বান্দরবানে কেএনএফের ঘাঁটিতে মিয়ানমারের অত্যাধুনিক অস্ত্র

জোরপূর্বক বাড়ি থেকে কিশোর-তরুণদের ধরে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর উঁচু পাহাড়ের ওপর গহীন জঙ্গলে ট্রেনিং ক্যাম্পে অংশ নিতে বাধ্য করা হয় তাদের। শুরু হয় শারীরিক কসরত। কমব্যাট ট্রেনিং নিতে হয়। আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের কৌশল রপ্ত করে তারা। উঁচু পাহাড়ের ওপর ট্রেনিং ক্যাম্প থেকে কখনো কখনো গুলির শব্দ পাওয়া যায়। দুই পাহাড়ের ভাঁজে বসবাস করা পাহাড়ি-বাঙালিরা বুঝতে পারে যে, ওখানে ট্রেনিং হচ্ছে। এভাবেই ট্রেনিং সম্পন্ন করার পর তারা পরিধান করে জলপাই রঙের অ্যাম্বুস প্রকৃতির ছাপা শার্ট-প্যান্ট, ক্যাপ ও জ্যাকেট। পায়ে থাকে বুট জুতা। তাদেরকে সেনাবাহিনীর আদলে পদবি দেওয়া হয় ক্যাপ্টেন, মেজর, লেফট্যানেন্ট কর্নেল এবং কর্নেল। ট্রেনিং নেওয়া এই দলটির প্রধানের পদবি ব্রিগেডিয়ার জেনারেল। এটি বান্দরবানের পাহাড়ি এলাকা রুমা থানা শহর থেকে ২২ কিলোমিটার দূরে পাহাড়ের ওপরে। কুত্তাঝিরি নামে এই ট্রেনিং ক্যাম্পটি সশস্ত্র সংগঠন কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্টের (কেএনএফ) সামরিক শাখা কুকি-চিন ন্যাশনাল আর্মিদের (কেএনএ)।

গত বছরের নভেম্বর মাসে কুত্তাঝিরি ট্রেনিং ক্যাম্পে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী অভিযান চালিয়ে কেএনএফের বিপুল পরিমাণে অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার করে। 

পাইন্দু ইউনিয়নের পলতাই পাহাড়ের পাদদেশে কুকি জনগোষ্ঠীর পলি প্রাংসা ও মুয়ালপি নামে দুইটি পাড়া রয়েছে। এই দুই পাড়ার মধ্যবর্তী স্থানে গত ২ জুলাই সেনাবাহিনী অভিযান চালায়। সেখানে দুই পক্ষের মধ্যে গোলাগুলিতে দুই জন কেএনএ-এর সদস্য নিহত হন। কুত্তাঝিরি থেকে দুইটি একে-৪৭ রাইফেল (স্টিলবাট ভার্সন), একটি চাইনিজ রাইফেল, বিপুল পরিমাণ চাইনিজ রাইফেলের গুলি, স্নাইপারের গুলি, কার্তুজ, পয়েন্ট টুটু রাইফেলের গুলি উদ্ধার করা হয়। উদ্ধার করা একটি চাইনিজ রাইফেল পুলিশের।

গত বছরের ২ এপ্রিল রুমায় সোনালী ব্যাংকে ডাকাতির সময় ব্যাংকের নিরাপত্তায় নিয়োজিত পুলিশের দুটি এসএমজি, আটটি চায়নিজ রাইফেল এবং আনসারের চারটি শটগান ছিনিয়ে নেয় কেএনএফ। লুট হওয়া অস্ত্রশস্ত্রের মধ্যে একটি এসএমজি ও একটি চাইনিজ রাইফেল উদ্ধার করতে পেরেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। কুত্তাঝিরি থেকে উদ্ধার হওয়া চাইনিজ রাইফেলটি সোনালী ব্যাংকে কেএনএফের ডাকাতির সময় লুট হয়েছিল।

অন্যদিকে, উদ্ধার হওয়া একে-৪৭ রাইফেল স্টিলবার্ট ভার্সনের দুইটি অস্ত্র নিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কাছে নানা প্রশ্নের উদ্রেক হয়েছে। এই দুইটি অস্ত্র মিয়ানমারের সামরিক জান্তা বাহিনীর ব্যবহৃত। অস্ত্রের ম্যাগাজিন ফাইবারের তৈরি। নতুন ভার্সনের এই ধরনের আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার বাংলাদেশের কোনো আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে শুরু হয়নি। কেএনএফের ঘাঁটি থেকে স্নাইপার রাইফেলের গুলি যেসব উদ্ধার করা হয়েছে—সেগুলোও সামরিক জান্তার ব্যবহৃত।

কুকি-চিনের হাতে সামরিক জান্তার অস্ত্র :বান্দরবানের মিয়ানমারের সীমান্তবর্তী তিন উপজেলায় গড়ে উঠেছে শক্তিশালী অস্ত্রভান্ডার। সীমান্তবর্তী পার্বত্য বান্দরবানের তিনটি উপজেলা রুমা, রোয়াংছড়ি ও থানচিতে ধীরে ধীরে শক্ত অবস্থান গড়ে তুলছে সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠী কেএনএফ। মিয়ানমারের সামরিক জান্তা সরকারের কাছ থেকে অত্যাধুনিক অস্ত্র সংগ্রহ করেছে এই গোষ্ঠী। তারা আরাকান আর্মি ও অন্যান্য বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সঙ্গে অস্ত্র বিনিময়, কেনাবেচা এবং হাতবদলের মাধ্যমে নিজেদের অস্ত্রভান্ডার সমৃদ্ধ করছে। কেএনএফের কাছে এম-২২, এম-১৬ এবং একে-৪৭ রাইফেল স্টিলবাট ভার্সনের অস্ত্রের মজুত রয়েছে।

এমনকি স্নাইপারের গুলি উদ্ধার নিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ধারণা করছে, তাদের কাছে স্নাইপার রাইফেল রয়েছে। ইতিমধ্যে তারা আরাকান আর্মিদের কাছ থেকে এ ধরনের আগ্নেয়াস্ত্র সংগ্রহ করেছে বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর স্থানীয় শীর্ষ কর্মকর্তারা ধারণা করছেন। একে-৪৭ রাইফেল, গ্রেনেড, রকেট লঞ্চার, লাইট মেশিনগান, রকেট প্রপেলড গ্রেনেড, কমিউনিকেশন ডিভাইস ও নাইট ভিশন প্রযুক্তির অস্ত্রের একটি বড় অংশ মিয়ানমারের চিন (শিন) রাজ্য, কাচিন, রাখাইন ও সাগাইং অঞ্চলে সামরিক জান্তার ঘাঁটি থেকে আরাকান আর্মিদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। আরাকান আর্মিদের কাছ থেকে কেএনএ এসব অস্ত্র সংগ্রহ করছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, মিয়ানমারের চিন ও রাখাইন রাজ্যের সংঘাতের মধ্য দিয়ে কুকি-চিন ও আরাকান আর্মি বহুবার জান্তা বাহিনীর অস্ত্রাগার দখলে নিয়েছে। এই অস্ত্রের একটি অংশ পরে সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে পাচার হয়। কুকি-চিনরা মূলত আরাকান আর্মির সঙ্গে মিত্র হিসেবে কাজ করে এবং অস্ত্র বিনিময়, প্রশিক্ষণ ও গোয়েন্দা তথ্য ভাগাভাগি করে।

সীমান্তবর্তী তিন উপজেলা কেএনএফের নিয়ন্ত্রণে :রুমা, রোয়াংছড়ি ও থানচিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বিশেষ করে সেনাবাহিনী গত তিন বছরে কেএনএ-এর অন্তত ১০টি ঘাঁটি অভিযান চালিয়ে দখল করে নিয়েছে। দুর্গম পাহাড়ের ঢালে কেএনএ একাধিক সামরিক পরিখা খনন করে অবস্থান নেয়। পাহাড়ে ঘন জঙ্গলের কারণে বাইরে থেকে বোঝারও উপায় নাই।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, রোয়াংছড়ি উপজেলা বর্তমানে কুকি-চিনদের একটি গুরুত্বপূর্ণ ট্রানজিট পয়েন্ট। মিজোরাম সীমান্ত থেকে অস্ত্র এনে এই এলাকার মাধ্যমে রুমা ও থানচিতে পাঠানো হয়। রাতের আঁধারে হেঁটে বা মোটরসাইকেলে করে অস্ত্রের চালান নেফিউ পাড়া, বাকলাই, তাজিংডং, কেওকারাডং, বগালেক হয়ে রুমার বিভিন্ন পাহাড়ে কেএনএয়ের ঘাঁটিতে পৌঁছে যায়। এলাকাবাসীর অভিযোগ, কিছু স্থানীয় সহযোগী এই কাজে সক্রিয়ভাবে সহায়তা করছে।

থানচি উপজেলার গহীন বনে এবং বাঙালি জনবসতি থেকে দূরের এলাকাগুলোতে গড়ে তোলা হয়েছে নিরাপদ অস্ত্র মজুতকেন্দ্র। বিশেষ করে রেমাক্রি, ডিম পাহাড়, তিন্দুর বাজার, নাফাখুম, ছোট মোদক, বড় মোদকসহ মাইলের পর মাইল জুড়ে পাহাড়ে পাহাড়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। এসব স্থানে আরাকান আর্মিদের শক্তিশালী ঘাঁটি রয়েছে। থানচি থেকে নীলগিরি, চিম্বুক, ওয়াই জংশন হয়ে আরাকান আর্মিদের কাছে থেকে অস্ত্রের চালান রুমাতে কেএনএয়ের ঘাঁটিতে চলে আসে।

বান্দরবান জেলার বান্দরবান সদর, রোয়াংছড়ি, থানচি, রুমা, আলী কদম, লামা, আলী কদম এবং রাঙামাটির জুড়াছড়ি, বরকল, বিলাইছড়ি এই ৯টি উপজেলায় কেএনএফের ঘাঁটি রয়েছে। পাহাড়ি ও দুর্গম এলাকা হওয়া সত্ত্বেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী টানা অভিযান চালিয়ে সম্প্রতি কেএনএফের অনেক ঘাঁটি উচ্ছেদ করেছে।