বক্সার আফরা, সমান দাপটে আছেন ফুটবল মাঠে

শুরুটা ফুটবল দিয়ে, স্বপ্ন ছিল জাতীয় দলে খেলার। সেই স্বপ্নে ভর্তি হতে চেয়েছিলেন বিকেএসপিতে, কিন্তু ব্যর্থ হন। ঠিক তখনই ছোট বোন প্রান্তি (আফঈদা খন্দকার) ভর্তি হয় বিকেএসপির ফুটবল বিভাগে। তখন সে পঞ্চম শ্রেণি পড়ে আর একাকিত্বে কাঁদত, বাড়ি ফিরতে চাইত বারবার। বোনের কষ্ট দেখে আফরা সিদ্ধান্ত নেন যেভাবেই হোক একা থাকতে দেবেন না। নিজের ফুটবল স্বপ্ন সরিয়ে রেখে ভর্তি হন বিকেএসপির বক্সিং বিভাগে। সেখান থেকেই শুরু নতুন লড়াই। পরিবারের সমর্থন, বাবার কড়া শাসন আর বোনের প্রেরণায় পৌঁছেছেন জাতীয় পর্যায়ে; খেলেছেন জাতীয় নারী বক্সিং চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালও।

তবে ফুটবলের ভালোবাসা কমেনি কখনো। তাই বক্সিংয়ের পাশাপাশি বেছে নিয়েছেন রেফারিং। এখনো মূল ম্যাচ পরিচালনার সুযোগ না এলেও সহকারী রেফারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন আফরা। বর্তমানে বাফুফের জেএফএ অ-১৪ টুর্নামেন্টের বাছাইপর্বে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। বক্সিংয়ের গ্লাভস আর ফুটবলের রেফারির পতাকা-এই দুই জগতের লড়াই আর যাত্রার গল্প দৈনিক ইত্তেফাককে শুনিয়েছেন আফরা খন্দকার।

প্রশ্ন: কীভাবে এলেন রেফারিংয়ে?

আফরা: একসময় ফুটবল খেলেছি, এখন তো পারি না বক্সিংয়ে চলে গিয়েছি তো ইচ্ছা ছিল রেফারি হওয়ার। আমাদের জয় আপু (জয়া চাকমা রেফারি) আছেন, তাকে দেখেছি। তিনি যখন ফিফা রেফারি হয়েছে সেটা দেখেই মূলত ইচ্ছা জেগেছে যে আমিও রেফারি হবো। তো পরে ধীরে ধীরে এই পেশায় চলে এসেছি।

প্রশ্ন: ফুটবলার হতে পারেননি বলেই কি এই পেশায়?

আফরা: আসলে ব্যাপারটা এমন নয় যে ফুটবলার হতে চেয়েছি সেটা পারিনি বলেই রেফারি হয়েছি। অনেককে দেখেছি... যখন ছোট বেলায় ফুটবল অনুশীলন করতাম তখন আমাদের তৈয়ব হাসান বাবু স্যারও আমাদের সঙ্গে অনুশীলন করত। উনি অনেক দৌড়াত, অনেক কষ্ট করত। রেফারির দায়িত্বও পালন করত। সেটা দেখেছি। তখন থেকেই মনে হতো যে রেফারিং করাটাও একটা শিল্প, অনেক সুন্দর লাগে দেখতে। পরে মনে হয়েছে যে না, এই পেশাটায়ও আসা যায়, ভালো এবং মজাদার পেশা তাই আমিও এসেছি।

প্রশ্ন: রেফারিং কোর্স কবে করেছেন?

আফরা: ২০২১ সালে সাতক্ষীরায় বাফুফের পক্ষ থেকে রেফারি ট্রেনিং অনুষ্ঠিত হয় সেখানে আমি অংশ নেই। ঐ ট্রেনিং ক্যাম্পে ফিটনেস টেস্ট হয় নানান ধরনের আরও পরীক্ষা হয় সেখানে পাশ করি। তখন থেকেই রেফারি ও অ্যাসিস্টেন্ট রেফারি হিসেবে দায়িত্ব শুরু করেছি। প্রতি বছর বছর আমাদের ফিটনেস পরীক্ষা দিতে হয়। সেখানে পাশ করলে ক্যাটাগরি বৃদ্ধি পায়। তো আমি এখন ক্যাটাগরি ৩-এ রয়েছি।

প্রশ্ন: ঘরোয়া টুর্নামেন্টে এবারই রেফারি হিসেবে প্রথম নাকি আগেও ছিলেন?

আফরা: এবারই প্রথম নয়। ২০২১ সালের পর থেকে মোটামুটি অনেক টুর্নামেন্টই দায়িত্ব পালন করেছি। আমাদের সাতক্ষীরাতে অনূর্ধ্ব ১৪-১৭ দের যখন খেলা হয় সেখানে আমি সহকারী রেফারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করি। এখনো বাঁশি অর্থাৎ মূল রেফারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করিনি। অ্যাসিস্টেন্ট বা ফোর্থ রেফারির দায়িত্বই বেশি পালন করা হয়। আর অন্যান্য জেলাতেও গিয়েছি বয়সভিত্তিক খেলা পরিচালনা করতে। একবার ঢাকা লিগেও (নারী) অ্যাসিস্টেন্ট রেফারির দায়িত্ব পালন করেছি।

প্রশ্ন: ম্যাচ পরিচালনা করতে কোথায় কোথায় গিয়েছেন?

আফরা: আমি সর্বপ্রথম আমার জেলার বাহিরে ম্যাচ পরিচালনা করতে গিয়েছি দিনাজপুরে। এরপর ধীরে ধরে গোপালগঞ্জ, শেরপুর, রাজশাহী, মাদারীপুরে গিয়েছি।

প্রশ্ন: কেমন লাগে এই দায়িত্ব?

আফরা: বক্সিংয়ের পাশাপাশি ফুটবলের রেফারিং করাটাও আমি বেশ উপভোগ করি। আর এই দায়িত্বটা পালন করার সুবাদে অনেক জেলাতে ঘুরতে যাওয়া যায়। এইটা আমার অনেক ভালো লাগে। বিভিন্ন জেলায় ঘুরার বিষয়টা খুব উপভোগ করি।

প্রশ্ন: ফুটবলার হওয়া সহজ নাকি রেফারি হওয়া?

আফরা: দুটোই অনেক কঠিন কাজ। ফুটবলার হতে গেলে অনেক স্কিল, অনেক কিছু শেখা লাগে। আর রেফারি হতে হলে ফুটবলের যত আইন-নিয়ম-কানুন আছে সেই সব জানা লাগে, শেখা লাগে। পাশাপাশি সেইগুলো আবার খেলার মধ্যে প্রয়োগ করা লাগে। তো সব কিছুই সহজ আবার সব কিছুই কঠিন। কারণ আমি একটা ম্যাচ চালাব সেখানে যদি আমি একটা সঠিক আইন প্রয়োগ করতে না পারি তাহলে সবাই উলটাপালটা কথা বলবে। তো সহজ কঠিন মিলিয়েই এই পেশা।

প্রশ্ন: রেফারি হতে সবচেয়ে বেশি অনুপ্রেরণা কে দিয়েছে?

আফরা: আমার বাবাও (আরিফ হাসান প্রিন্স) রেফারির কোর্স করেছিলেন। তো এই পেশায় আসতে আমাকে সব থেকে বেশি অনুপ্রেরণা দিয়েছেন আমার বাবা। তিনি বলেছেন যে, তুমি রেফারিংটা কর এটা ভালো। তো প্রথমে তার কথাতেই আসা। তারপর জয়া আপু, সালমা আপুকে দেখেছি। তারা যখন ফিফা রেফারি হলো, তখন মনে হয়েছিল যে, না আমিও পারব। সেই সময় আমার ফিটনেসও ভালো ছিল। তখন চেয়েছিলাম যে আমিও আপুদের মতো ফিফার রেফারি হব, যেহেতু সুযোগ আছে সেটা কেনো কাজে লাগাব না।

প্রশ্ন: ম্যাচ পরিচালনার সময় অন্যদের দেখলে কি খেলতে ইচ্ছে হয়?

আফরা: মাঠে যখন মেয়েগুলোকে খেলতে দেখি তখন মনে হয় আমি নিজেই বল নিয়ে দৌড়াচ্ছি। অনুর্ধ্ব-১৪-তে প্রান্তির (জাতীয় দলের অধিনায়ক আফঈদা খন্দকার) মতো একটা ছোট মেয়েকে দেখেছি, একদম ওর মতোই দেখতে, খেলেও প্রান্তির মতোই। সেই ম্যাচ পরিচালনার সময় মনে হয়েছে যে এই জায়গাটায় আমরাও একসময় ছিলাম, আমরাও এক সঙ্গে খেলেছি। তো খেলতে তো ইচ্ছে হয়-ই, যেহেতু ফুটবলের সঙ্গেই ছোটবেলা থেকে বেড়ে উঠেছি এখন বল দেখলেই ইচ্ছে হয় যে, যাই একটা লাথি দিয়ে আসি, একটা শুট করি। তো মাঠের মধ্যে দায়িত্ব পালনের সময় হুটহাট স্মৃতির মধ্যে ঢুকে যাই প্রায়ই এগুলো হয়।

প্রশ্ন: ভবিষ্যৎ লক্ষ্য কী, এই পেশা নিয়ে?

আফরা: লক্ষ্য হলো, যদি পারি ফিটনেস ঠিক রেখে চালিয়ে যেতে পারি তাহলে আমাদের সিনিয়র যারা ফিফার রেফারি হয়েছেন তাদের পথ অনুসরণ করে আমিও হতে চাই।