পাহাড়ে নতুন আশার আলো বিদেশি ফল রাম্বুটান

পার্বত্য চট্টগ্রাম এখন দেশের অন্যতম ফল উৎপাদন অঞ্চল বা ‘ফ্রুট জোন’-এ পরিণত হয়েছে। এক সময়ের বনজঙ্গলে ঘেরা হাজার হাজার একর অনাবাদি ও পতিত পাহাড়ি টিলা ভূমিতে গড়ে উঠেছে দেশি-বিদেশি নানা জাতের ফলের বাগান। এই বাগানগুলোর মাধ্যমে যেমন কৃষিতে এসেছে বৈচিত্র্য, তেমনি তৈরি হয়েছে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থানের সুযোগ।

পাহাড়ের অনুকূল আবহাওয়া ও মাটির বৈশিষ্ট্য কাজে লাগিয়ে কৃষি উদ্যোক্তারা এখন নতুন নতুন জাতের ফল চাষে ঝুঁকছেন। সাম্প্রতিক সময়ে বিদেশি সুস্বাদু ও পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ রাম্বুটান ফল পাহাড়ে এক নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। শখের বশে শুরু হলেও এই ফলের উচ্চ বাজারমূল্য ও ব্যাপক চাহিদা দেখে অনেকেই এখন বাণিজ্যিকভাবে রাম্বুটান চাষে আগ্রহী হচ্ছেন।

এই সফল উদ্যোক্তাদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছেন খাগড়াছড়ির মহালছড়ির চিকিৎসক ডা. আকেইপ্রু চৌধুরী। মহালছড়ি উপজেলার বিহার টিলা গ্রামে পাহাড়ের ঢালে গড়ে তোলা তার রাম্বুটান বাগানে এখন থোকায় থোকায় ঝুলছে লাল ও হলুদ রঙের ফল। ২০২১ সালে ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড ও ফিলিপাইন ভ্রমণের সময় রাম্বুটান দেখে দেশে চাষের স্বপ্ন দেখেন তিনি। সেই বছরই বিভিন্ন দেশ থেকে রাম্বুটান চারা সংগ্রহ করে বাড়ির পাশের ঢালু জমিতে প্রথমে ২২০টি চারা রোপণ করেন। বর্তমানে তার বাগানে ইন্দোনেশিয়ার বিনজাই, থাইল্যান্ডের রংবিয়ান, ফিলিপাইনের কুইজন, মালয়েশিয়ার স্কুল বয় (আনাক সেকুলা) এবং ভারতের এন-১৮—এই পাঁচটি জনপ্রিয় জাতের রাম্বুটান রয়েছে।

ডা. আকেইপ্রু চৌধুরী বলেন, শখের বসে শুরু করেছিলাম, এখন এটি আমার বাণিজ্যিক উদ্যোগে রূপ নিয়েছে। মাত্র চার বছরের মাথায় ২২০টি গাছের মধ্যে প্রায় ১৮০টিতে ফল এসেছে। এ বছরই প্রায় ১০ একর জমিতে নতুন করে চারা রোপণ করেছি।

তিনি জানান, রাম্বুটান গাছে সার ও কীটনাশক প্রয়োজন হয় না, তবে শুষ্ক মৌসুমে নিয়মিত সেচ দিতে হয়। বাজারে এই ফলের চাহিদা ও মূল্য দুই-ই বেশি। খোলা বাজারে প্রতি কেজি রাম্বুটান বিক্রি হয় ১,৪০০ টাকায়, আর সুপারশপে এর দাম প্রায় ২,৪০০ টাকা পর্যন্ত।

চট্টগ্রাম কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের জেলা প্রশিক্ষণ কর্মকর্তা মো. নাছির উদ্দিন বলেন, আঁশযুক্ত, কম রসালো হলেও সুস্বাদু ও সুগন্ধি রাম্বুটান দেখতে অনেকটা লিচুর মতো। এটি ভিটামিন ‘এ’, ‘সি’ এবং নানা রকম মিনারেল সমৃদ্ধ একটি পুষ্টিকর ফল। পার্বত্য চট্টগ্রামের মাটি ও জলবায়ু রাম্বুটান চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী।

স্থানীয় তরুণ উদ্যোক্তা সুনীল চাকমা, পরেশ ত্রিপুরা ও রফিকুল ইসলাম সাগর বলেন, রাম্বুটানের বাজারমূল্য বেশি, উৎপাদন খরচ কম, এবং পাহাড়ের জন্য একেবারেই উপযোগী একটি ফসল। তাই আমরাও এই ফল চাষে আগ্রহী হচ্ছি।

খাগড়াছড়ি পাহাড়ি কৃষি গবেষণা কেন্দ্রের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল মালেক বলেন, ফলই পাহাড়ি কৃষির মেরুদণ্ড। রাম্বুটান চাষের জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ ও মাটি পার্বত্য চট্টগ্রামে রয়েছে। শুধু বিদেশি জাতই নয়, আমাদের উদ্ভাবিত ‘বারি রাম্বুটান-১’ জাতটিও পাহাড়ে চাষের জন্য যথোপযুক্ত। আমরা উদ্যোক্তাদের নিয়মিত কারিগরি সহায়তা ও উৎসাহ দিয়ে যাচ্ছি।

তিনি আরও জানান, শুধু মহালছড়ি নয়, মাটিরাঙ্গা, রাঙ্গামাটি ও বান্দরবান জেলার বিভিন্ন এলাকাতেও রাম্বুটান চাষ সম্প্রসারিত হচ্ছে।