঝে একটা বই লেখার উদ্দেশ্যে কিছু লিখেছিলামও। কিন্তু ছাপানো হয় নি। প্রত্যেকটি মানুষের জীবনে মায়ের ভূমিকা অপরিসীম। আমি আমার এই জীবনে মাকেই দার্শনিক হিসেবে জানি। মা আমার কাছে আদর্শ পথপ্রদর্শক। মা আমার কাছে পৃথিবীর সেরা শিক্ষক। মাকে ঘিরে রয়েছে আমার অনেক দুঃখ-সুখের স্নেহের স্মৃতি। সবকিছুই বইয়ে লিখব ইনশাল্লাহ। আজ কয়েকটি মাত্র ছোট্ট ঘটনা লিখছি যা পড়ে কোনো পাঠক যদি কিছু জানতে পারে, বুঝতে পারে বা অনুভব করতে পারে দুনিয়াতে মা- কিভাবে সন্তান কে নিয়ে তার ভাবনা-বৃক্ষের আত্মত্যাগের বর্ণিল ডালপালা ছড়িয়ে দেয়। তার আদরের ছোট্ট সোনামণিকে জগৎ বিখ্যাত করে গড়ে তোলার স্বপ্নে বিভোর থাকে।
আমি ছোটো বেলা অনেক খাটো ছিলাম ।আমাদের প্রাইমারি স্কুলে এক থেকে দেড় কি.মি. দূরে ছিল। প্রতিদিন স্কুলের ঘণ্টা (বেল) আমাকেই স্কুল থেকে আমাদের বাড়িতে নিয়ে আসতে হতো আবার বাড়ি থেকে স্কুল নিয়ে যেতে হতো। আমার মা প্রতিদিন অসহায়ের মতো তা তাকিয়ে দেখতেন। আমার মায়ের হৃদয় কষ্টে যেনো ফেটে যেতো। আর স্থির থাকতে পারলেন না; একদিন হঠাৎ আমার মা কাচারি ঘরের পাশে দাঁড়িয়ে প্রধান শিক্ষক মহোদয়কে বলেই ফেললেন স্যার স্কুলের ঐ ঘণ্টা/বেল আমি নিজেই বহন করে স্কুলে নিয়ে যাবো। বেল হাতে আমি পাশেই দাঁড়ানো। প্রধান শিক্ষক হতভম্ব হয়ে পড়লেন, অপ্রস্তুত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন কেন আপা? কী হয়েছে? আমার মায়ের উত্তর ছিল; স্যার ,আমার ছেলেটি তো খাটো। ও-যদি বেল বহন করে ওতো আরো খাটো হয়ে যাবে স্যার। সন্তানের প্রতি মায়ের কী অপরিসীম ¯েœহ, ভাবনা আর উদ্বেগ। কী আশ্চর্য অনুভূতিমাখা দরদ! স্যার- এই কথার কোনো জবাব না দিয়ে আমার হাত থেকে বেল নিয়ে নিলেন। ঐ দিনের পর আমাকে আর বেল নিয়ে যেতে হতো না। যা পরে বহন করতেন আমার এক চাচাত ভাই।
আমি ১৯৯২ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়-এ ভর্তি হই। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পিছনে আমার মায়ের অবদান ও ত্যাগ আমি ভুলতে পারি না। ভর্তি পরীক্ষায় কৃতকার্য হবার পর মৌখিক পরীক্ষার আগে আমি আমাদের গ্রামের বাড়ি পটুয়াখালীতে যাই। বাড়িতে যাবার পর আমাদের নিজস্ব বাগানে কাজ করতে গেলে আসার পথে আমাকে বিষাক্ত সাপে কামড় দেয়। আমার পা ফুলে উঠে। বিষ নামানোর জন্য ওঝা আনা হয়। তারা সফলতার সহিত কাজটা করলেও আমার হাঁটার অবস্থা থাকে না প্রায় সাত (০৭) দিন। ঐ দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ে মৌখিক পরীক্ষা হবে। আমাকে সেখানে উপস্থিত থাকতে হবে। তখন আমাদের এলাকা থেকে ঢাকা আসা-যাওয়ার প্রধান যোগাযোগ মাধ্যম হলো লঞ্চ। পারিবারিক বিবাদের কারণে মামলা মোকদ্দমা থাকায় আমার বাবা-চাচা-ভাই কেউ-ই তখন বাড়িতে থাকে না। আমাদের বাড়ি থেকে লঞ্চ স্টেশনের দূরত্ব প্রায় ২০ কি.মি.। কিন্তু মা কখনও ঢাকা যান-নি এবং ঐ জায়গা চিনতেনও না। হঠাৎ বাসায় তিনি নেই। কাউকে না বলে তিনি ঐ লঞ্চ স্টেশনে চলে যান। তার ছেলের বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা পিছানোর জন্য। অবিশ্বাস্য এক আত্মবিশ্বাস আর গভীর ভাবনায় আ”ছন্ন হয়ে রাস্তা দিয়ে মা অজানা অচেনা পথে ছুটে যান ছেলের স্বার্থে। লঞ্চ ঘাটে গিয়ে বসে থাকেন। যদি পরিচিত কাউকে পাওয়া যায়; এই আশায়। হঠাৎ একজনকে দেখতে পেলেন। মায়ের যেন আনন্দ আর ধরে না। তাকে অনুরোধ করলেন আমার চাচাত ভাই মহসিনকে সংবাদটি জানাতে।
মহসিন যেন আমার- সাপে ছোবল দেয়ার বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে কর্তৃপক্ষকে জানায়। মা’ ফিরে আসেন বাড়িতে তার ভিজে কাপড়-চোপড়সহ। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলে মা বিষয়টি অত্যন্ত তৃপ্তির সঙ্গে বলেন। আমি হাসিহাসি মুখে মাকে বলেছিলাম তোমার কথা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ শুনলে হয়। মহসিন গিয়েছিল এবং পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যানকে বলায় তিনি এক (০১) সপ্তাহ পর আমার মৌখিক পরীক্ষা নিয়েছিলেন এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়-এ ভর্তি হই। আমার ভর্তি সংবাদ শুনে মা আনন্দে উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠেছিলেন। দেখুন ভালোবাসা কাকে বলে, অনুভূতি কাকে বলে, কর্তব্য কাকে বলে কোনো দর্শন দিয়ে ব্যাখ্যা করার যন্ত্র এই পৃথিবীতে অদ্যাবধি আবিষ্কৃত হয়নি। মায়ের ভালোবাসা পরিমাপ করার যন্ত্র কোনো বিজ্ঞানী কোনোদিন বানাতে পারবে না বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস।
আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়লাম। প্রথম শ্রেণি (ফার্স্ট ক্লাস) পেলাম, এমনকি পরবর্তীকালে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করলাম। চাকুরি জীবনে এসে সব কিছুই পেলাম। মা’ কই? কী-পেলো আমার মা? যে আমার জন্য এত কষ্ট করল। উত্তর দিতে পারিনি। এসব কথা ভেবে আমি দিন কাটাই আর কাঁদি যখন তাকে আমার মনে পড়ে, হৃদয়ে রক্ত ক্ষরণ হয়; চূর্ণ-বিচূর্ণ হয় আমার সবকিছু। দিশেহারা হয়ে বলি মা, মাগো তুমি যেথায় আছো ভালো আছো তো?
সব কিছু ছেড়ে ২০০৯ সালে আমার মা পাড়ি দেন না ফেরার দেশে। তখন আমি পার্বত্য চট্টগ্রামে চাকুরি করি। হঠাৎ একদিন আমাকে ফোনে জানাল যে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। প্রথমত গ্যাস্ট্রিক এর ব্যথা অনুমান করা হলো। পরে বরিশাল মেডিকেলে নেয়ার পর তার ব্রেইন স্ট্রোক ধরা পড়ে। নিয়ে আসা হয় ঢাকায়। আমিও ঢাকায় এসে পৌঁছি। প্রথম দেখাতেই মা এমন একটি হাসি দিয়ে আমার সাথে কথা বলেন যেন তার কিছুই হয়নি। তার জীবনের শ্রেষ্ঠ সম্পদ তার বড়ো ছেলে তার পাশে আছে। এটা তার আত্মবিশ্বাসকে অনেক গুণ বাড়িয়ে দিলো। আর কোনো অসুখ তাকে কিছুই করতে পারবে না বলে তার বিশ্বাস। হাসপাতালে ভর্তি হলেন মা। হাসপাতালে আমি তার সাথে থাকি। ডাক্তারগণ বললেন তিনি এখন ঝুঁকিমুক্ত তবে ৭২ ঘণ্টা না গেলে বোঝা যাবে না। ৭২ ঘণ্টাও অন্তিম হলো। সারারাত তার পাশে ছিলাম আমি। রাত্রে একটু ঘুমিয়ে সকালে তার বিছানার পাশে যেতেই, চোখ দুটি খুলে আমাকে প্রথম প্রশ্ন করলেন বাবা নাস্তা করেছো? যাও, নাস্তা খেয়ে আস। আমি ভালো আছি। মিষ্টি হেসে তাকে বললাম তোমার অন্য ছেলেমেয়ে আসার পর আমি যাব। তারা আসল আমি চলে গেলাম। একটু বিশ্রাম নিয়ে আবার আসব। মাঝখানে ৪/৫ ঘণ্টা সময়। এর মধ্যে আমার বোনের মোবাইল কল তাড়াতাড়ি আসুন-‘মা’ নেই। শব্দটা এখনও কানে বাজে। আমি কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়লাম। কী করব; বুঝে উঠতে পারছিলাম না। বেদনা-ভারাক্রান্ত ছিলাম কিছুক্ষণ। আমার চারদিকে যেন নিকষকালো অন্ধকার। সবকিছু ঝাপসা দেখছিলাম। এক মুহূর্তের মধ্যে যেনো আমার পায়ের তলার মাটি সরে গেলো, আমার পৃথিবী যেনো শূন্যতায় ভরে উঠলো। নিঃশ্বাস নিতে পারছিলাম না। বাতাস যেনো ভারী থেকে আরও ভারী হলো। বাসা থেকে কিভাবে আমি হাসপাতালে গিয়েছিলাম আমি জানি না। শুধু মনে হচ্ছিল কি জন্যে- মা যে আমাকে নাস্তা খেয়ে আসতে বললো। মৃত্যুর ৪-৫ ঘণ্টা আগে মা-তার সন্তান খাবার খেয়েছে কি-না ভাবে, পৃথিবীর অন্য কোনো মানুষ ভাবে কি-না আমার জানা নেই, দেখিনি। কী আশ্চর্য! কী অদ্ভুত! রক্তের টান আর ভালোবাসা, স্নেহপূর্ণ এরকম সম্পর্ক আর কী পৃথিবীতে দ্বিতীয়টি হতে পারে!
নিঃস্বার্থ ভালোবাসা, কষ্ট আর ত্যাগের মাধ্যমে আমাকে সুপ্রতিষ্ঠিত করবার প্রয়াসী আমার মহীয়সী মা। মায়ের ভালোবাসা শাশ্বত, চিরনতুন ও অনাবিল। পৃথিবীর সভ্যতার উত্থান-পতনের যত মনোমুগ্ধকর গল্পই বলা হোক না কেন মায়ের জন্য ভালোবাসার গল্পটি সব সময় একই মমতায় মাখা থাকবে। মায়ের হাসি মুখের তুলনা চলেনা; অনুভূতির ভাণ্ডারে জমে থাকে কোনো আনন্দ বা সুখের সঙ্গে। অজস্র দুঃখ-বেদনার ঝড় সামলে রাখা যেন মমতাময়ী মা ভালো থাকুক সব সময়। তাকে সম্মান, ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার কোনো বিকল্প নেই। সকলেই মা’কে ভালোবাসুন, প্লিজ।
লেখক: পিএসসি, পিএইচডি/ অধ্যক্ষ বগুড়া ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল ও কলেজ,বগুড়া