৬ বছরেও শেষ হয়নি আশ্রয়কেন্দ্রের নির্মাণ কাজ, খোঁজ নেই ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের

২৪ টি ইউনিয়ন ও ১টি পৌরসভা নিয়ে গঠিত নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলা। এর মধ্যে চরাঞ্চল ও নদীবেষ্টিত রয়েছে ৬টি ইউনিয়ন। প্রতি বছরই এসব ইউনিয়নে অব্যাহত নদী ভাঙনের ফলে শত শত পরিবার হারাচ্ছেন ফসলি জমি ও ভিটেবাড়ি। নিচু এলাকা হওয়ায় চরাঞ্চলের অনেক গ্রাম বর্ষা মৌসুমে তলিয়ে যায় পানির নিচে। এর মধ্যে একটি মির্জাচর ইউনিয়ন। এই ইউনিয়নে ছয় বছর আগে বন্যা-দুর্যোগকবলিতদের স্বল্পকালীন নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণের কাজ শুরু হলেও তা এখনও ব্যবহার উপযোগী হয়নি। নির্মাণকাজের উল্লেখযোগ্য অংশ কাজ থেমে আছে; কাঠামোর বেশিরভাগ অংশ অপরিষ্কার ও অচল অবস্থায় রয়েছে। 

সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, মির্জাচর উচ্চ বিদ্যালয়ের মাঠের এক পাশে ঠাঁই দাড়িয়ে আছে একটি অসম্পুর্ণ ভবন। প্রথমে দেখেই মনে হতে পারে এটি একটি পরিত্যক্ত পুরাতন ভবন। নির্মাণ কাজ থমকে যাওয়া এই অসম্পুর্ণ ভবনটি ব্যবহার করার কথা ছিলো বিদ্যালয়ের শ্রেণী কার্যক্রম ও বন্যার সময়ে আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে। কিন্তু কাজ শেষ না হওয়ায় এটি এখন এলাকার বখাটেদের আড্ডাখানা ও মাদকসেবীদের জন্য একটি নিরাপদ আশ্রয়স্থান বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। 

উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন অফিসসূত্রে জানা যায়, এখানকার বাসিন্দাদের জন্য আশ্রয়কেন্দ্র নির্মানের উদ্যোগ নেয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর। ২০১৯ সালে বন্যা প্রবণ ও নদী ভাঙন এলাকায় বন্যা আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্প (৩য় পর্যায়) এর আওতায় কার্যাদেশ পায় মেসার্স মামুন এন্টারপ্রাইজ। কার্যাদেশে ৩ কোটি ৬ লাখ ৩০৯৪১.৮০ টাকা চুক্তি মূল্যে ওই ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানকে ১ বছর ৭ মাসের মধ্যে নির্মাণ কাজ শেষ করার জন্য বলা হয়। কিন্তু ৬ বছরেও নির্মাণ কাজ সম্পন্ন করতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি। 

স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, আশ্রয়কেন্দ্রটির কাজ দীর্ঘদিন যাবত বন্ধ হয়ে পড়ে আছে। ঠিকাদারকে খোঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। নদী ভাঙ্গন এখানকার মানুষের নিত্য সঙ্গী। সেই সাথে বন্যা ও ঝড়ে আশ্রয়হীন অবস্থায় স্থানীয়রা বাধ্য হয়ে আত্মীয়-স্বজনের ঘরে আশ্রয় নেন বা খোলা মাঠে সাময়িক আশ্রয় নিয়ে থাকেন। ওই সময় শিশুরা দুষিত পানির সংস্পর্শে আসে, স্বাস্থ্যঝুকি বাড়ে ও শিক্ষা বাধাগ্রস্ত হয়। কাজটি সম্পূর্ণ হলে এলাকাবাসীর অনেক উপকারে আসতো। আশ্রয়কেন্দ্রটি অরক্ষিত অবস্থায় থাকায়, কোনো দরজা জানালা না থাকায় বিভিন্ন লোকজন অবাধে অপব্যবহার করছে। এটি মাদকসেবীদের আড্ডা খানা বলেও মন্তব্য করেন তিনি। 

ইউপি সদস্য কবির হোসেন বলেন, প্রতি বছরই ঘূর্ণিঝড়, বন্যা ও নদী ভাঙনে অনেক ক্ষতির সম্মুখিন হচ্ছি আমরা। ২০১৯ সাল থেকে শুরু হওয়ার পর এখন পর্যন্ত কাজ অসমাপ্ত হয়ে আছে। বাকি কাজ কবে হবে নাকি হবে না এটার নিশ্চয়তা পাচ্ছি না। নির্মাণকাজ শেষ হলে দুর্যোগে গৃহপালিত পশুসহ আশ্রয় নেওয়া যেতো।

মির্জাচর উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বিল্লাল হোসেন বলেন, আশ্রয়কেন্দ্রটি আমাদের বিদ্যালয়ের মাঠের পাশেই নির্মিত হচ্ছে। তৃতীয় তলা পর্যন্ত ছাদ ও দেওয়াল নির্মাণ করা হলেও এখনও অনেক কাজ বাকি আছে। নির্মাণ কাজ শেষ হলে বিদ্যালয়ের পাঠদান ও দুর্যোগ মুহুর্তে বন্যাকবলিতদের কাজে আসবে। 

আশ্রয়নকেন্দ্রের নির্মাণ কাজ কি কারণে থমকে আছে এসব ব্যাপারে জানতে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান মেসার্স মামুন এন্টারপ্রাইজের মালিক মিনহাজ খানের সাথে মুঠোফোনে কথা হয়। তিনি বলেন, চরাঞ্চলের পরিবেশ অন্যরকম। শ্রমিকরা কেও এলাকার নয়। একেকজন উত্তরাঞ্চল ও দক্ষিণাঞ্চল থেকে আসে। বিভিন্ন সময় চরের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণে তারা এলাকায় থাকে না। এ জন্য নির্মাণ কাজ বন্ধ আছে। কাজের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। শ্রমিকরা এলাকায় আসলে কাজ শুরু করা হবে।

উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা প্রকৌশলী প্রকৌশলী জাহাঙ্গীর আলম বলেন, আমি গত বছর এখানে যোগদান করি। ইতোমধ্যে আশ্রয়কেন্দ্রটি একাধিবার পরিদর্শন করেছি। প্রকল্পটির কাজ ২০১৯ সালে শুরু হয়ে ২০২১ সালে শেষ হওয়ার কথা ছিলো। ভবনটিতে অল্প একটু কাজ বাকি আছে। ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করে কোন সাড়া না পেয়ে চিঠি প্রদান করি। পরে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে খুব দ্রুতই এসে বাকি কাজ সম্পন্ন করবে। কাজের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর আবার মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে বলেও জানান তিনি। 

এ বিষয়ে জানতে চাইলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মাসুদ রানা বলেন, মির্জাচরে আশ্রয়কেন্দ্রের কাজ প্রায় শেষের দিকে আছে, অবশিষ্ট কাজ সম্পন্ন করার জন্য ইতোমধ্যে ঠিকাদারকে বলা হয়েছে। আশ্রয়কেন্দ্রটি প্রস্তুত হলে বিদ্যালয়ের ক্লাস পরিচালনার পাশাপাশি দুর্যোগ মুহুর্তে স্থানীয়দের কাজে আসবে।