শিরিন-ইমরানুরের সিংহাসনে তারেক-শারিফা

জাতীয় সামার অ্যাথলেটিকসের শেষ দিনে গতকাল দিনভর উত্তেজনায় ভরা। ছিল রোমাঞ্চ, বাদানুবাদ, উত্তপ্ত পরিস্থিতি এবং দিন শেষে সেনাবাহিনীর উৎসব। সন্ধ্যায় যখন সেনাবাহিনী তার ক্রীড়াবিদদের নিয়ে হিপ হিপ হুড়রে বলে ধ্বনি দিচ্ছিল। পটকা ফুটিয়ে আনন্দ উল্লাস করছিল। সাফল্য অর্জন করায় নৌবাহিনী এসে সেনাবাহিনীকে অভিনন্দন জানিয়ে যায়।

দেশের অ্যাথলেটিকস মানেই যেন শিরিন আক্তার এবং ইমরানুর রহমান। এ দুজনই ১০০ মিটার ২০০ মিটার স্প্রিন্টের সিংহাসন দখলে রেখে দিয়েছিলেন। এই প্রতিযোগীতায়ও ১০০ মিটারে স্বর্ণ জিতেছেন ইমরানুর। তাই তারা যখন ট্র্যাকে নামলে সবাই ধরেই নেন, আর কেউ পারবে না। তবে এবার নৌবাহিনীর দুই অ্যাথলেট শিরিন আক্তার এবং ইমরানুর রহমান দুজনেই ২০০ মিটার স্প্রিন্টে ব্যর্থ হয়েছেন। দুজনই কাল হেরেছেন সেনাবাহিনীর দুই অ্যাথলেটের কাছে।

২০০ মিটার স্প্রিন্টে সেনাবাহিনীর তারেক রহমান এবং একই ইভেন্টে মেয়েদের লড়াইয়ে খুলনার মেয়ে সেনাবাহিনীর শারিফা খাতুন স্বর্ণ জয় করেছেন। দুজনই শিরিন এবং ইমরানুরকে সিংহাসনচুত্য করে সেখানে নিজেরা বসেছেন। 

শিরিন এবং ইমরানুরের দুর্ভাগ্য হচ্ছে, তারা দুজনই কাল স্প্রিন্টের সময় আহত হন। দুজনকেই স্টেডিয়াম থেকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। দুজনেরই হ্যামস্ট্রিংয়ে টান লেগেছে শিরিনের চেয়ে ইমরানুরের ভাগ্যটা খারাপ বেশি। স্টার্ট করার পরই তিনি ট্র্যাকে লুটিয়ে পড়েন। অন্যরা তখন ছুটে চলেছেন ল্যান্ডমার্কের দিকে। ইমরানুরের অফিসিয়ালরা তাকে ট্র্যাক থেকে তুলে নিয়ে স্টেডিয়ামের মাশাল গেটের ওখানে নিয়ে যায়। প্রাথমিক সেবা দেওয়ার পর স্ট্রেচারে করে অ্যাম্বুলেন্সে তুলে হাসপাতালে নেওয়া হয়।

মাত্র ছয় মাসের প্রশিক্ষণে সেনাবাহিনীর তারেক রহমান ২০০ মিটার স্প্রিন্টে বাংলাদেশের সেরা হয়েছেন। ইলেকট্রনিক টাইমিংয়ে সময় নিয়েছেন ২২:০৪ সেকেন্ড। এক বছর হয়নি তিনি অ্যাথলেটিকসে এসেছেন। এরই মধ্যে তারেক বসে গেলেন ২০০ মিটার স্প্রিন্টের সিংহাসনে। সবচেয়ে অবাক লাগছে, তারেক নাকি জানতেনই না অ্যাথলেটিকস কী জিনিস। 'অ্যাথলেটিকস খেলাটা কী আমি জানতাম না। সেনাবাহিনীতে আমি আমার ইউনিটের কোচ আসাদকে জিজ্ঞস করেছিলাম অ্যাথলেটিকস খেলাটা কী। উনি আমাকে দেখিয়েছেন। এর আগে আমার ধারণা ছিল না। উনার হাত ধরে আমি ইউনিটে ভালো রেজাল্ট করি। সব মিলিয়ে অ্যাথলেটিকসে আমার বয়স এক বছর। আর ছয় মাস আমি ট্রেনিং করে ২০০ মিটারে পদক জিতলাম-বললেন তারেক রহমান। 

ইমরানুর রহমান ব্যাথা পেয়েছেন, এতে কি আপনার সুবিধা হলো? তারেক বললেন, 'আসলে কোনো অ্যাথলেট কোনো অ্যাথলেটের ইনজুরি কামনা করে না। সবাই চায় ভালো একটা কম্পিটিশন করে গোল্ড পাওয়া।' 

তারেক বলেন, 'ইমরানুরকে আমি পত্রিকায় দেখেছি। উনাকে দেখে আমার মধ্যে প্রেরণা হয়েছে। আমি উনার সঙ্গে খেলতে চাই। জেতার আশা করিনি। তবে খেলতে যখন নেমেছি ভালো কিছু করার টার্গেট ছিল।'

দিনাজপুরের পার্বতীপুরে তারেক রহমানের বাড়ি। বাবা কৃষক। সংসার চালাবার মতো কেউ নেই। সেনাবাহিনীতে এসে সংসারের সচ্ছলতা দেখেছেন বলে তারেক রহমান জানালেন। বাসায় ছোট একটা বোন, আর মা রয়েছেন। তারেক তার জীবনে কখনো স্বর্ণপদক জিতেননি। প্রথমবার অ্যাথলেটিকসে এসে প্রথমবারই স্বর্ণ জিতলেন। তাই সেই খুশিতে ২০০ মিটারের সাফল্যটা মায়ের জন্য উৎসর্গ করেছেন।

শিরিন আক্তার ১০০ মিটার স্প্রিন্টে সিংহাসনচ্যুত হয়েছেন। দুই দিনের মধ্যে এবার ২০০ মিটারও হারিয়েছেন। শিরিন এবারও কাছাকাছি গিয়ে ল্যান্ডমার্ক স্পর্শ করতে পারেননি। ১০০ মিটারের মতো কাল ২০০ মিটারের সময়ও হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু নিয়ম অনুসারে মাথা কিংবা বুক বাড়িয়ে দিতে হবে। নৌবাহিনীর শিরিন সেটা পারেননি, সেনাবাহিনী শারিফা খাতুনের কাছে আত্মসমর্পণ করেছেন শিরিন। ইলেকট্রনিক টাইমিংয়ে শারিফা খাতুন সময় নিয়েছেন ২৫:২৪ সেকেন্ড। শিরিন আক্তারের সময় ২৫:২৭সেকেন্ড।

খুলনার দৌলতপুর দীঘলিয়ার মেয়ে শারিফা খাতুন। ২০০ মিটার ইভেন্টে খেলেন না। তিনি ৪০০ মিটার ইভেন্টের অ্যাথলেট। প্রস্তুতিও নিয়েছেন, কিন্তু খেলা হয়নি তার প্রিয় ইভেন্টে। নিজেও ভাবেননি কখনো ২০০ মিটার ইভেন্টে স্বর্ণ জয় করতে পারবেন। শারিফা খুব উৎসাহ নিয়ে বলছিলেন, তিনি ৪০০ মিটার ইভেন্টের জন্য প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। কিন্তু যে কোনো কারণেই হোক, তার সেই ইভেন্টে খেলা হয়নি। ২০০ মিটারের জন্য প্রস্তুতি ছিল না। শিরিনকে হারিয়ে শারিফার চোখে আনন্দ অশ্রু। চমক দিয়েছেন শারিফা খাতুন। তবে ১০০ মিটারে স্বর্ণ জেতা সুমাইয়া দেওয়ান অংশ নেননি এই ইভেন্টে। পায়ে চোট ছিল তার।