কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে অশ্রুসিক্ত নয়নে সন্তান হত্যার বিচার চাইলেন বৃদ্ধ এক পিতা। যে সন্তান জুলাই গণআন্দোলনে বুলেটের সামনে বুক পেতে দিয়েছিলেন নিঃসংকোচে। সেই সন্তান হত্যার ঘটনায় অভিযুক্ত দুই পুলিশ সদস্য আমির হোসেন ও সুজন চন্দ্র রায়ের কঠোর শাস্তি চাইলেন মকবুল হোসেন। যিনি রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী শহিদ আবু সাঈদের পিতা। বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে তিনি বলেন, ‘আমার আশা ছিল, ছেলেটা চাকরি করবে। কিন্তু সেই ইচ্ছা আর পূর্ণ হলো না। যেহেতু আমার ছেলে শহিদ হয়েছে। এখন আমার চাওয়া মৃত্যুর আগে যেন ছেলে হত্যার বিচার দেখে যেতে পারি।’
বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল-২ এই জবানবন্দি গ্রহণ করে। ট্রাইব্যুনালের অন্য দুই সদস্য হলেন জজ মো. মঞ্জুরুল বাছিদ এবং জজ নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর। জবানবন্দি শেষে তাকে জেরা করেন আসামি পক্ষের কৌঁসুলি আজিজুর রহমান দুলু। তবে সাক্ষ্যে অন্য আসামিদের নাম প্রকাশ না করায় তাদের পক্ষে জেরা করতে অস্বীকার করেন অন্য আইনজীবীরা।
গতকাল বেলা ১১টা ২৩ মিনিটে এজলাসে আসেন তিন বিচারক। এর আগেই এজলাস কক্ষে হাজির হন চিফ প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট তাজুল ইসলামসহ অন্য প্রসিকিউটরগণ। আসেন আসামি পক্ষের কৌঁসুলিরাও। উপস্থিত ছিলেন আবু সাঈদের বাবা মকবুল হোসেন। কাঠগড়ায় আনা হয় গ্রেফতারকৃত ছয় আসামিকে। মামলার বাকি ২৪ আসামি পলাতক রয়েছেন। তাদের বিরুদ্ধে পরোয়না জারি রয়েছে।
এজলাসে বিচারকদের আসন গ্রহণের পর সাক্ষ্য গ্রহণের বিষয়টি তুলে ধরেন চিফ প্রসিকিউটর। তিনি বলেন, শহিদ আবু সাঈদের গর্বিত পিতা সাক্ষীর কাঠগড়ায় আছেন। তিনি আজ সাক্ষ্য দেবেন। তাকে জেরা করার সময় যেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন ও বিধিমালার বিষয়টি যেন স্মরণে রাখেন আসামি পক্ষের কৌঁসুলিরা। কারণ বিশেষ আইনে এই মামলার বিচার চলছে। ফৌজদারি কার্যবিধি ও সাক্ষ্য আইনের বিধানাবলি এখানে প্রয়োগের সুযোগ নাই।
এর পরই সাক্ষীকে শপথনামা পড়ানো হয়। শপথ নিয়েই ৮৫ বছর বয়স্ক মকবুল হোসেন জবানবন্দি দিতে শুরু করেন। এ সময় এজলাস কক্ষে উপস্থিত সবার দৃষ্টি তার দিকে। জবানবন্দিতে মকবুল হোসেন বলেন, ‘আমি শহিদ আবু সাঈদের বাবা। গত বছরের ১৬ জুলাই আন্দোলনে আমার ছেলে শহিদ হন।’
তিনি বলেন, ‘আমার ছেলে রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করত। সে মেধাবী ছাত্র ছিল। অষ্টম শ্রেণিতে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পেয়েছে। এইচএসসিতে জিপিএ-৫ পেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ছাত্র ছিল। টিউশনি করেই নিজের লেখাপড়ার খরচ চালাত। গত বছরের ১৬ জুলাই ফসলের মাঠ থেকে কাজ শেষ করে দুপুরের দিকে বাড়িতে আসি। বাড়িতে এসে দেখি সবাই কান্নাকাটি করছে। কী হয়েছে জানতে চাইলে বলে, আবু সাঈদ মারা গেছে। এ খবর শুনে মনে হলো ‘আমার মাথায় আসমান ভেঙে পড়েছে।’
মকবুল হোসেন বলেন, ‘তাত্ক্ষণিক খবর নিতে বিশ্ববিদ্যালয়ে দুই ছেলে ও মেয়ের জামাইকে পাঠাই। তারা গিয়ে দেখেন আবু সাঈদের লাশ সেখানে নেই। লাশটি ময়নাতদন্তের জন্য হাসপাতালে নিয়ে গেছে। এর পর তারা রংপুর মেডিক্যালে যান। প্রথমে লাশ দেখতে চাইলে পুলিশ দেখতে দেয়নি। একপর্যায়ে ছেলে-জামাইয়ের চাপে লাশ দেখতে দেওয়া হয়।’
তিনি আরো বলেন, ‘রাত আনুমানিক সাড়ে ৩টার দিকে আবু সাঈদের লাশ বাড়িতে আনা হয়। তবে ইউএনও ও প্রশাসনের লোকজন বলল, রাতেই লাশ দাফন করতে হবে। কিন্তু আমরা রাজি না হয়ে পরদিন সকাল ৯টায় দুই বার জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করি। লাশ বাড়িতে আনার পর গোসল করানোর সময় দেখি মাথার পেছন দিক দিয়ে রক্ত ঝরছে। বুকসহ সারা শরীর রক্তে ভেজা। বুকে গুলির চিহ্ন দেখতে পাই। আমাকে একবারই লাশ দেখতে দিয়েছে। পরে শুনতে পাই আমার ছেলেকে গুলি করে হত্যা করেছে এএসআই আমির হোসেন ও কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায়।’ তিনি বলেন, ‘হত্যাকাণ্ডের কয়েক দিন আগে আবু সাঈদকে গলা টিপে ধরাসহ চড়-থাপ্পড় মারেন ছাত্রলীগ (নিষিদ্ধ) নেতা পমেল বড়ুয়া। আমার ছেলেকে যারা নির্মমভাবে শহিদ করেছে তাদের কঠোর বিচার চাই। হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ছাত্রলীগ (নিষিদ্ধ)-যুবলীগ নেতাদেরও বিচার চাই।’
জবানবন্দি শেষে সাক্ষীকে আসামি শরিফুল ইসলামের পক্ষে জেরা করতে ডায়াসে যান অ্যাডভোকেট আমিনুল গণি টিটো। আবু সাঈদ হত্যার ঘটনায় রংপুরে হওয়া মামলার বিষয়ে একটি প্রশ্ন করতে যান তিনি। এ পর্যায়ে ট্রাইব্যুনাল বলেন, সাক্ষী যে জবানবন্দি দিয়েছেন তার মধ্যে প্রশ্ন করতে হবে। এর বাইরে যাওয়ার সুযোগ নাই। কারণ আমরা আইসিটি অ্যাক্টে বিচার করছি। পরে এই আইনজীবী বলেন, যেহেতু আমার আসামির নাম বলেনি সেহেতু জেরা করতে অস্বীকার করছি। আবু সাঈদের পিতার পর সাক্ষ্য দেন এনটিভির স্থানীয় সাংবাদিক এ কে এম মইনুল হক। এ সময় প্রসিকিউটর আব্দুস সোবহান তরফদার, মিজানুল ইসলাম, গাজী এম এইচ তামিম, ফারুক আহমেদ, বি এম সুলতান মাহমুদ, আব্দুস সাত্তার পালোয়ান প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।