এপারে সাবেক মহকুমা রামগড় আর ওপারে ভারতের দক্ষিণ ত্রিপুরার সাব্রুম মহকুমা। মাঝখানে ফেনী নদী। দুদেশের এ সীমানা নদীর কূল ঘেঁষে প্রকৃতির অপরূপ পরিবেশে অবস্থিত দৃষ্টি নন্দন মহকুমা প্রশাসক বাংলো বা এসডিও সাহেবের বাংলোটি শত বছরের ইতিহাস ঐতিহ্যের নিদর্শন। এটি এখন কালের সাক্ষী। বাংলোটি মহান মুক্তিযুদ্ধেরও স্মৃতি বিজড়িত।’
‘মহকুমা’ বাংলাদেশের একটি বিলুপ্ত প্রশাসনিক উপ-বিভাগ। থানা ও জেলার মধ্যবর্তী প্রশাসনিক একাংশ হিসেবে মহকুমা প্রথা চালু হয় ১৮৬১ সালে। যা কয়েকটি থানার সমন্বয়ে গঠিত হতো। ১৯৮২-৮৩ সালের মধ্যে বাংলাদেশের মহকুমা ব্যবস্থা বিলুপ্ত করা হয়। এই সময়ে বাংলাদেশে অন্তত ৬৪টি মহকুমা ছিল। এর মধ্যে রামগড় মহকুমা একটি। মহকুমা প্রশাসক বা এসডিও ছিলেন মহকুমার প্রধান প্রশাসনিক কর্মকর্তা।
১৯২০ সালে ব্রিটিশ সরকার রামগড় থানাকে তৎকালীন পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলার (জেলা সদর ছিল রাঙ্গামাটি) দ্বিতীয় মহকুমা বা সাব-ডিভিশন হিসেবে উন্নীত করে। এর ১-২ বছর আগেই রামগড় থানা সদরে (বর্তমান উপজেলা পরিষদ সংলগ্নে) ফেনী নদীর কূল ঘেঁষে নির্মাণ করা হয় মহকুমা প্রশাসকের (এসডিও) অফিস ও বাসভবন (বাংলো)।
ব্রিটিশ প্যার্টানে বিশেষ নির্মাণ শৈলীতে বানানো হয় এসডিও সাহেবের বাংলোটি। ৩ হাজার ৪৬৫ বর্গফুটের বিশাল এ বাংলো তৈরি করা হয় মাচান ঘরের আদলে। ভূ-পৃষ্ঠ থেকে ৩ ফুট ৪ ইঞ্চি উচ্চতার ১০ ইঞ্চি ব্যাসের ইটের তৈরি শতাধিক পিলারের উপর আড়াআড়িভাবে মোটা ও শক্ত কাঠের চৌকাঠ স্থাপন করা হয়। এর উপর কাঠের চিড়াই তক্তা বিছিয়ে ফ্লোর বা মেজ বানানো হয়। ৬৩০ বর্গফুটের বারান্দাসহ এভাবে কাঠ বিছিয়ে তৈরি করা ৩ হাজার ৪৬৫ বর্গফুট ফ্লোরের উপর শক্ত ও মোটা কাঠের খুঁটি স্থাপন করে নির্মাণ করা হয় বিশাল বাংলোটি। বাঁশের বেড়ার উপর বালু সিমেন্টের আস্তর বা প্লাস্টার করে তৈরি করা হয় বাংলোর ভিতরের বাহিরের সবগুলো দেয়াল। কাঠের ফ্লোর হতে এ দেয়ালের উচ্চতা প্রায় ২০ ফুট। বাঁশের দেয়ালের প্লাস্টারে চুনের সাদা রঙের প্রলেপ দেয়া হয়। শত বছরের এ বাঁশের দেয়াল কিংবা চিরাই কাঠের ফ্লোর বা মেজ অক্ষত থাকে শত বছর। টিনের ছাউনির এ মাচান বাংলোয় উঠা নামার জন্য সামনে একটি বড় ও প্রশস্ত আরসিসি সিঁড়ি ছাড়াও পিছনে ছোট আকারের ৪টি এবং পশ্চিম পাশে দুটি সিঁড়ি রয়েছে। বাংলোয় ৪টি বড় কামরা এবং ৮টি ছোট কামরা রয়েছে।
জানা যায়, রামগড়ের আশেপাশের বিভিন্ন বনাঞ্চল থেকে সংগ্রহ করা হয় বালোর নির্মাণ কাজে ব্যবহৃত জারুল, গর্জন ইত্যাদি কাঠ ও বাঁশ। চাঁদপুরের হাজিগঞ্জ থেকে করাতিদের এখানে এনে কাঠ চিরাইয়ের কাজ করানো হয়। লালু প্রসাদ বাবু নামে এক ঠিকাদার বাংলোর কাজ করেন। চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড থেকে ধুমঘাট হয়ে ফেনীনদী পথে আনা হয় ইট, চুন ইত্যাদি নির্মাণ সামগ্রী। নির্মাণ কাজের শ্রমিকদের সর্দার ছিলেন পঞ্চ কুমার ত্রিপুরা। ব্রিটিশ সরকারের এক সিনিয়র মেম সাহেব কাজ কর্ম দেখতে চট্টগ্রাম থেকে ধুমঘাট হয়ে নদী পথে রামগড়ে আসতেন মাঝেমধ্যে। স্বাধীন ত্রিপুরা রাজ্য ব্রিটিশ শাসনের আওতা বহির্ভূত ছিল তখন। সে কারণে ফেনী নদীর ওপারের সাব্রুম মহকুমা নজরদারির সুবিধার্থে নদীর এপারে তীর-ঘেঁষে তড়িঘরি করে রামগড় এসডিও অফিস ও বাংলো নির্মাণ করা হয়।
১৯৮৩ সালে রামগড় মহকুমাকে উপজেলায় অবনমিত করার পর মহকুমা প্রশাসন বিলুপ্ত হয়ে যায়। ফলে পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে প্রাচীন ঐতিহ্য এসডিও সাহেবের বাংলোটি। ২০২২ সালে খাগড়াছড়ির তৎকালীন জেলা প্রশাসক প্রতাপ চন্দ্র বিশ্বাস ও রামগড়ের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা খোন্দকার মো. ইখতিয়ার উদ্দীন আরাফাত ঐতিহাসিক স্থাপনাটি সংরক্ষণের উদ্যোগ নেন। বর্তমানে সংরক্ষণ প্রকল্পের কাজ চলমান আছে বলে জানান ইউএনও কাজী শামিম।
তিনি বলেন, ‘এসডিও সাহেবের প্রাচীন বাংলো দেশের আর কোথাও আছে কি না আমার জানা নেই। রামগড়ের এ বাংলোটি মহান মুক্তিযুদ্ধেরও স্মৃতি বিজড়িত।’