জলরঙে সিদ্ধহস্ত শিল্পী অলকেশ ঘোষ। তিনি ১৯৭২ সালে চারুকলা ইনস্টিটিউট (বর্তমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ) থেকে চারুকলাশিক্ষা শেষ করেন। সংবাদপত্রে চিত্রশিল্পী হিসেবে কাজ করেছেন অনেকটা সময়। তারপর থেকে স্বাধীন শিল্পী। চার যুগ ধরে এই শিল্পী বাংলার মাঠ-ঘাট, নদী-পাহাড়, ফুল-প্রকৃতি তুলে আনছেন ফ্রেমে। তেল রং, জল রং, অ্যাক্রিলিকে মানুষের মুখ আঁকেন সমান দক্ষতায়। এ বছর অলকেশ ঘোষ তাঁর দীর্ঘ জীবনের কাজের স্বীকৃতি হিসেবে পেয়েছেন ‘শিল্পকলা পদক’। এই পদকপ্রাপ্তির অনুভূতি, জীবনের নানা প্রসঙ্গে সাক্ষাত্কার নিয়েছেন মোহাম্মদ আসাদ
আপনার ছবি আঁকাআঁকির শুরুটা কীভাবে?
জামালপুরে আমাদের পাশের বাসায় এক ছেলে ছিল, নাম জাহাঙ্গীর। ওকে দেখতাম ঘরের বেড়ায় সুন্দর হরফে অনেক কিছু লিখতে। তার মধ্যে একটা কথা মনে আছে, ‘নিরাশ আঁধারে খোদা, তুমি আশার আলো’। ও ড্রইংটা ভালো জানত। সেটা দেখেই আমার আঁকাআঁকির প্রতি ঝোঁক হলো। এটা দেখে আঁকি, ওটা দেখে আঁকি। কৈশোরে মাটি দিয়ে দুর্গা বানাতে দেখে আমিও একটা দুর্গা বানিয়েছিলাম। যখন সপ্তম শ্রেণিতে পড়ি, তখন থেকে শুরু হলো পোর্ট্রেট করা। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জিন্নাহ, আইয়ুব খান, গান্ধী এঁদের ছবি এঁকেছি। গান্ধী কম এঁকেছি। রবীন্দ্রনাথ আর আইয়ুব খান বেশি এঁকেছি। আমার শৈশবে এরাই ছিল আইকন। আমি স্কুলে ড্রইং ক্লাসে ভেরিগুড পেতাম। জামালপুরে অনেক চিত্রশিল্পী ছিলেন। তার মধ্যে একজন হলেন রমেন সাহা। খুবই সিনিয়র, তাঁর কাজ দেখতাম। আরো ছিলেন মুকুল দত্ত; তাঁর বাবা রবি দত্ত। তিনি আবার ড্রইং শিখাতেন। প্রতি রবিবারে পোর্ট্রেট করতেন। তিনি সচে পোর্ট্রেট করতেন। সচমানে গ্রাফ করে পোর্ট্রেট করা। তখন তাঁর বয়স ৬৫/৬৬ বছর। পড়াশোনা করেছেন কোলকাতা আর্ট কলেজে। এখানে গভর্নমেন্ট স্কুলের ড্রইং শিক্ষক। তিনি আমাকে বলেছিলেন—আমি যেন পোর্ট্রেট শিখি; তাতে টাকাকড়ি আসবে। সেটা আমার মাথায় কাজ করেছে। পরবর্তী সময়ে আমি অসংখ্য পোর্ট্রেট করেছি।
চারুকলা ইনস্টিটিউটে ভর্তি হলেন কোন বছর?
চারুকলায় ভর্তি হই ১৯৬৭ সালে। প্রথম বর্ষে আমাদের দুই জন শিক্ষক ছিলেন। একজন রফিকুন নবী, আরেকজন মনিরুল ইসলাম। প্রথমে আমাদের একটা পট বা পটারি দেওয়া থাকত। সেটা দেখে দেখে আঁকতে হতো। আমি ভর্তি হই ফাইন আর্টে। এই বিভাগে সে বছরই বেশি শিক্ষার্থী ভর্তি হয়। এই এক বিভাগেই সে বছর ভর্তি হয়েছিল ৭০ জন। তখন প্রতিদিন স্টিল লাইফ, কবুতর স্টাডি করতে হতো। সেটা পেনসিল স্কেচ আর জলরঙে করতে হতো। আউটডোর স্টাডি ছিল। চারুকলায় একটা মিনি চিড়িয়াখানা ছিল। এটা ছিল বকুলতলায়। ওখানে হরিণ ছিল ১০/১২টা। কবুতর, হাঁস, মুরগি, বানর ছিল। একটা শিম্পাঞ্জিও ছিল। সেটা পরে মারা যায়। বিভিন্ন রকম পাখি ছিল। ওখানে বসে আমরা স্টাডি করতাম। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালে আমি পাস করি।
এই যে অর্ধশত বছরের বেশি সময় ধরে ছবি এঁকে চলেছেন নিরলস, এই শক্তিটা পান কোথা থেকে?
আর্ট কলেজে পড়ার সময় রেজাল্ট বরাবরই ভালো ছিল, প্রতিবারই ফার্স্ট হতাম। সেটা একটা অ্যাডভান্টেজ। তখন থেকেই মনে হয়েছে আমি ছবিতে থাকতে পারব। চাকরিজীবনে দৈনিক বাংলা, বিচিত্রা, বঙ্গবার্তা, গণকণ্ঠ পত্রিকায় কাজ করেছি। লেটারিংটা আমার আগেই জানা ছিল। পোর্ট্রেটের দক্ষতাটাও আগেই ছিল। সব মিলিয়ে চাকরিজীবনটাও ভালো কেটেছে। ১৯৭৩ সালে আমি পাস করেছি ড্রইং অ্যান্ড পেইন্টিং থেকে। দশ-বারো বছর পেইন্টিং করলাম। তারপর ওয়াটার কালার করা শুরু করলাম। নিয়মিত ওয়াটার কালার করছি ৩০ বছর ধরে। আমার চিন্তা ছিল ১০ বছর পর পর মিডিয়া বদল করব। ওয়াটার কালারের বেলায় একটু গোলমাল হয়ে গেছে। আঁকতে আঁকতে ছবির প্রতি একটা ভালোলাগা, ভালোবাসা তৈরি হলো। এখন ফ্যামেলির চাইতে আমার ছবিকে বেশি গুরুত্ব দেই। আমার সত্তার সঙ্গে আমার ছবি মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে।
আমি ভাবছি শৈশবস্মৃতি নিয়ে ভিন্ন ধরনের একটা সিরিজ কাজ করব। আমার শৈশবে যা দেখেছি, এখন নাই, সেই বিষয় নিয়ে ছবি আঁকব। শৈশবে আমি জামালপুর শহরেই থাকতাম। আমার বাসার সামনেই দুর্গাবাড়ি। তাকালেই মেইন রোড দেখা যেত। সন্ধ্যা হলেই অন্ধকার হয়ে যেত। সে অন্ধকারে অসংখ্য জোনাকি পোকা দেখা যেত। সে দৃশ্য এখনো আমার চোখে ভাসে। পথে ঘাটে অনেক শকুন দেখতাম। এখন একটাও দেখা যায় না।
আপনাদের সময়ে ছবি পত্রিকায় ছাপা হতো কীভাবে?
প্রথমে ছবি ছাপা হতে দেখেছি ব্লকে। তারপর এলো লাইনো। লেখা ছাপা হতো শিসার হরফে। শিসার হরফ সাজিয়ে তার সঙ্গে ছবির ব্লক বা লাইনো বসাত। লেটারিংও ব্লক বা লাইনোতে করা হতো। দৈনিক বাংলায় দেখেছি যারা ব্লক তৈরি করত তারা খুব দক্ষ ছিল। প্রিন্টে প্রায় কাছাকাছি আসত। অফসেট প্রেস আসার পর অনেকটা নিখুঁত ছাপা শুরু হলো। বিচিত্রার কভার বিশেষভাবে ছাপা হতো। শাহাদাত চৌধুরী বিচক্ষণতার সঙ্গে কাজ করতেন। বিচিত্রায় পোর্ট্রেট করাতে উদ্বুদ্ধ করেছেন তিনি। সেখানে আমার অনেক পোর্ট্রেট ছাপা হয়েছে। শিল্পকলা একাডেমিতে বিখ্যাত সেতার বাদক রবিশংকরের পোর্ট্রেট করে উপহার দেওয়া হলো। সেই ছবি সব পত্রিকায়ই ছাপা হয়েছিল। এ দেশের খ্যাতিমান অনেকেরই পোর্ট্রেট আমি করেছি। কতগুলো বঙ্গবন্ধুর পোর্ট্রেট করেছি তার হিসাব নেই। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, বঙ্গভবনে বঙ্গবন্ধুর বড়-ছোট মিলিয়ে প্রায় ৩০/৩৫টি ছবি আছে। মহিউদ্দিন খান আলমগীর যখন সচিব ছিলেন তখন তিনি এইগুলো সংগ্রহ করেছেন। আমি প্রথমে উনার বাবার পোর্ট্রেট করলাম। সেটা দেখে খুশি হয়ে পরবর্তী সময়ে এই কাজগুলো তিনি করিয়েছেন।
শিল্পকলা পদক পাওয়ার খবর কবে জানলেন?
আমি জেনেছি শিল্পকলা পদকের সিলেকশন হয়েছে মার্চ মাসে। আমাদের চিঠি দিয়ে জানিয়েছে এপ্রিল মাসে। শিল্পকলা একাডেমির কোনো কাগজ এলে আমি সাধারণত দেখি না। ওদের অনেক অনুষ্ঠান। এত অনুষ্ঠানে যাওয়ার সময় কই। প্রথম একটা বড় খাম এলো, শিল্পকলা দেখে প্রথমে সেটা খুলিনি। বিকেলে মনে হলো টেপ দিয়ে সুন্দর করে আটকানো, খুলে দেখি। খুলে দেখি শিল্পকলা পদকে আমাকে মনোনীত করেছে। সঙ্গে আগের বছরের সুভ্যেনিরটা পাঠিয়েছে। সেটার মতো করে আমার জীবনবৃত্তান্ত, ছবি পাঠাতে বলেছে। সেটা দেখার পর আমি সমরজিত্ স্যারকে ফোন দিলাম। বললাম, স্যার শিল্পকলা পদকের জন্য আমি নির্বাচিত হয়েছি। স্যার অভিনন্দন জানালেন। তারপর বললেন, আমি আশীর্বাদ করি তুমি আরো ওপরে উঠবা। পরে জেনেছি সমরজিত্ স্যারও নির্বাচন কমিটিতে ছিলেন।
শিল্পকলা পদক পাওয়া নিয়ে কী বলবেন?
জাতীয় পর্যায়ে একটা স্বীকৃতি পেলে দেশ নিয়ে আবার একটু ভাবনাচিন্তা করতে হবে। একটু গভীরে যেতে হবে। বাংলাদেশটাকে কীভাবে বহির্বিশ্বে উজ্জ্বল রাখা যায় সেটা নিয়ে ভাবতে হবে। পুরস্কার পেলে কাজে উত্সাহ বাড়ে। কখনো ভাবিনি কোনোদিন কোনো পদক পাব। কোনো শিল্পীই পদক পাওয়ার জন্য কাজ করে না। আমার কাজ কখনো থেমে থাকেনি। স্বীকৃতিতে হয়তো কাজে আরো গতি আসবে। স্বীকৃতিপ্রাপ্তিতে একটু আনন্দ তো আছেই।
ছবি আঁকা নিয়ে আপনার ভবিষত্ ভাবনাটা কী?
ডিসেম্বর মাসে একটা প্রদর্শনী করব। সেটা করতে বলেছে শিল্পী শাহাবুদ্দীন। আমার প্রদর্শনীতে সে থাকবে বলে কথা দিয়েছে। আমি সারাজীবনে দুইটা প্রদর্শনী করেছি। প্রদর্শনী করার মতো কাজ আমার জমা থাকে না। ছবি আঁকার আগেই বিক্রি হয়ে যায়। আমার ছবি জমিয়ে রাখা সম্ভব হয় না। আমি অনেক ছবি আঁকি এটা সত্য, কিন্তু যখন তখন ছবি আঁকি না। কখনো এক দুই ভাবতে থাকি, গান শুনি। তারপর আঁকতে শুরু করি। আমার যখন ভালো লাগে, শরীর ভালো থাকে তখন আঁকি। শ্রী রামকৃষ্ণের একটা কথা আমি সবসময় মনে রাখি, ‘যদ্দিন বাঁচি, তদ্দিন শিখি’। এটাই আমি মেনে চলি।