পুরান ঢাকার নিরামিষ ভোজনালয়: যেন স্বাদের সঙ্গে ঐতিহ্যের মেলবন্ধন

পুরান ঢাকা এমন একটি এলাকা যেখানকার প্রতিটি অলি-গলি ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং সুস্বাদু খাবারের গল্প বলে। মুঘল আমল থেকে শুরু করে আধুনিক যুগ পর্যন্ত এই এলাকার খাবারের বৈচিত্র্যতা অবাক হওয়ার মতো। বিরিয়ানি থেকে শুরু করে কাচ্চি, লাচ্ছি, বাকরখানি, কাবাব, নেহারি এমন ধরনের বিখ্যাত খাবারের মাঝেও রয়েছে এমন কিছু স্থান, যেখানে শুধুমাত্র নিরামিষ খাবারের রাজত্ব।

পুরান ঢাকার অলি-গলিতে এখনো রয়েছে এমন কিছু ভোজনালয় আছে যারা নিরামিষ রান্নার ঐতিহ্য আজও ধরে রেখেছে। এই নিরামিষ ভোজনালয়গুলো শুধু ভোজনরসিকদের পেট ভরে না, তারা সংরক্ষণ করছে পুরান ঢাকার এক অনন্য ঐতিহ্য। একটু ভিন্ন ও ঘরোয়া স্বাদ নিতে চাইলে চলে যেতে পারেন পুরান ঢাকার তাঁতিবাজারের নিরামিষ হোটেলগুলোতে।

তাঁতিবাজার ও শাঁখারিবাজার এলাকায় নিরামিষভোজীদের ঘিরে গড়ে উঠেছে বেশ কয়েকটি জনপ্রিয় নিরামিষ হোটেল যেমন জগন্নাথ ভোজনালয়, বিষ্ণুপ্রিয়া হোটেল (বর্তমানে হরে কৃষ্ণ ভোজনালয়), আদি গোবিন্দ হোটেল, এবং জয় মা তারা ভোজনালয়। খাবারের পদের সংখ্যায় কিছুটা পার্থক্য থাকলেও মান প্রায় সবার কাছাকাছি। সকাল ৮টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত এসব হোটেলে ভিড় লেগেই থাকে।

যে কোনো একটি হোটেলে বসতেই আপনার সামনে হাজির হবে স্টিলের থালায় ধোঁয়া ওঠা গরম ভাত। সঙ্গে ট্রেতে সাজানো ছোট ছোট বাটিতে ১২–১৪ রকমের নিরামিষ তরকারি। এর মধ্যে রয়েছে: কাঁচা কলার রসা, মটর ডাল, সাগুদানা ভুনা, পাঁচ তরকারি, লাউ তরকারি, ছানার রসা, কাশ্মীরি পনির, আলু-পটলের রসা, মুগ ডাল, বুটের ডাল, বিভিন্ন শাকভর্তা, সয়াবিন সবজি, কলার মোচার তরকারি, পটল–সরিষা ভুনা, ডালের বড়ার রসা এবং মৌসুমি সবজির তরকারি।

বিশেষ করে জগন্নাথ ভোজনালয়ে আলাদা করে পাওয়া যায় ৮–১০ ধরনের ভর্তা যেমন: বেগুন ভর্তা, আলু ভর্তা, ধনেপাতা ভর্তা, শিম ভর্তা, সরিষা ভর্তা, কচুর লতি ভর্তা ইত্যাদি।

পুরান ঢাকার নিরামিষ ভোজনালয়গুলোর ট্রেতে সাজানো ছোট ছোট বাটিতে ১২–১৪ রকমের নিরামিষ তরকারি। ছবি: ইত্তেফাক

এছাড়া একাদশী (চান্দ্র তিথি) উপলক্ষে থাকে বিশেষ আয়োজন পুষ্পান্ন (পোলাও), খিচুড়ি, ছানার রসা, বাদাম ভুনা, ফুলকপির রসা, সাগুদানা ভুনা, পাঁচ তরকারি ও শ্যামা দানার পায়েস। এই দিনের রান্নায় শুধু আদা ও কাঁচা মরিচ ব্যবহার করা হয়, আর তেল হিসেবে সয়াবিনের বদলে সূর্যমুখীর তেল ব্যবহৃত হয়। অন্যদিনের রান্নায় সয়াবিন তেল ও সাধারণ মসলা ব্যবহার হলেও পেঁয়াজ ও রসুন কখনোই দেওয়া হয় না।

এখানে খেতে আসা স্থানীয় একজনের সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, আমি ছোটবেলা থেকে এখানেই খাচ্ছি। এখনো একই স্বাদ, একই আন্তরিকতা।  

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী জানান, তিনি প্রায়ই এখানে খেতে আসেন। খাবারের স্বাদ ও মান একশতে একশ, কিন্তু দামটা একটু কমানো গেলে বেশ ভালো হতো। মূলত নিরামিষ আহারী সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কথা চিন্তা করে এসব হোটেল প্রতিষ্ঠা করা হলেও, এখানে সব ধর্মের মানুষ সমানভাবে খেতে আসেন। দূর-দূরান্ত থেকেও অনেকে নিরামিষের এই স্বাদ নিতে পুরান ঢাকায় আসেন।

জগন্নাথ ভোজনালয়ের স্বত্বাধিকারী অশোক কবিরাজ বলেন, পুরান ঢাকার নিরামিষ রেস্তোরাঁগুলো শুধু খাবারের দোকান নয় এগুলো এক একটি সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের ধারক-বাহক। এখানে স্থানীয় উপকরণ, ঐতিহ্যবাহী মশলার অনন্য মিশ্রণ এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে আসা স্বাদ ও হৃদয়ের উষ্ণতা মেলে।