কত্ত বুড়ি-ছুড়ি ওঠে!

আঁখি আর ময়না দু বোন। আঁখি দু বছরের বড়। তবে ময়নার ডাগর চোখ আর চামড়ার রঙে ফর্সা বলে সবার নজর কাড়ে। আঁখি বেশ শ্যামলা মেয়ে। তবে পাক্কা ঘরোনি হওয়ার গুণাবলিসম্পন্ন। পাকনা ময়নার সঙ্গে একই ক্লাসে পড়তে হয়েছে আঁখিকে। বাবা-মায়ের কথা, দুজন একই ক্লাসে পড়লে তাদের সুবিধা হয়। তাই ওয়ানে আর টুতে আঁখিকে একই বই দু বছর ধরে পড়তে হয়েছিল।

গ্রামের কম আয়ের মানুষের সংসার আঁখি-ময়নার বাবার। যাঁরা হালকা স্বচ্ছল তাদের সবার ছেলেমেয়েদের হাতে অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল। আর সেই মোবাইলে ফেসবুক অ্যাকাউন্ট খুলে দেশ-বিদেশের হাজার হাজার বন্ধু বানিয়ে চালায় চ্যাট, লাইক, কমেন্টস। কিন্তু আঁখি-ময়না সংসারের টানাপোড়েনের হাল দেখে কখনোই বাবার কাছে শখের কথা প্রকাশও করেনি। বন্ধুদের মধ্যে একজনের মোবাইলে ময়না নিজের নামে একটি আইডি খুলে। কিন্তু হামেশাই অন্যদের মতো ঢুঁ মারতে পারে না ‘ময়না মারিয়া’ আইডিতে। আর আঁখি এ বিষয়ে তেমন কোনো আগ্রহই দেখায় না।

মাত্রই এইচএসসি পরীক্ষা শেষ। পরীক্ষা শেষে রেজাল্ট অব্দি মাস দুয়েক সময়। এই সময়ে বাড়িতে বসে থাকা ময়নার জন্য খুবই বিরক্তিকর। তাই ঢাকায় খালার কাছে ঘুরে আসবে বলে বায়না ধরে বাবার কাছে। বাবাও রাজি না হয়ে পারেন না। তবে ময়না ঢাকা যাবে। আর বাড়িতে থাকবে আঁখি।

ময়না ঢাকার মিরপুরের খালার বাসায় ঘুরতে চলে যায়। এদিকে বাড়িতে বিয়ের প্রস্তাব আসে। পাত্রপক্ষ ময়নার কথা বললেও সে বাড়িতে না থাকায় তার পরিবর্তে আঁখিকে দেখে। পাশের গ্রামেরই বিয়ের যোগ্য ছেলে জাহিদুল ঢাকায় থাকে। বাড়িতে বেড়াতে এসেছে। বাবা-মা আর পড়শিদের কথায় আঁখিদের বাড়িতে মুরব্বিরাসহ কন্যা দেখতে এসেছিল।

আঁখির অমায়িক ব্যবহার দেখে জাহিদুল এবং তার পরিবারের লোকজনের পছন্দ হয়ে যায়। তাত্ক্ষণিক সিদ্ধান্ত হয় যে, আগামী মাসের মধ্যে বিয়ের কাজ সম্পন্ন করা হবে।

খবর পৌঁছে যায় ময়নার কাছে। আঁখির বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে শুনে অনেক আনন্দ পায় ময়না। সামনের সপ্তাহে বাড়ি আসবে সে। আঁখির কাছে জেনেও নেয় যে, পাশের গ্রামের জাহিদুলই ঠিক হয়ে থাকা পাত্র। জাহিদুলকে আগে থেকেই চিনত ময়না। হবু দুলাভাই নাকি ঢাকায় কোনো এক ভালো কোম্পানিতে ট্রান্সপোর্টসের চাকরি করেন।

একদিন পরে ময়না আর তার খালাতো বোন মিরপুরের রাস্তায় একটা কাজে বেরিয়েছিল। রাস্তার ডানপাশে একটা হোন্ডায় দুজন আরোহী দেখে নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছে না ময়না। কেমন করে সম্ভব, একজন বিয়ে ঠিক হয়ে থাকা পুরুষ মানুষ আরেকজন মহিলাকে হোন্ডার পিছনে বসিয়ে ঢাকা শহরে ঘুরে বেড়ায়! মেজাজ চরমে উঠে যায় তার। সঙ্গে সঙ্গে খালার বাসায় ফিরে বাড়ির মোবাইলে আঁখিকে ফোন করে জানতে চায়, সত্যি সত্যি পাশের গ্রামের জাহিদুলের সঙ্গে বিয়ে ঠিকে হয়েছে কি না? আঁখি ময়নার গলায় কঠিন রাগ বুঝতে পারে। তবুও জানায় যে, সত্যি সত্যিই জাহিদুলের সঙ্গে আঁখির বিয়ে ঠিক হয়েছে।

ময়নার মনের সন্দেহ যায় না। তাই ছবির সঙ্গে মিলিয়ে দেখার জন্য আঁখিকে বলে জাহিদুলের একটা ছবি সংগ্রহ করে যেন ফেসবুক মেসেঞ্জারে তাকে পাঠায়। আঁখি তার বাবাকে বলেকয়ে জাহিদুলের বাড়ি থেকে একটা ছবি সংগ্রহ করে পাশের বাড়ির হামিদার মোবাইল থেকে মেসেঞ্জারে পাঠিয়ে দেয়। ময়না মিরপুরে বসে সেই ছবি দেখে তুলকালাম কাণ্ড বাঁধিয়ে দেয়। সব ঘটনা ফাঁস করে দেয় বাবার কাছে। বাবাও ক্ষেপে যায়, ‘কী, এরকম একজন লম্পটের সঙ্গে আমার মেয়েকে আমি বিয়ে দিতে যাচ্ছিলাম। এ বিয়ে কস্মিনকালেও হবে না।’ জাহিদুলের বাড়িতে লোক মারফত বিয়ে ভাঙার খবর পাঠিয়ে দেয়। জাহিদুলের বাড়ির লোকজনও বিস্মিত। তারা জাহিদুলকে জানিয়ে দেয় বিয়ে ফাইনালে গড়ানোর আগে শিকেয় তোলার নিউজ।

জাহিদুল অপমানিত বোধ করে সেদিনই বাড়ি ফিরে আসে। সাঁঝের বেলায় চলে যায় আঁখিদের বাড়িতে। আঁখির বাবাকে তলব করে বসে বিয়ে শিকেয় তোলার হেতু সম্পর্কে। তখন ময়নার দেখা ঘটনার বর্ণনা দেন বাবা। জাহিদুল ক্ষেপে বলে ওঠে, ‘আমি হচ্ছি পাঠাওয়ের একজন রাইডার। আমার হোন্ডার পিছনে প্রতিদিন কত বুড়ি-ছুড়ি ওঠে তার কোনো ইয়ত্তা নেই! আর সেটা নিয়া আপনারা বিয়াটা ভাঙনের ব্যবস্থা করতাছেন!’

কিশোরগঞ্জ