‘আমপন্থী’ আমজাদ!

রাজনৈতিক নেতা হওয়ার স্বপ্নে দিবারাত্রি বিভোর থাকে আমার বন্ধু আমজাদ হোসেন ওরফে ‘Mango Z’। আমজাদ বলে কমই ডাকা হয় তাকে। ক্ষ্যাপানোর জন্য আমরা তাঁকে ‘Mango Z’ বলে ডাকি। আবার, সে আম দেখলেই উল্টা পথে দৌড়ায়, আম সহ্যই করতে পারে না সে। আবার, স্কুল-কলেজের বন্ধুরাও নাকি তার নাম নিয়ে খুব জ্বালিয়েছে তাকে। কেউ কেউ নাকি তাকে ‘আম’ বলে ডাকত! আর আমরা এখন ‘Mango Z’ বলি। শুনেছি, আমজাদের গার্লফ্রেন্ড নাকি আদর করে তাকে ‘আম বাবু’ বা ‘আমু’ বলে মাঝে মাঝে।

তবে, সে তার গার্লফ্রেন্ডের সঙ্গে রাগ করে কি না তা জানা যায়নি।

তো আমাদের সেই আমজাদ ভার্সিটিতে এসে টানা দু বছর ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র রাজনীতি করে, পলিটিকাল বড় ভাইদের ‘সহমত ভাই’ বলতে বলতে এবং ব্যাপক তৈল+গ্যাস দিতে দিতেও যখন তার একটি মাত্রও ভালো পোস্ট জুটলা না, তখন সে সিদ্ধান্ত নিল পলিটিক্স বাদ দেওয়ার।

মাস খানেক রাজনীতি বাদ দিয়ে পড়াশোনায় বেশ মনোযোগী হয়ে গেল সে।

এদিকে তার সঙ্গে দেখা হলেই বলে, ‘বুঝলি বেটা, পড়াশোনা করতে হবে। কিসের পলিটিক্স, কিসের কী? এখন থেকে অনলি স্টাডি ইজ রিয়াল, বাকি সব বার্সা! যা রুমে যেয়ে পড়তে বস।’

এরপর ক’দিন আর তার সঙ্গে দেখা হলো না। হঠাত্ একদিন দেখি ক্যাম্পাসে তার ছবিসংবলিত পোস্টার। তাতে লেখা, ‘রাজপথের লড়াকু সৈনিক, স্লোগান মাস্টার, নিষ্ঠাবান ও একনিষ্ঠ কর্মী, অমুক পার্টির সহ-সম্পাদক, জনাব অমজাদ হোসেন ভাইয়ের ডাকে সাড়া দিয়ে মানববন্ধনে যোগ দিন, সফল করুন।’

ব্যস, বুঝতে আর বাকি রইল না আমজাদ আবার রাজনীতিতে যোগ দিয়েছে। এবার বামপন্থী একটা দলের ছাত্রফ্রন্টে। পোস্টও পেয়ে গেছে সহ-সম্পাদকের।

এ দিনটির পর কিছুদিন আমজাদকে দেখলাম তার ফেসবুক অ্যাকাউন্টে নানারকম মানববন্ধন আর মৌনমিছিলের ছবি পোস্ট করতে। সব ছবিতেই ব্যানার ধরে পোজ দিয়েছে সে। তার ছবিতে তার আশপাশে লোকজন অতি কম। বুঝলাম দিনকাল ভালোই যাচ্ছে আমাদের ‘Mango Z’ বা আমজাদের।

চার মাস পর আমাদের সেমিস্টার ফাইনাল শুরু হচ্ছে। পরীক্ষার আগের দিন আমি রুমে বসে পড়ছি আর আম ছোট করে কেটে চামচ দিয়ে খাচ্ছি, এমন সময় আমজাদ এসে হাজির। সে এসে প্রথমেই বলল, ‘ওই বেটা, আম সরা আমার সামনে থেকে, দেখতে পারি না এটাকে আমি। মানুষ কেমনে আম খায়!’

আমি আম সরিয়ে রাখার পর সে বলল, ‘কয়েকটা শিট দে বেটা। পড়তে হইব, নইলে ফেইল, ডাহা ফেল একদম!’

তাকে শিট দেওয়ার পর সে কী যেন মনে করে বলল, ‘এক পিস দে তো, একটু খাই। দশ বছর ধরে খাই না।’

‘তোদের বাড়ির আম নাকি?’

তার দিকে এক পিস এগিয়ে দিতে দিতে মজা করে বললাম, ‘না, আমাদের পুকুরের আম।’

আমজাদ আমার হাত থেকে পুরো প্লেটটা নিয়ে নিল। একে একে সবকয়টা পিস সাবাড় করে দিয়ে সে এতক্ষণে পগারপার। তবে যাওয়ার আগে বলে গেল, ‘শোন্, আমি যে মাত্র আম খাইলাম এইটা কাউকে বলিস না কিন্তু।’

পরীক্ষা শেষ হয়েছে। আমজাদের সব পরীক্ষা ভয়াবহ রকমের খারাপ হয়েছে। তার মন ভীষণ খারাপ। আমাকে ডেকে নিয়ে বলল, ‘শোন বেটা, বামপন্থী-টন্থি এসবও বাদ। সারাদিন মানববন্ধন কইরা, মিছিল-টিছিল কইরা লাভ নাই। আমি এহন থাইকা মন দিয়া পড়াশোনা করমু আর এর লগে লগে ব্যবসা করমু। রেজাল্ট খারাপ করি তাই বাড়ি থেকে আব্বায় টাকা কম দেয়।’

আমি অবাক হয়ে বললাম, ‘কিসের ব্যবসা?’

আমজাদ বলল, ‘আরে কিসের আবার, আমের। এহন থাইকা আমি ডানপন্থীও না, বামপন্থি ও না। আমপন্থী! আমের ব্যবসায় লাভ আছে। আর এহনতো আমের ভরা মৌসুম।’

আমি এবার রীতিমতো থ হয়ে তাকালাম তার দিকে। এই লোক তো আম সহ্য করতে পারে না, তাহলে আমের ব্যবসা? কিভাবে সম্ভব?

দুদিন পর দেখলাম ফরমালিন ছাড়া ও ভেজালমুক্ত আম বিক্রির লক্ষ্যে সে একটি ফেসবুক পেজ খুলেছে। ওটার নাম দিয়েছে, ‘আমজনতার জন্য খাঁটি আম।’

পেইজে অর্ডার নিয়ে হোম ডেলিভারি দিয়ে আসে বাসায় বাসায়। ব্যবসায় ভালো উন্নতি হচ্ছে তার, সেই সঙ্গে পড়াশোনায়ও।

আমাদের সেই আমজাদ বা ‘Mango Z’ এখন এক নামে ‘আমপন্থী আমজাদ’ নামে পরিচিত! তার ডেলিভারিকৃত আমেরও বেশ নামডাক হয়েছে চারদিকে।

ঠিকানাবিহীন