অগ্রন্থিত

যুবতির কাহিনি

একুশ শতকের প্রতি ‘বিশেষ’ সম্মান প্রদর্শনের জন্যে কিনা জানি না, ২০০০ সাল থেকে অভিধান-বাজারে সর্ববিধ বানান-রীতি পাইকারী হারে বিক্রি হচ্ছে বড় দুটি শহরে এবং খুচরো রেটে ফেরি হচ্ছে পাড়ায় পাড়ায়। প্রভাবটি সমসাময়িক অর্থশাস্ত্রের হলেও, উদারীকরণে টেক্কা দিয়েছে শব্দশাস্ত্র। যে-কারণে ‘বাঙলা ভাষার ব্যাকরণ’-এর লেখক জ্যোতিভূষণ চাকী ‘আকাদেমি বানান অভিধান’ সংকলকদের বানানে জ্যোতিভূষণ ‘চাকি’ হয়ে গিয়েছেন। চশমা নেড়েচেড়ে সন তারিখ দেখে বুঝলাম যে আমার পরম শ্রদ্ধেয় লেখক মহোদয় বস্তুত ‘চাকি’ হয়ে যাননি বরং চাকী রয়ে গিয়েছেন। কেননা তাঁর দীর্ঘ-ঈকারের সমাধির ওপর হ্রস্ব-ইকারের সৌধটি নির্মিত হয়েছে ১৯৯৭ সালে এবং সংস্কৃত হয়েছে ১৯৯৮ সালে, যেখানে ‘আকাদেমি বানান সমিতি’র সদস্য ছিলেন শ্রী ‘চাকি’। আনন্দ পাবলিশার্স, তাঁদের বানানবিধি সংবলিত, শ্রী চাকীর ব্যাকরণ-বইটি প্রকাশ করেছেন ২০০১ সালে। মনে হয় চাকী মহোদয়কে হ্রস্ব-ইকারের প্রচারযানটিতে ডেকে তোলা হয়েছিল ওজনদার যাত্রী বাড়ানোর জন্য। কারণ দল ভারী দেখে ব্যান্ডওয়াগনটিতে তিনি নিজেই লাফিয়ে উঠে থাকলে, পরে নেমে পড়বেন কেন। সে যা-ই হোক হবে। তবে ‘সংসদ চরিতাভিধান, দ্বিতীয় সংস্করণ, ২০০১’ থেকে আর কোনোদিনই নামতে পারবেন না ‘আত্মঘাতী বাঙালীর’ লেখক নীরদচন্দ্র ‘চৌধুরি’। কারণ তাঁর, উত্তরাধিকার হিসাবে প্রাপ্ত পদবী, ‘চৌধুরী’ ‘হ্রস্ব-ইকার পুরস্কারে’ ভূষিত হয়েছে মরণোত্তর।

গত শতকের ত্রিশের দশক থেকে চলমান বানান-বিতর্ক সম্পর্কিত প্রায় সব লেখা মোটামুটি পড়ার পরে আমার মনে হয়েছে যে বানানের সমতাবিধান হবার নয় এবং বানান নিয়ে বিভ্রান্তিও কাটবার নয়। বাংলা বানানের ক্ষেত্রে, ইকার-ঈকার নিয়েই সবচেয়ে বেশি বিতর্ক চলেছে, মীমাংসা হয়নি ৮০/৯০ বছরেও (মণীন্দ্রকুমার, বাংলা বানান, ৪র্থ সং, ৪১ পৃ)। বানান-বিপ্ল­বী রবীন্দ্রনাথ এবং সংস্কার-কর্ণধার সুনীতিকুমারের মধ্যেই মতভেদ আকাশ-পাতাল। প্রথম জন চান উচ্চারণানুগ বানান, তো দ্বিতীয় জন চান মূলানুগ। আবার প্রথম জনের ঝোঁক হ্রস্ব-ইকারের প্রতি, তো দ্বিতীয় জনের আসক্তি দীর্ঘ-ঈকারের প্রতি। অধ্যাপক দেবপ্রসাদ ঘোষ ‘দায়ি’ লেখার জন্য ‘দায়ী’ করলে ‘জরাজনিত মনোযোগের দুর্বলতা’র দোহাই পাড়লেন রবীন্দ্রনাথ। ‘রীপোর্ট’ কেন লিখলেন জানতে চাইলে মণীন্দ্রকুমারকে সুনীতিকুমার বললেন ‘খেয়াল ছিল না’। ‘অর্থাত্ খেয়াল না থাকলে রবীন্দ্রনাথের কলমে আসে হ্রস্ব-ইকার আর সুনীতিকুমারের আসে দীর্ঘ-ঈকার’ (প্রাগুক্ত, পৃ ৪২)। প্রমাণ ভাষাচার্যের ‘একটী’ ‘কলমটী’ থেকে ১৯৫০ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত তাঁর ‘বাঙ্গালা ভাষাতত্ত্বের ভূমিকা’ গ্রন্থের প্রথম পৃষ্ঠার ‘খুঁটীনাটী’ পর্যন্ত বানান। অথচ রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘বাংলাভাষা-পরিচয়’ উত্সর্গ করেন ভাষাচার্য শ্রীযুক্ত সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের করকমলে।’

আবার দেখছি, ব্যক্তিরুচির দেয়ালটিও দুর্লঙ্ঘ্য। নিম্নে-অর্থে ‘নীচে’র বিপক্ষে রবীন্দ্রনাথের দীর্ঘ ওকালতি সত্ত্বেও তাঁর স্নেহধন্য, কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় বানানসংস্কার সমিতির এবং পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পরিভাষা সংসদের সভাপতি, রাজশেখর বসু নিজে তাঁর ‘চলন্তিকা’ অভিধানে ‘নিচু’ শব্দটিকে স্থান দেননি (প্রাগুক্ত, পৃ ৯৩)। রবীন্দ্রনাথও নিজের ওকালতি মোতাবেক ‘ধিরে ধিরে ধিরে বও ওগো উতল হাওয়া’ লিখেননি। ‘বিশুদ্ধ বিস্ময়-প্রকাশের কাজে’ রবীন্দ্রনাথ ‘কী’ বানান ইচ্ছা করেছেন বলে দীর্ঘ-ঈকারকে নিষিদ্ধফলবত্ বর্জনকারীও সকল ক্ষেত্রেই ‘এমনকী’ লিখে চলেছেন। কারণ সম্ভবত বহুলপ্রচারিত সংসদ বাংলা অভিধান আর সংসদ বানান অভিধান। সেগুলিতে ভুক্তি আছে শুধু ‘এমনকী’, যেখানে রাজশেখর বসুর ‘আধুনিক বঙ্গভাষার অভিধান চলন্তিকা’য় ভুক্তি ছিল শুধু ‘এমন কি’।

বাংলার যুবতী পেছন থেকে পেঁচিয়ে দীর্ঘ-ঈকারের শাড়ি পরত। নিতম্বিনী শব্দটিকে বেশ দেখাত। সম্প্রতি বাংলাভাষার কোষকার-কার্টেলটি যুবতীর পশ্চাদ্দেশ থেকে ঈ-কারের শাড়িখানি খুলে নিয়ে তার বক্ষদেশে ই-কারের ওড়না ঝুলিয়ে দিয়েছে। কারণ দর্শিয়েছে ‘যেসব বানানের একাধিক রূপ প্রচলনে আছে, তার থেকে একটিকেই বেছে নেওয়া হয়েছে। অনেক সংস্কৃত শব্দের একাধিক শুদ্ধ রূপ আছে— দারিদ্র্য, দারিদ্র ; যুবতি, যুবতী’। আমি বলি, সেই বেছে নেওয়ার কাজটি বিংশ শতাব্দের প্রথমার্ধেই হয়ে গিয়েছে। বাছাই শব্দ দুটি হল : ‘দারিদ্র্য ও যুবতী’ এবং সেই থেকে রূপটি প্রচলনেও রয়েছে। অতএব, একই অজুহাতে বানান-দুটির পুনর্বদল অনাবশ্যক। প্রচলিত বানানে অহেতুক অপশান বাড়ানোর পরিণামে বানানের পরিচ্ছন্ন অঙ্গনটি জঙ্গুলে হয়ে উঠবে। এ ধরনের কাজকে বলে নন্-ওয়ার্ক অর্থাত্ ন-কাজ, যা ক্ষেত্রবিশেষে কু-কাজের অগ্রজসম। এ-সত্যটাই আজ পদে পদে প্রমাণিত হচ্ছে এবং পদগুলিতে রক্তও ঝরছে ক্ষণে ক্ষণে।

ভাবলাম শাড়ি-হারানো-গামছা-পরানো যুবতীর করুণ কাহিনীটি লিখব। কলম খুলেই ধন্দে পড়লাম : কাহিনীর বানানটিও আক্রান্ত হয়েছে কিনা। বানান-কোষগুলিতে শব্দটিকে আক্রান্তরূপেই পেলাম— ‘কাহিনি’। ২০০০ সালের সংসদ বাংলা অভিধানের সংশোধিত ও পরিমার্জিত পঞ্চম সংস্করণে দীর্ঘ-ঈকার হরণের কারণও পেলাম যে শব্দটি ‘অসং.’। অভিধানটির ১৯৮৪ সালের চতুর্থ সংস্করণে দেখলাম শব্দটি ‘সং’ এবং ঈকার-পরিহিতা। অর্থাত্ সনাতন সেই তত্সম-অর্ধতত্সম-তদ্ভব-তত্সদৃশ সংক্রান্ত পুরাতন পুঁজি নাড়াচাড়া করে নজর কাড়া আর কি। আমি বলি এত দশক পরে শতকটির শেষ প্রহরে শব্দটি, রবীন্দ্রনাথের পরিভাষায়, প্রাকৃত হয়ে যাবার দুর্ঘটনাটি কী ঘটল? অধিকন্তু, জাত হারালেও শব্দটির বানান বদলানোর বাধকতাটাই বা কী। তত্সম শব্দ তদ্ভব হয়ে যাবার পরেও মূলানুগ যে-বানান প্রচলনে রয়েছে, তাকে রেখে দিলে অসুবিধে কী? সুবিধে হল, বানান নিয়ে কোনো ধন্দ সৃষ্টি হয় না।

বলবেন, রবীন্দ্রনাথ বলেছেন ‘তত্সম শব্দে বানানে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম মানবেন কিন্তু তদ্ভব শব্দে তিনি স্বমতে চলবেন’ (বাংলা বানান, পৃ ২৯)। তাঁর দৃষ্টান্তে অনুপ্রাণিত হয়ে আমিও ভাবতে পারি— তদ্ভব শব্দেও আমি তত্সম’র নিয়মেই চলব, তাতে বানান নিয়ে ঝামেলা বাড়বে না। যেমন, সংস্কৃত ‘ধূলি’র দৃষ্টান্তে, প্রাকৃত হলেও, ‘ধূলো-ধূলা’ই লিখব। তাতে বানানটিকে নিয়ে কোনো সন্দেহ সৃষ্টি হবার জো থাকবে না। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ বলেন ‘যেখানে পারি সেখানে খাঁটি বাংলা উচ্চারণের একমাত্র হ্রস্ব-ইকারকে মানব’ (প্রাগুক্ত, পৃ ৪৫)। আমি ভাবি, অত পারার দরকারই বা কী— যেহেতু উচ্চারণের সঙ্গে তাল মেলানোর এক্তিয়ার নেই বানানের। থাকলে, তাঁর এক দাদার নামের বানান হবে ‘দিজেন্দ্রনাথ’ আরেক দাদার নামের বানান হবে ‘দারকনাথ’। বাংলা ভাষার চেয়ে ঢের অগ্রসর ইংরেজী ও ফরাসী ভাষায় প্রচুর শব্দে অনুচ্চারিত বহু অক্ষর সংরক্ষিত রয়েছে। উচ্চারণানুগ না-হবার কারণে ভাষা দুটি পিছিয়ে তো পড়ছে না।

 উক্ত কোষ-কার্টেলের অনাবশ্যক বানান-বদল গত পাঁচ বছরে তাঁদের বাংলা অভিধান এবং বানান অভিধানগুলির অনেক শতাংশই দখল করেছে। এসব বদল আবশ্যক নয় বলে অনেক মান্যগণ্য কোষকারের সাম্প্রতিক অভিধানেই গৃহীত হয়নি— যেমন অধ্যাপক মিলন দত্ত ও অমলেন্দু মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত বাংলা অভিধান (শব্দসঞ্চয়িতা, ১৯৯৫), ঋষি দাস সংকলিত আধুনিক বাংলা অভিধান (৪র্থ সং. ১৯৯৮), জামিল চৌধুরী সংকলিত ও সম্পাদিত বাংলা বানান অভিধান (বাংলা একাডেমী, পরিবর্ধিত ও সংশোধিত সংস্করণ, ২০০১)। ফলে বাংলা বানানের উদ্যানটি হালে জঙ্গলে পরিণত হয়েছে। অর্থাত্ সামগ্রিক বানানবিষয়টি একটা ব্যাপক বিভ্রান্তির শিকার হয়ে পড়েছে। খাল কেটে আনা এ-কুমীরটির বিশেষ শিকারে পরিণত হয়েছে সাধারণত বইপাড়া এবং পত্রপত্রিকার কর্মীগণ এবং বিশেষত তাঁদের প্রুফরিডার সম্প্রদায়টি।  

ভাষা একটা ‘ইনার্ট প্রোসেস’ অর্থাত্ অতত্পর প্রক্রিয়া। সে চলতেই থাকে, আনমনে। চলার পথে তার গায়ে অনেক কিছুই লাগে, কোনোটা থাকে কোনোটা থাকে না। তাতে তার নিজের কোনো মর্জি নেই, তাই অন্যের বেশি মর্জিও থাকতে নেই। অথচ বানান সংস্কারের নামে বাংলা বানানে যখন তখন কমিটি বসছে, নসিহত হচ্ছে, হস্তক্ষেপ চলছে। 

আমি সঘন সংস্কারের মোহে না পড়ে বাংলা ভাষার শ্রেষ্ঠতম অভিধানকার জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাস এবং হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের উত্তরসূরি রাজশেখর বসু, আবদুল ওদুদ, শৈলেন্দ্র বিশ্বাস, মিলন দত্ত, অমলেন্দু মুখোপাধ্যায় (সং. ১৯৯৫), ঋষি দাস (সং. ১৯৯৮) ও সর্বাধুনিক ইংরেজী-বাংলা আভিধানিক গৌরীপ্রসাদ ঘোষ (সং. ১৯৯৯) প্রমুখ পদাঙ্কিত সদর সড়কেই রয়ে গিয়েছি। অন্য কথায় আমি সংসদ অভিধানের চতুর্থ সংস্করণের ‘বাঙালী’ই আছি, পঞ্চম সংস্করণ কর্তৃক সংস্কৃত হয়ে ‘বাঙালি’ বনে যাইনি। জ্ঞানেন্দ্রমোহন লিখেছেন : অধিবাসী-অর্থে বাঙ্গাল+ঈ বাঙ্গালী (তুল-পঞ্জাব হতে পঞ্জাবী, নেপাল হতে নেপালী, বিহার হতে বিহারী)। তেমনি নিবাসার্থে ‘দেশী’ ‘বিদেশী’ ‘ভিনদেশী’ ‘পরদেশী’। মন্দ কী? দেখতেও ই-কার কাঁচির মতো হলে, ঈ-কার মালার মতো। তবু, টানা-লেখার ঈ-কার ফেলে— ছাড়া-লেখার অত ই-কারে কাজ কী? ‘কথাপ্রসঙ্গে সুনীতিকুমার একদিন বলেওছিলেন “দীর্ঘ-ঈকার ‘ী’ লেখা সোজা।” বাস্তবিকই বাংলা বর্ণবিন্যাসে স্বরচিহ্নের মধ্যে হ্রস্ব-ইকার ‘’ি লেখাই সর্বাপেক্ষা কষ্টদায়ক’ (মণীন্দ্রকুমার, বাংলা বানান, পৃ ৪৩)।

আলোচনার প্রবর্তনায় মনে হবে, দীর্ঘ-ঈকারকে আমি আঁকড়ে থাকতে চাই। বস্তুত তা নয়। আমি বিশেষণকে ‘সঙ্গী’ রেখে বিশেষ্যকে ‘ভঙ্গি’ করি। আমার চরিত্র ‘সরকারী’ রাস্তা দিয়ে দোকানে যায় ‘সরকারি’ করতে। আমার গল্পের এক স্ত্রীলোক ‘পুরুষালি’ সহ্য করে না, তো আরেক স্ত্রীলোক ‘পুরুষালী’ চেহারার বর কামনা করে। কেউ কেউ ‘তৈরি’ করার ঝামেলা এড়িয়ে ‘তৈরী’ বাড়িই কেনে।

বলবেন, ‘বঙ্গীয় শব্দকোষ’ সঙ্কলক হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছেন : হ্রস্ব, দীর্ঘ ও প্লুত— এই ত্রিমাত্রিক ইকারের মধ্যে বাংলায় কেবল হ্রস্ব ও প্লুত ইকারই সংস্কৃতর মতো যথাযথ উচ্চারিত হয়, দীর্ঘ ঈ-কার উচ্চারণে হ্রস্বই; দীর্ঘ কেবল নামে আর লেখনে। আমি বলি, দেখনেও দীর্ঘ। এবং দেখনের সৌন্দর্য বলেও একটা কথা আছে, যাকে বলে দর্শনদারি—  আগে দর্শনদারি পরে গুণ বিচারি। কাহিনী শব্দটিতে দুটি ইকারের একটিকে দীর্ঘ-ঈকার লিখলে দৃশ্যটি হয় সুষম এবং সেজন্যই দর্শনদারি। আর দুটিকেই হ্রস্ব-ইকারে ‘কাহিনি’ লিখলে দেখতে মনে হবে— হয়ত বাঙালী দীর্ঘ-ঈকারটির ভারে কাহিল হয়েছে অথবা বাঙালীর অনাহার বুঝি এবার ভাষাকেও কাহিল করেছে। ফরাসী ভাষা কেবল লেখনের প্রয়োজনে ও দেখনের জন্যে অনেক শব্দের মধ্যে বহু অনুচ্চারিত বর্ণ রেখে দিয়েছে— উচ্চারিত হয় না বলে ফেলে দেয়নি।

ইংরেজরাও, উচ্চারণ হয় না বলে programme শব্দের বাড়তি me ফেলে দেয়নি যদিও তারা আমেরিকানদের কোষজনক ‘নোয়া ওয়েবস্টার’কে অক্ষর-দুটি ফেলতে দেখে আসছে ১৭৮৩ সাল থেকে। ‘নোয়া’র নেতৃত্বে এমনি বানান সংস্কার হাজারও করেছে প্রয়োগবাদী মার্কিনীরা ১৮২৮ সাল থেকে। কিন্তু ইংরেজরা তাদের থেকে ভাষার শব্দ ছিমছাম করার ওসব তালিম নিচ্ছে না— যদিও মার্কিন প্রযুক্তি নিচ্ছে পাওয়ামাত্রই। কারণ প্রযুক্তি হচ্ছে সভ্যতার অংশ, যা একজনের থাকলে আরেকজনে নিতে পারে। প্রতিপক্ষে ভাষা হচ্ছে সংস্কৃতির অংশ, যা ভাষাভাষী হিসেবে আমার অংশ (আরেকবার স্মরণ করুন ম্যকাইভারের বহুশ্রুত উক্তিটি : সিভিলাইজেশন ইজ হোয়ট উই হ্যাভ, কালচার ইজ ওয়ট উই আর্)। ফলে আমার অংশ আমি সহজে ছাড়তে পারি না, অপরেও তা সহজে কাড়তে পারে না।

ইংলিশ-ইংলিশের দেড় হাজার বছরের ঐতিহ্য আছে, শেক্সপিয়ার-মিল্টন আছে— যে সম্পদ আমেরিকান ইংলিশের নেই। অতএব তেমনি ঐতিহ্যহীন মার্কিন আভিধানিক তার ইংলিশের অঙ্গে যা করতে পারে, প্রাচীনতর ঐতিহ্যসমৃদ্ধ ইংরেজ তার ইংলিশে তা করতে পারে না সংগত কারণেই। তাই তারা বানান সংস্কার না-করে, সংরক্ষণ করছে চসারের ব্যবহূত ত্রয়োদশ শতকের শব্দ victual (ভিট্ল) এবং চতুর্দশ শতকের শব্দ victualler (ভিট্লার)। বাংলা ভাষাকেও তার অমূল্য ঐতিহ্যের প্রতি নজর রাখতে হবে। কথায় কথায় ক’দিন পরপর বানান সংস্কারে মেতে ওঠার আবশ্যকতার ওজন কত, বারবার মেপে দেখতে হবে। ভাবতে হবে, অপরিহার্য কারণ ছাড়া সঘন সংস্কারের ফলে বাংলার অমর ভাষাশিল্পী বঙ্কিম-রবীন্দ্র-রচিত সাহিত্য কেবলমাত্র প্রাচীন পুঁথির পাঠোদ্ধারকারী গবেষকদের সেব্য হয়ে দাঁড়াচ্ছে কিনা।

জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাসের ‘বাঙ্গালা ভাষার অভিধান’-এর ভূমিকায় সুপণ্ডিত সুবোধচন্দ্র সেনগুপ্ত লিখেছেন : শব্দসম্ভারের বিপুলতায়, ব্যুত্পত্তির বিশুদ্ধতায়...এই দুই অভিধানই বাঙ্গালীর অবিস্মণীয় কীর্তি (অপরটি হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘বঙ্গীয় শব্দকোষ’)...ইহারা একই আদর্শে সংকলিত হইলেও ইহাদের মধ্যে পার্থক্যও আছে এবং সেই পার্থক্যের জন্য একে অপরের পরিপূরক।...আভিধানিকদের মধ্যে জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাসই বাংলা শব্দের উচ্চারণকে বিধিবদ্ধ করিয়া বাঙ্গালীকে মাতৃভাষা উচ্চারণ করিতে সাহায্য করিয়াছেন। তাহলে এই বিখ্যাত ভাষাবিদের মতে বাংলার দুই অতৃতীয় কোষকারকে পরস্পরের পরিপূরকরূপে ব্যবহার করা যায়।

হরিচরণ বলেছেন বাংলা ভাষায় দীর্ঘ-ঈকার উচ্চারণে দীর্ঘ হয় না। দীর্ঘ কেমন করে করতে হয়, সেটা শিখিয়ে দিয়েছেন জ্ঞানেন্দ্রমোহন : ‘জিহ্বার অগ্রভাগ নীচের পাটির দাঁতের পশ্চাতে রাখিয়া মধ্যভাগ তালুর নিকটে আনিয়া, অধর নিম্নদিকে ঈষত্ ঝুঁকাইয়া এবং মুখবিবর অপেক্ষাকৃত সঙ্কুচিত করিয়া উচ্চারণ করিতে হয়।’ এ ধরনের কসরতে খুবই সুরেলা একটা ‘উ’ উচ্চারিত হয় জার্মান এবং ফরাসী ভাষায়, যেরকম ‘উ’ ইংরেজী ভাষায় নেই। জিভ-তালু আর ওষ্ঠ-দন্তের অন্দরে চৌদিক থেকে চেপে ধরে ধ্বনিকে এমন চাঁচাছোলা করে ছাড়া হয় যে : স্বরটি ক্ষীরের মত লেপ্টে থাকে সুরের গায়ে। আসলে উচ্চারণের উত্থানপতন এবং বেশকম সংবলিত বিবিধ কারুকার্যই একটি ভাষার আবৃত্তিশিল্পকে সমৃদ্ধ করে। উদাহরণস্বরূপ আরবী-ফরাসী-মৈথিলী-ব্রজবুলি শ্রব্য।

সার কথা, দীর্ঘ-উচ্চারিত হয় না বলে দীর্ঘ-ঈকারকে বাদ না দিয়ে উচ্চারণেও ওটাকে দীর্ঘ করাই তো সংগত। আর বাদ দিতে হলে, উচ্চারণ শেখার কষ্টটাই না হয় বাদ দিন। দীর্ঘ-ঈকারটিকে রেখে দিন : স্রেফ দেখার জন্যে হলেও। দেখতে ওটি হ্রস্ব-ইকারের দ্বিগুণ অলংকৃত। হিন্দী ভাষার মতো নয় যে— হ্রস্ব-ইকারকে বিপরীত দিক থেকে লিখলেই দীর্ঘ-ঈকার হয়ে যাবে। বাংলা ভাষায় বিপরীতমুখী হ্রস্ব-ইকারকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে এনে একটা এলায়িত মালা বানিয়ে দিলে— তবেই দীর্ঘ-ঈকারটি লিখিত হয়, যার দর্শনদারি অধিক।

এই দর্শনদারির সূত্রেই মনে পড়ে গেল হাতির ব্যাপারটি। দীর্ঘ-ঈকারধারী ‘হাতী’ দেখলে আজ শব্দটিকে গ্রাম্য বধূর পত্র থেকে উদ্ধৃত শব্দ বলে মনে হবে। অথচ জ্ঞানেন্দ্রমোহনের অভিধানে লেখা আছে ‘হাতী’র গ্রাম্যরূপ ‘হাতি’। বিশাল হাতীকে ঝাঁকি মেরে পেছন থেকে পাকখাওয়া ধুতির মত ঈকারটি ছুটিয়ে নিয়ে, মধ্যিখানে মেলে-দেওয়া গামছার মতো ইকারটি ঝুলিয়ে দিতে কৈশোরে আমার বেশ কষ্ট হয়েছিল। মানলাম ‘হস্তী’ ‘করী’র ঈকারে হাত দেওয়া যাবে না বলেই নিত্যব্যবহার্য কথ্য শব্দ হাতীর ঈকার হ্রস্বীকৃত হয়েছে। কিন্তু বৃহত্ ‘চীন’ দেশটিকে ঈষত্ হ্রস্ব-ইকার দিয়ে ‘চিন’ দেশ বানানোর দৃশ্যটি দেখে তো আমার বুকটিই ‘চিনচিন’ করে। বস্তুত চীন তো উচ্চারণও লোকে রয়েসয়েই করে— ‘ঘিন’ করার মতো ফিক করে তো করে না।

আসলে এই সব হল ‘মেডিস্লি­­ম ডায়েট সাপ্লায়ারে’র ব্যবসাদারি। ব্যবসাটি বর্তমানে দৈনিক পত্রিকার হুড়োহুড়ি-ছুটোছুটিতে ‘জয়ন্তি’ পর্যন্ত গড়িয়ে ‘রবীন্দ্র-জয়ন্তী’র রবীন্দ্রকেও রবিন্দ্র বানানোর দোরগোড়ায় গিয়ে পৌঁছেছে। বানিয়ে ফেললে একটা প্র্যাকটিক্যাল জোকই হত। তাঁর হস্তলিপিতে হ্রস্ব-ইকার আশ্চর্য রূপলাবণ্য লাভ করার কারণেই তিনি দীর্ঘ-ঈকারের প্রতি কিঞ্চিত বিপিতাসুলভ আচরণ করেছিলেন বলে আমার আমুদে ধারণা। অথবা হ্রস্ব-ইকারের প্রতি দুর্বলতা তাঁর দীর্ঘ-আকারের মানুষ হওয়ার কারণে হওয়াটাও মানবপ্রকৃতিবিরুদ্ধ নয়। আসলে আমি ভাবছি— সর্বসম্মতিক্রমে বাংলাভাষার শ্রেষ্ঠতম আভিধানিক বলে বিবেচিত— ওই দুই মহীরূহের বিশাল ছত্রতলে থেকেই যুগোপযোগী বানান চর্চা করা যাবে না কেন। ভুললে চলবে না যে ভাষা হচ্ছে শত শত বছরের লক্ষকোটি ভাষাভাষীর পুঞ্জিভূত আবেগের আধার। তার বুনটে ঢুকে নিরুদ্বেগ ক্রিয়াবিক্রিয়া সততই ঝুঁকিপূর্ণ। সেজন্যই, ভাষাকোষে যখনতখন-যেমনতেমন হস্তক্ষেপ কাম্য নয় মস্তিষ্কের— সে-অঙ্গে ক্ষিপ্রবুদ্ধির যত চমত্কার ফুলঝুরিই ছুটুক না কেন।

আইরিশ-ইংলিশভাষী, অতিমাত্রায় ধ্বনিসচেতন, সুকণ্ঠ বার্নার্ড শ’র লেখকজীবনের শুরুশেষ প্রকট একটা মাথাব্যথা ছিল ইংরেজী ভাষার বানান এবং উচ্চারণের ব্যাপক-বিরাট গরমিল নিয়ে। লন্ডনের ককিন উপভাষা নিয়ে তাঁর প্রথম আবেশ প্রকাশ পায় ‘ক্যান্ডিডা’-নাটকে (১৮৯৪) এবং যত দূর মনে পড়ে, সে-মনোযোগ তুঙ্গে ওঠে ‘পিগম্যালিয়ন’-নাটকে (১৯১৪)। মাঝে ‘ক্যাপ্টেন ব্র্যাসবাউন্ড্স্ কনভার্শান’-নাটকের (১৮৯৯) ফেলিক্স ড্রিংকওয়াটারের মুখে লন্ডনের উপভাষা এবং নায়কের মুখে মার্কিন উপভাষার ধ্বনি-নির্দেশক বানান উচ্চারণানুযায়ী লিখে দেখানোর চেষ্টাও করেছেন বানানাবিষ্ট বার্নার্ড শ (যেমন ‘কন্ডুসিভ্’)। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল : যে-ভাষায় ‘ঘোটি’ লিখে, ওটিকে ‘ফিশ’ উচ্চারণ করা যায়, সে ভাষার সংস্কার দরকার (gh=ফ, যেমন রাফ্, o=,ি যেমন কানিসার, ti= শ, যেমন মোশন)।

পিগম্যালিয়ন-এর ভূমিকায় ব্যক্ত, শ’র মতে, ইংরেজ তার ভাষা, না জানে বানান করতে; না জানে বানানানুযায়ী উচ্চারণ করতে। বানান করতে পারে না, কারণ তা করার মত বর্ণমালাই তার নেই। যেটা আছে, সেটা পুরাতন এবং বিদেশী— যার তেমন বাক্মূল্য নেই। ফলে ভাষার পাঠ থেকে ধ্বনি বের করা অসম্ভব। ইউরোপের প্রায় সব ভাষাই এখন (১৯১৬ সালে) তাদের লিখিতরূপেই বিদেশীদের কাছে বোধগম্য। শুধু ইংরেজী আর ফরাসী ভাষাই, বিদেশী তো দূরাস্ত্, ইংরেজদের এবং ফরাসীদের কাছেও বোধগম্য নয়। তাই সংস্কারক হিসাবে শ’র প্রয়োজন তেজী এবং উত্সাহী একজন ভাষাধ্বনিবিত্। সেজন্যেই তিনি তাঁর জনপ্রিয় নাটক পিগম্যালিয়নের নায়ক বানিয়েছেন ফোনেটিশিয়ান প্রফেসর হিগিন্সকে। বার্নার্ড শ’ তাঁর প্রস্তাবিত প্রকল্পে ভাষা সংস্কারক ধ্বনিবিজ্ঞানীকে সংক্ষিপ্ত একটি রেসিপিও দিয়েছেন। সেটি নিম্নরূপ :

‘সম্পূর্ণ এবং যথাযথ লিপি প্রবর্তন ব্যবহারিক তো নয়ই, সাধারণ ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয়ও নয়। অতএব, ইংরেজী বর্ণমালাকে বাড়িয়ে অন্তত রাশান্ বর্ণমালার সমান করে, ইংরেজী বানানকে অন্তত স্প্যানিশ বানানের মতো ধ্বনি-নির্দেশক করে নিলেই— ইংরেজী ভাষার উন্নতি হবে মস্ত বড়’।

এই বিশাল কর্মকাণ্ডের খরচ মেটানোর জন্য শ’ তাঁর সেকালের চার লক্ষ পাউন্ড ভূসম্পত্তির মূল অংশটিই উইল করে গিয়েছেন। ইংরেজী ভাষার বানান ও উচ্চারণ সম্পর্কিত উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যয় নির্বাহের পর, অবশিষ্ট সম্পত্তি সমানভাগে পাবে তিনটি প্রতিষ্ঠান— ব্রিটিশ মিউজিয়াম, রয়েল একাডেমি অফ ড্রামাটিক আর্ট এবং ন্যাশনাল গ্যালারি অফ আয়ার্ল্যান্ড। তহবিল বণ্টনের ধরনেও বানান সংস্কারের অগ্রাধিকার লক্ষণীয়।

 

বাকি অংশ আগামী সংখ্যায়

প্রবন্ধটিতে লেখকের নিজস্ব বানানরীতি অনুসরণ করা হয়েছে