গণভবন

'পাওয়ার হাউজ' এখন জুলাই জাদুঘর

গণভবন। এ নামটি শুনলেই চোখে ভেসে উঠে রাষ্ট্রীয় কড়াকড়ি, নিরাপত্তা, সিদ্ধান্ত আর ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকা কিছু মানুষ। এক সময় যেখান থেকে ক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার হতো, সিদ্ধান্ত হতো, রাষ্ট্র পরিচালনা হতো সেটি এখন পরিণত হয়েছে এক স্মৃতিবহুল প্রদর্শনীকেন্দ্রে। যেখানে সেই ক্ষমতার ইতিহাস, উত্থান-পতনের দলিলগুলো সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত। 

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানের সময় গণভবন নির্মাণ করা হয়। কিন্তু শেখ মুজিবুর রহমান সেখানে বসবাস করতেন না। তিনি পরিবার নিয়ে বসবাস করতেন ধানমন্ডি ৩২ নম্বর সড়কের বাড়িতে, যেটি পরবর্তী সময়ে 'বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর' করা হয়েছিল। ২০০১ সালে শেখ হাসিনা তখন বলেছিলেন, শেখ মুজিবুর রহমান প্রধানমন্ত্রী ও প্রেসিডেন্ট থাকাকালে গণভবন অফিসের কাজে ব্যবহার করতেন। মূলত বিকাল-সন্ধ্যাকালীন অফিস হিসেবে এটি ব্যবহৃত হতো।

জেনারেল এরশাদ ক্ষমতায় থাকার সময় ১৯৮৫ সালে গণভবন সংস্কার করে সেটিকে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন 'করতোয়া' নামকরণ করা হয়। বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধান ও সরকার প্রধানদের জন্য এই অতিথি ভবন ব্যবহার করা হতো। এই ভবনে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী ঢাকা সফরের সময় অবস্থান করেছিলেন বলে জানা যায়। এরপর অতিথি ভবন 'করতোয়া' রাষ্ট্রীয় কাজে কিছু ব্যবহার হয়েছিল।

কিন্তু ১৯৯৬ সালে নির্বাচনে জয়লাভের পর প্রধানমন্ত্রী হয়ে শেখ হাসিনা গণভবনে বসবাস শুরু করেন। শেখ হাসিনা ক্ষমতা থাকার সময় ২০০১ সালের ২০ শে জুন জাতীয় সংসদে 'জাতির পিতার পরিবার সদস্যগণের নিরাপত্তা আইন ২০০১' সংসদে পাশ হয়। এর কয়েক সপ্তাহ পরেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে তার ক্ষমতা হস্তান্তরের কথা ছিল। এই আইনে শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানাকে আজীবন এসএসএফ দ্বারা নিরাপত্তা দেওয়া, পৃথক আবাসন বরাদ্দ ও আনুষঙ্গিক সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার কথা বলা হয়।

২০০১ সালের দোসরা জুলাই আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় শেখ হাসিনাকে গণভবন বরাদ্দ দেওয়া হয়। এই আইনের ক্ষমতাবলে শেখ হাসিনাকে গণভবন এবং তার ছোট বোন শেখ রেহানাকে ধানমন্ডির ছয় নম্বর সড়কে এক বিঘার একটি সরকারি বাড়ি বরাদ্দ দেওয়া হয়।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের ফলে শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে ভারতে চলে গেলে হাজার হাজার জনতা গণভবনে প্রবেশ করে উল্লাস করে। পরবর্তী সময়, এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটিকে জনগণের স্মৃতিরক্ষার স্থান হিসেবে সংরক্ষণ করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় এবং 'জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর' হিসেবে রূপান্তর করার পরিকল্পনা করা হয়। গত ১ জুন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী জানিয়েছিলেন যে জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবসে জাদুঘরটি চালু করা হবে।

আজ ৫ আগস্ট জাদুঘর আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করার কথা থাকলেও তা হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন দায়িত্বরত কর্মকর্তারা। 'জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর' কর্তৃপক্ষের কিউরেটর তানজিব ওয়াহাব বলেন, নির্মাণকাজ শেষ না হওয়ায় উদ্বোধন করা যাচ্ছে না। এখনো কাজ চলছে। কাজের অগ্রগতি ৬০ শতাংশর মতো।

জানা গেছে, 'জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর' প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে রাজধানীর তেজগাঁওয়ে অবস্থিত গণভবনের ১৭.৬৮ একর জমি সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অনুকূলে ৯৯ বছরের জন্য লিজ দিয়েছে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়। গত সপ্তাহে তেজগাঁও সাবরেজিস্ট্রি অফিসের মাধ্যমে জমির লিজ দলিল সম্পন্ন হয়।

জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর এমনভাবে সাজানো হচ্ছে, যাতে দর্শনার্থীরা বুঝতে পারেন কেন জুলাই বিপ্লব ঘটেছিল, কীভাবে দীর্ঘ ১৬ বছর দুঃশাসন চলেছে এবং ছাত্র-জনতা কীভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল। জাদুঘরে থাকবে শহিদদের ব্যবহৃত পোশাক, চিঠি, সংবাদপত্রের কাটিং, অডিও-ভিডিও দলিল এবং শেখ হাসিনার দেশত্যাগের ভিডিওচিত্রও। প্রতীকী গণকবর তৈরি করা হচ্ছে। জাদুঘরে 'আয়নাঘর'-এর একটি রেপ্লিকাও তৈরি করা হচ্ছে।