প্রতিহিংসা, ক্ষমা ও সভ্যতার পরিসীমা

পৃথিবীটি যেন এক অন্তহীন প্রতিহিংসার খেলাঘর। ব্যক্তির হৃদয় হইতে রাষ্ট্রের প্রান্তর পর্যন্ত যেই স্থানে অপমান, বঞ্চনা বা সংঘর্ষের বীজ রোপিত হয়, সেইখানেই ঘৃণার অঙ্কুর গজাইয়া উঠে। সেই ঘৃণা যখন প্রতিহিংসার জল পাইয়া সজীব হয়, তখন তাহা ক্রমশ এক বিষবৃক্ষে পরিণত হয়, যাহা ছায়া দেয় না, দেয় বিষ। সেই বিষ কেবল বর্তমানকেই নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মকেও আক্রান্ত করে।

ইহা কেবল ভাববাদ নয়-ইতিহাস এই সত্যেরই বারংবার প্রমাণ রাখিয়াছে। দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের মহানায়ক নেলসন ম্যান্ডেলা যখন ক্ষমতায় আসেন, তখন তাহার হাতে ছিল প্রতিশোধ লইবার পূর্ণ রাজনৈতিক সামর্থ্য। অথচ তিনি সেই পথ ত্যাগ করিয়া গঠন করেন 'ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিশেন কমিশন', যাহার উদ্দেশ্য ছিল অপরাধের বিচার নহে, বরং সত্য প্রকাশ ও মানবিক পুনর্মিলনের মধ্য দিয়া এক নূতন রাষ্ট্র নির্মাণ। চার দশকের বর্ণবৈষম্য ও দমনপীড়নের পরও তিনি প্রতিপক্ষের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করেন নাই। বরং বলিয়াছিলেন-'যদি আমি জেল হইতে বাহির হইবার সময় আমার হৃদয়ে ঘৃণা বহন করি, তাহা হইলে আমি প্রকৃতপক্ষে আজীবন বন্দিই থাকিব।' তিনি মনে করিতেন, প্রতিহিংসা পোষণ মানে নিজের হৃদয়েই বিষ ঢালিয়া রাখিবার শামিল। তাহার সেই উদার নৈতিকতার ফলেই দক্ষিণ আফ্রিকা এক গৃহযুদ্ধের দুঃস্বপ্ন হইতে রক্ষা পায়।

প্রতিহিংসা কখনো কেবল প্রতিপক্ষকেই আঘাত করে না; তাহা আঘাত করে সংহতি, সহমর্মিতা এবং সভ্যতার আদর্শকেও। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর বিশ্বের দুই বিপরীত দৃষ্টান্ত স্মরণযোগ্য। জাপানের উপর মার্কিন বোমাবর্ষণের পর তাহাদের প্রতি প্রতিহিংসামূলক শাস্তির পরিবর্তে পুনর্গঠনের উদ্যোগ লওয়া হয় মার্কিন 'মার্শাল প্ল্যান'-এর অনুরূপ এক কৌশলের মাধ্যমে। আজ সেই জাপান অর্থনীতি, প্রযুক্তি ও মানব উন্নয়নের ক্ষেত্রেই এক উদাহরণ। অন্যদিকে, প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তর জার্মানির উপর চাপানো কঠোর শর্ত ও তীব্র হেনস্তার মনোভাব পরবর্তী সময়েই নাৎসিবাদের পুনর্জাগরণ এবং আরেকটি মহাযুদ্ধের কারণ হইয়া দাঁড়ায়।

এই দুই উদাহরণেই আমরা বুঝিতে পারি-প্রতিহিংসা শান্তি আনে না; বরং নূতন অশান্তির ভিত্তি গড়িয়া তোলে। সমাজ বা রাষ্ট্র যখন প্রতিহিংসাকে নীতির পর্যায়ে লইয়া আসে, তখন মানবিকতা রহিত হয়, আইনের প্রতি আস্থা বিলুপ্ত হয়, এবং আত্মবিনাশের পথ প্রশস্ত হয়। আমরা যদি আরো গভীরে নিরীক্ষা করি, তাহা হইলে দেখিতে পাই-প্রতিহিংসা ব্যক্তিজীবনেও একইরূপ ক্ষতিকর। মনোবিজ্ঞানের ভাষায়, দীর্ঘদিন ধরিয়া প্রতিশোধপিপাসা পোষণ মানসিক স্বাস্থ্যকে দুর্বল করে; উদ্বেগ, বিষণ্ণতা এবং আত্মবিচ্ছিন্নতার জন্ম দেয়। এই ব্যাপারে দার্শনিক ফ্রান্সিস বেকনের কথা স্মরণযোগ্য। তিনি বলিয়াছেন, যেই ব্যক্তি প্রতিহিংসার চিন্তা লালন করে, সে নিজেই নিজের ক্ষতকে খোচাইয়া আরো গভীর করিয়া তোলে। ব্যক্তি হইতে রাষ্ট্র, সর্বক্ষেত্রেই ক্ষমা ও সংলাপের চর্চাই শান্তির মূল চাবিকাঠি।

ইহার বিপরীতে প্রশ্ন উঠিতে পারে-সমাজ কি অপরাধীর বিচার করিবে না? নিশ্চয়ই করিবে, তবে তাহা হইবে ন্যায় ও প্রমাণের ভিত্তিতে, প্রতিহিংসার আবেগে নহে। আইন যদি প্রতিহিংসার হাতিয়ার হয়, তাহা হইলে সমাজ ন্যায়বিচারের মর্যাদা হারায়। ক্ষমতা যদি ঘৃণার ভিত্তিতে ব্যবহৃত হয়, তাহা হইলে তাহা শাসন নহে, প্রতিহিংসার অভিনয়মাত্র। অতএব, প্রতিহিংসা নহে-প্রয়োজন সাহসিক সংলাপ, ঐক্যের আহ্বান, এবং ন্যায়বিচারভিত্তিক ব্যবস্থা। আমরা যদি সত্যই একটি ন্যায়ভিত্তিক, শান্তিপূর্ণ ও সংহত সমাজ গড়িতে চাই, তাহা হইলে প্রতিহিংসার বিষবৃক্ষের শিকড়ে আর জলসিঞ্চন করা চলিবে না। তাহার পরিবর্তে গড়িতে হইবে সহমর্মিতা, দয়া এবং সম্প্রীতির এক সবুজ বাগান-যেইখানে আগামীর শিশুরা খেলিতে পারিবে, ভয় নহে; সহযোগিতা-সহমর্মিতা ও ভালোবাসার কুসুমোদ্যানে। অতএব, প্রতিহিংসা হইতে পরিত্রাণ পাওয়াই আধুনিক সভ্যতা ও সমৃদ্ধির পথ। ইহা কেবল নৈতিক পদক্ষেপ নহে; বাস্তব কৌশলও বটে।