বিশ্ব জুড়েই বিস্তৃত মশার পরিচিতি। কয়েক শ শতাব্দী ধরে মশাবাহিত রোগের সংক্রমণের শিকার হচ্ছে মানুষ। প্রতি বছর বিশ্বে সবচেয়ে বেশি মানুষের প্রাণ নেয় মশা। বছরে সাড়ে ৭ লাখ মানুষের মৃত্যু ঘটায়। জুরাসিক যুগে আবির্ভাব হয় মশার। তখর থেকে পৃথিবীতে তার অবস্থান পাকাপোক্ত করেই টিকে আছে। ১২৬ প্রজাতির মশার মধ্যে দেশে ১৪ প্রজাতির মশা রোগ ছড়ায় বলে জানান বিশেষজ্ঞরা। ২০২৩ সালে শুধু বাংলাদেশেই ৩ লাখের বেশি মানুষ এডিস মশার সংক্রমণে ডেঙ্গু রোগের শিকার হন এবং মারা যান ১ হাজার ৭০৫ জন মানুষ।
মশা নগণ্য প্রাণী হলেও, এর প্রভাব ভয়াবহ। মশা শুধু স্বাস্থ্য সমস্যা নয়; বরং এটি পরিবেশ ব্যবস্থাপনা, নগর পরিকল্পনা ও নাগরিক সচেতনতার একটি জটিল সমন্বয়। ফলে প্রয়োজন শুধু মশা মারার অভিযান নয়, বরং একটি সুসংগঠিত ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। আর তা নাহলে ক্ষুদ্র কিন্তু ভয়ংকর এই শত্রুকে পরাজিত করা কোনোভাবেই সম্ভব হবে না বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, মশা দমন শুধু সরকারের একার দায়িত্ব নয়, নাগরিক হিসেবে সবাইকে সচেতন হতে হবে।
স্বাস্থ্যবিষয়ক ওয়েবসাইটে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী মশাবাহী রোগগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো—ডেঙ্গু জ্বর, চিকনগুনিয়া, ম্যালেরিয়া, ইয়েলো ফিভার, ফাইলেরিয়াসিস, জাপানিজ এনসেফালাইটিস, জিকা ভাইরাস। ছোট্ট এই কীটটির বিষয়ে জনসাধারণকে সচেতন করতে প্রতি বছর ২০ আগস্ট বিশ্ব জুড়ে পালিত হয় ‘বিশ্ব মশা দিবস’।
আজ ২০ আগস্ট বুধবার বিশ্ব মশা দিবস-২০২৫। ১৮৯৭ সালের এই দিনে মশাবাহিত ম্যালেরিয়া রোগের কারণ আবিষ্কার করেছিলেন ব্রিটিশ চিকিৎসক রোনাল্ড রস অ্যানোফিলিস। পরবর্তী সময়ে এই আবিষ্কারের জন্য তিনি নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হন। চিকিৎসক রোনাল্ড রসকে সম্মান জানাতে ১৯৩০ সালে দিবসটি পালনের সিদ্ধান্ত নেয় যুক্তরাজ্যের লন্ডন স্কুল অব হাইজিন অ্যান্ড ট্রপিক্যাল মেডিসিন। দিবসটি পালনের মূল্য উদ্দেশ্য হচ্ছে— মশা ও মশাবাহিত রোগ সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করা এবং সুস্থ থাকতে উৎসাহিত করা।
বর্ষা এলেই বাংলাদেশসহ নানা দেশে মশা আতঙ্ক পেয়ে বসে মানুষের মনে। আকারে ক্ষুদ্র এই প্রাণী ভয়ংকর একটি জনস্বাস্থ্য হুমকির নাম। বর্তমানে শহর কিংবা গ্রাম, ধনী বা গরিব—মশার দাপট সবার জীবনকেই বিপর্যস্ত করে তুলছে। এটি শুধু বিরক্তি নয়, প্রাণঘাতী নানা রোগের বাহক হিসেবেও পরিচিত।
মশা দমন কার্যক্রম :স্থানীয় সরকার ও সিটি করপোরেশনগুলো নিয়মিতভাবে মশক নিধন কার্যক্রম পরিচালনা করলেও তা প্রশ্নবিদ্ধ। নানা সময়ে দেখা গেছে—ফগিংয়ে ব্যবহৃত কীটনাশক কার্যকর নয় বা মেয়াদোত্তীর্ণ। নালা-নর্দমা পরিষ্কারে অনিয়ম। জনসচেতনতার অভাব।
সমাধানের পথ কী? মশা নিয়ন্ত্রণে শুধু সরকারি উদ্যোগ যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ। চারপাশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা, জমে থাকা পানি অপসারণ করা। ব্যক্তিগত সুরক্ষায় মশারির ব্যবহার, মশা নিরোধক ক্রিম ও স্প্রে ব্যবহার। জনসচেতনতা বাড়াতে স্কুল-কলেজ ও পাড়া-মহল্লায় সচেতনতা কার্যক্রম চালানো।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার ইত্তেফাককে বলেন, বাংলাদেশ তথা ব্রিটিশ ভারত থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে গবেষণায় ১২৬ প্রজাতির মশা শনাক্ত করা গেছে। তবে রাজধানীতে অর্থাৎ ঢাকায় পাওয়া যায় ১৪ থেকে ১৬ প্রজাতির মশা। আর বাংলাদেশে রোগ ছড়ায় ১৪ প্রজাতির মশা।
এই কীটতত্ত্ববিদ জানান, মশা পৃথিবীতে একমাত্র প্রাণী যা সবচেয়ে বেশি মানুষের প্রাণ নেয়। প্রতি বছর সাড়ে ৭ লাখ মানুষের মৃত্যু ঘটায় মশা। মশাই একমাত্র প্রাণী যে সবচেয়ে বেশি মানুষেরে প্রাণ নেয়, দ্বিতীয় অবস্থানে আছে মানুষ। জুরাসিক যুগে মশার আবির্ভাব পৃথিবীতে এবং তাদের অবস্থান ধীরে ধীরে পাকাপোক্ত করেই টিকে আছে। মশার উপকারিতা জানতে চাইলে এই গবেষক বলেন, প্রকৃতিতে সৃষ্টিকর্তা যাদের সৃষ্টি করেছেন, তাদের সবার পেছনেই কোনো না কোনো কল্যাণ আছে। কল্যাণহীন কোনো কিছুই সৃষ্টিকর্তা সৃষ্টি করেননি। একটা মশা আছে ‘টক্সোরিঙ্কাইটিস’—এটি উপকারী মশা। এই মশা অন্য মশাকে খেয়ে মশা নিয়ন্ত্রণে রাখে। মশা আমাদের ফুডচেইনে ভূমিকা রাখে। খাদ্যশৃঙ্খলে মশা অন্য প্রাণীর খাবার। মশা যখর পানিতে থাকে, তখন মশার লার্ভা খেয়ে বেঁচে থাকে ছোট ছোট মাছ। মাছের, ছোট পাখি এবং টিকটিকির খাবার মশা, তারা এই মশা খেয়ে বেঁচে থাকে। প্রতিটি জীবের যুক্তিযুক্ত উপকারিতা আছে বলে জানান।