কার্বন দূষণ মোকাবেলায় জাবি গবেষকদের নতুন টোটকা ‘লিকুইড-ট্রি’ 

পরিবেশ দূষণ এখন এক বৈশ্বিক সংকট। শহরের রাস্তাঘাটে ধুলোবালির ঝড়, যানজটের ধোঁয়া আর বায়ুদূষণ নগরবাসীর নিত্যসঙ্গী। অদৃশ্য এক ঘাতক-কার্বন-ডাই-অক্সাইড-প্রতিদিন নিঃশ্বাসের সঙ্গে শরীরে প্রবেশ করে দীর্ঘমেয়াদে ডেকে আনছে শারীরিক জটিলতা। শুধু খোলা জায়গাতেই নয়, অফিস, ক্লাসরুম বা সভাকক্ষের মতো বন্ধ পরিবেশেও এই গ্যাসের ঘনত্ব দ্রুত বেড়ে মাথাব্যথা, অবসাদ, মনোযোগের ঘাটতি ও শ্বাসকষ্টের মতো সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে।

এই প্রেক্ষাপটে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) একদল গবেষক উদ্ভাবন করেছেন এক অভিনব সমাধান- 'লিকুইড ট্রি'। গবেষকদের দাবি, লিকুইড ট্রি একইসঙ্গে ঘরের ভেতরে ও বাইরে বাতাসের কার্বন-ডাই-অক্সাইড দূষণ কমাতে সক্ষম।

জাবির বায়োরিসোর্সেস টেকনোলজি অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল বায়োটেকনোলজি ল্যাব, গবেষণা ও উদ্ভাবন কেন্দ্র (আরআইসি) এবং বাংলাদেশ সরকারের ইডিজিই প্রকল্পের সহযোগিতায় সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তি ও স্থানীয় অ্যালগি ব্যবহার করে এই প্রোটোটাইপ তৈরি করা হয়েছে।

গবেষক দলের সদস্যরা হলেন, নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক ড.গোলাম মঈনুদ্দিন, বায়োটেকনোলজি ও জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শাহেদুর রহমান, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইইই বিভাগের অধ্যাপক ড. এম. জি. সরওয়ার হোসেইন, ইপিএল সল্যুশনস-এর এম. শাকিলুর রাহমান।

গবেষকরা বলছেন, লিকুইড ট্রি একটি ফোটোবায়োরিয়্যাক্টর, যেখানে মাইক্রোঅ্যালগি সালোকসংশ্লেষণের মাধ্যমে কার্বন-ডাই-অক্সাইড শোষণ করে এবং অক্সিজেন উৎপাদন করে। সূর্যের আলো (বহিরাঙ্গন মডেলে) বা কৃত্রিম আলো (অভ্যন্তরীণ মডেলে) ব্যবহার করে এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। অবাক করার বিষয় হলো, প্রাকৃতিক গাছের তুলনায় অনেক দ্রুত হারে এই শোষণ ও অক্সিজেন উৎপাদন ঘটে।

গবেষক দলটি দুটি মডেল তৈরি করেছে এর একটি আউটডোর লিকুইড ট্রি, যা সড়ক বিভাজক, ফুটপাত, ছাদ, পার্কিং স্পেস বা শিল্পাঞ্চলে স্থাপনযোগ্য। যানবাহন ও কারখানার নির্গত কার্বন-ডাই-অক্সাইড শোষণ করে স্থানীয়ভাবে অক্সিজেন সরবরাহ করতে পারে।

অন্যটি ইনডোর লিকুইড ট্রি; যা ক্লাসরুম, অফিস, কনফারেন্স হল কিংবা সভাকক্ষে ব্যবহারের জন্য বিশেষভাবে নকশা করা। মানুষের নিঃশ্বাস থেকে নির্গত কার্বন-ডাই-অক্সাইড শোষণ করে বাতাসকে রাখে সতেজ।

গবেষকরা জানিয়েছেন, লিকুইড-ট্রি এর কার্যকারিতা ইতোমধ্যে পরীক্ষায় প্রমাণিত। পরীক্ষায় দেখা গেছে, ২৫০ লিটারের প্রতিটি লিকুইড ট্রি একটি পূর্ণবয়স্ক গাছের সমপরিমাণ কার্বন-ডাই-অক্সাইড শোষণ করতে পারে। ছোট জায়গায় স্থাপনযোগ্য হওয়ায় এটি ঘনবসতিপূর্ণ শহরের জন্য অত্যন্ত কার্যকর সমাধান। তবে এ প্রযুক্তির কিছু সীমাবদ্ধতাও আছে। প্রাথমিক বিনিয়োগ তুলনামূলক বেশি এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ অপরিহার্য। এছাড়া স্থানীয় উপযোগী অ্যালগি প্রজাতি উন্নয়নের প্রয়োজন রয়েছে।

অধ্যাপক শাহেদুর রহমান বলেন, ‘আমরা বিশ্বাস করি এই প্রযুক্তি শুধু দূষণ মোকাবেলা করবে না, বরং নতুন কর্মসংস্থান ও সবুজ অর্থনীতির বিকাশেও ভূমিকা রাখবে। বাংলাদেশের মতো দ্রুত নগরায়ণশীল দেশে এটি প্রতীকী নয়, বরং বাস্তবসম্মত সমাধান। বিশেষ করে ইনডোর মডেল বিশ্বব্যাপী উদাহরণ হতে পারে। তবে মনে রাখতে হবে, লিকুইড ট্রি কোনোভাবেই প্রাকৃতিক বৃক্ষের বিকল্প নয়; এটি একটি সম্পূরক প্রযুক্তি।’

নগর জীবনের সংকীর্ণ পরিসরে ও বন্ধ স্থানে এই উদ্ভাবনী সমাধান দ্রুত বাস্তবায়িত হলে দূষণ নিয়ন্ত্রণে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হতে পারে-এমনটাই প্রত্যাশা করছেন গবেষকরা।