আইনজীবীর বাসায় দুই শিশু গৃহকর্মীকে নির্যাতন, বাবার মামলা দায়ের

রাজধানীর গুলশানে দুই শিশু গৃহকর্মীর উপর অমানবিক নির্যাতনের অভিযোগে ব্যারিস্টার ওমর শোয়েব চৌধুরী এক আইনজীবীর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে।

মঙ্গলবার (১৯ আগস্ট) নির্যাতিত শিশুর বাবা জুয়েল মিয়া বাদী হয়ে গুলশান থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে এ মামলাটি দায়ের করেন।

পরদিন বুধবার মামলার এজাহার আদালতে এলে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মেহেরা মাহবুব তা গ্রহণ করেন এবং আগামী ১৪ নভেম্বরের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেন গুলশান থানা পুলিশকে।

নির্যাতিত দুই শিশু হলেন— তৃষা (১২) ও সুমাইয়া (১১)। দুজনের বাড়িই ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে এবং সম্পর্কে ফুফু-ভাতিজি। তৃষার বাবা জুয়েল মিয়া।

এছাড়া নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ২২ ধারায় আদালতে দুই শিশুর জবানবন্দি গ্রহণ করা হয়, যেখানে তারা তাদের উপর চালানো অমানবিক নির্যাতনের বিস্তারিত বিবরণ দেয়।

তারা বলেন ওই বাসায় কথায় কথায় তাদের নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে। একটু কিছু হলেই ‘গরম খুন্তির ছ্যাঁকা, কারেন্টের শক, লাঠির পিটুনি’ জুটত কপালে। এসব কথা কাউকে বললে ‘মেরে ফেলার হুমকি’ দেওয়া হত।

সুমাইয়া বলেন, ‘বাসার সব কাজ করতাম। রাতে যখন তারা ঘুমাতে যাব, তখন বাসার মালিকের পা টিপে দিতো হত। ঘুমের জন্য চোখ বুজে ফেললে লাথি মারত ঠিকমতো খেতেও দিত না।’

দুজনেরই শরীরে নির্যাতনের চিহ্ন স্পষ্ট। গায়ে দেখা গেল ফোসকা আর দাগ।

‎‎মামলার অভিযোগে বলা হয়, এক বছর আগে ১২ বছর বয়সী শিশুটিকে ছয় হাজার টাকা বেতনে নিকেতনের ওই বাসায় কাজ দেয়া হয়। তখন বলা হয়েছিল, ওমর শোয়েব চৌধুরীর শিশু সন্তানকে দেখাশোনা করতে হবে। ৬ মাস আগে ১১ বছর বয়সী শিশুকেও ওই বাসায় কাজে পাঠায় তার পরিবার। ‎ভিডিও কলে দুই শিশুকে তাদের পরিবারের সঙ্গে কথা বলতে দেয়া হতো। তখন তাদের গা-মাথা ওড়নায় ঢেকে কথা বলাতো।

এজাহারে আরও বলা হয়, ‎বড় বোনের বিয়ে উপলক্ষে ১২ বছর বয়সী মেয়েকে বাড়ি নিয়ে যেতে তার বাবা জুয়েল মিয়া বাসার মালিকের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তখন দুই শিশুকে একসঙ্গে নিয়ে যেতে বলা হয়। ‎পরে গত ১৭ আগস্ট বাসার মালিক দুই শিশুকে এক ড্রাইভারকে দিয়ে মহাখালী বাসস্ট্যান্ডে পাঠান। তখন তাদের নিয়ে গ্রামের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় যান জুয়েল। ‎বাড়ি গিয়ে দেখেন ২ শিশুর হাত, পা, পিঠসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে অসংখ্য পোড়া, ছ্যাঁকা এবং আঘাতের চিহ্ন। দুই শিশু তখন জানায় বাসায় কাজে সামান্য ভুলত্রুটি হলেই গৃহকর্তা ওমর শোয়েব চৌধুরী তাদের ওপর শারীরিক নির্যাতন চালাতেন।

শিশুদের ভাষ্য, ব্যারিস্টার ওমর এবং তার স্ত্রী সাথী দুইজনই মারধর করতেন। চাইলেই তারা পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারত না। এমনকি ঠিকভাবে খেতেও দেওয়া হত না।

তৃষার বাবা জুয়েল মিয়া বলেন, ‘অভাবের সংসার। এজন্য মেয়েটাকে কাজে দিয়েছিলাম যে সুন্দরভাবে চলতে পারবে, খেতে পারবে। মেয়েটার কি অবস্থা করছে দেখেন। ফোনে কথা বলতে দিলে মুখে মাস্ক পড়িয়ে দিত। গা-মাথা ওড়নায় ঢেকে দিত। সুমাইয়ার সঙ্গেও একই কাজ করেছে। ওদের গায়ে বিভিন্ন জায়গায় ক্ষত। আমি সুষ্ঠু বিচার চাই।’

মেয়ের কাজের বেতন বাবদ এখনো ৩/৪ মাসের টাকা পাওনা বলে জুয়েল মিয়ার ভাষ্য।

বাদীপক্ষের আইনজীবী মো. সালাউদ্দিন কাদের সাউন বলেন, ‘দরিদ্র পরিবার, অভাব-অনটনের কারণে মেয়ে দুটোকে গৃহকর্মীর কাজে দিয়েছিল পরিবার। কিন্তু তাদের পা টেপানোর মত অনৈতিক কাজে বাধ্য করা হত। রাজি না হওয়ায় নির্যাতন করা হত।”

আদালত শিশু দুটিকে তাদের পরিবারের জিম্মায় দিয়েছে জানিয়ে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা গুলশান থানার এসআই মো. জসীম উদ্দিন বলেন, ‘ওমর শোয়েব চৌধুরীকে গ্রেপ্তারে অভিযান চালানো হবে।’