কাপ্তাই বাঁধের ১৬টি জলকপাট খুলে দেওয়ায় টানা ছয় দিন ধরে পানিবন্দি হয়ে আছে হালদা ও কর্ণফুলী নদীর তীরবর্তী রাউজানের নোয়াপাড়া, উরকিরচর, বাগোয়ান, পশ্চিম গুজরার অংশসহ ৩০টির অধিক গ্রাম। প্লাবনে ডুবে গেছে মাঠ-ঘাট, রাস্তা, পুকুর-ডোবা, খাল-বিল, নষ্ট হয়েছে কোটি টাকার ফসল ও মাছ। পানির নিচে রাস্তার চিহ্ন না থাকায় সম্পূর্ণভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে যোগাযোগ ব্যবস্থা; বিপর্যস্ত হয়েছে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থান।
জোয়ারের তীব্র স্রোতে অনেক পরিবারের চাল-চুলা ভেসে গেছে, ভেঙে পড়েছে রাস্তাঘাট। বহু পরিবার অভুক্ত ও অনিদ্রায় দিন কাটাচ্ছে। বর্ষা মৌসুমে পূর্ণিমা-অমাবস্যার জোতেও এ গ্রামগুলো প্রায়ই পানিতে তলিয়ে যায়। কখনও দিনের বেলায়, কখনও গভীর রাতে পানিতে ডুবে যায় রাস্তা-ঘাট, মসজিদ-মাদ্রাসা, স্কুল এমনকি বসতঘর।
গ্রামবাসীর হাহাকার
সামমহালদার পাড়ার জোহরা বেগম বলেন, “পানির কারণে চুলা জ্বালতে পারছি না। কয়েকদিন ধরে দুপুরে রান্না হয় না, উপবাসে দিন কাটাচ্ছি। মাঝ রাতে জোয়ারের পানিতে খাটের নিচে পানি উঠে যায়, ঘুমাতে পারি না। এখনও কোনো সহায়তা পাইনি।”
অটোরিকশা চালক তৈয়ব বলেন, “জোয়ারের স্রোতে রাস্তাগুলো ভেঙে গেছে, গাড়ি চলাচল বন্ধ। চাষের জমি পানিতে ডুবে গেছে, সব ফসল পচে নষ্ট। আমরা খাবার চাই না, আমাদের বেড়িবাঁধ দিন।”
পশ্চিম নোয়াপাড়ার জামাল উদ্দিন জানান, চলাচলের একমাত্র রাস্তা ভেঙে যাওয়ায় ছেলে-মেয়েরা স্কুলে যেতে পারছে না, রোগীকে হাসপাতালে নেওয়া যাচ্ছে না। স্থানীয়রা সাঁকো বানালেও নারী ও শিশুদের পক্ষে তা পার হওয়া সম্ভব নয়।
মোকামী পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অফিস সহকারী এস. এম. শওকত বলেন, “শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা ঝুঁকি নিয়ে স্কুলে আসেন। সোমবার (১১ আগস্ট) ছুটির পর জোয়ারের পানিতে এক ছাত্র পুকুরে পড়ে গেলে শিক্ষকরা উদ্ধার করেন।”
দুর্ভোগ চরমে
সকাল ১০-১১টার দিকে জোয়ারে গ্রামগুলো প্লাবিত হয়, দুপুর ২-৩টার দিকে ভাটায় পানি নামে। রাতে একই অবস্থা তৈরি হয়, ফলে মানুষ ঘরে বন্দি হয়ে পড়ে। শিক্ষার্থী, শিক্ষক, রোগী—কেউই নিরাপদে যাতায়াত করতে পারে না।
সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত গ্রামের মধ্যে রয়েছে—নোয়াপাড়া ইউনিয়নের পশ্চিম নোয়াপাড়া, মোকামীপাড়া, সামমাহালদারপাড়া, ছামিদর কোয়াং, কচুখাইন, দক্ষিণ নোয়াপাড়া; উরকিরচর ইউনিয়নের মইশকরম, সওদাগরপাড়া, সুজারপাড়া, পূর্ব উরকিরচর, খলিফার ঘোনা, সকর্দা, হারপাড়া, বৈইজ্জাখালি; পশ্চিম গহিরা, কাগতিয়া, পশ্চিম গুজরা, বাগোয়ানের অংশবিশেষ এবং হাটহাজারীর বাড়িঘোণা।
প্লাবনে আমন ধান ও সবজির ক্ষেতসহ শত শত পুকুরের মাছ ভেসে গেছে। নদীর তীরে বেড়িবাঁধ না থাকায় প্রতিবছর বর্ষায় একই অবস্থা হয় বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
প্রশাসনের উদ্যোগ
রাউজান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জিসান বিন মাজেদ জানান, প্লাবিত ইউনিয়নগুলোতে এক মেট্রিক টন করে চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, মাস্টার রোলের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর মাঝে পাঠানো হচ্ছে। শুকনো খাবারও বিতরণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। পানি নেমে গেলে ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে প্রেরণ করা হবে।
তিনি আরও জানান, রাউজান অংশে মদুনাঘাট হতে লাম্বুরহাট পর্যন্ত ২,১৬৫ মিটার বেড়িবাঁধ নির্মাণের প্রস্তাবনা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। একনেক সভায় অনুমোদন পেলে চলতি অর্থবছরেই কাজ শুরু হবে।
এদিকে, কাপ্তাই বাঁধের জলকপাট আরও কয়েক দিন খোলা থাকবে বলে জানা গেছে, ফলে দুর্ভোগ আরও বাড়তে পারে। নদীর তীরে বেড়িবাঁধ না হওয়ায় বছরের প্রায় ৩-৪ মাস কোমর সমান পানিতে ডুবে থাকে গ্রামগুলো, ক্ষতিগ্রস্ত হয় বসতবাড়ি, রাস্তা ও ফসলের জমি। স্থায়ী সমাধানের জন্য বেড়িবাঁধ নির্মাণ এখন গ্রামবাসীর একমাত্র দাবি।