গুজবের হাত-পা মুখ-ঠোঁট!

হিরুর ছোটকুর বিয়ের সময়কার ঘটনা। তণু কাকি তখনো ওর জামশেদ কাকুর বউ হননি। বরং তাঁকে (পাত্রী) দেখতে যাওয়ার চূড়ান্তকাল ছিল ওটি।

প্রথমবার পাত্রী দেখতে গিয়ে হিরুর কারণে ভজঘট বেঁধে গিয়েছিল। তণু কাকি হিরুকেই পাত্র ভেবে বসেন। কিন্তু হিরুকে ছিলা মুরগির মতো (ক্লিন শেভ) দেখে তার চান্দি গরম হয়ে যায়। ওদিকে, তাঁর ছোটবোন মৌ এসে জানায়, পাত্রকে তাঁর নিজের জন্য খু-উ-ব পছন্দ হয়েছে! ব্যস, তখনি তণু কাকি বেঁকে বসেন। যেই পাত্র তাঁকে দেখতে এসেছে, পাত্রকে যদি তাঁর পছন্দ নাও হয়, সেটাকে তো আর নিজের ছোটবোনের জন্য ছেড়ে দিতে পারেন না। অপছন্দ হওয়া পাত্রকে কেউ পাবে না! বিয়ে ক্যান্সেল। পরে অবশ্য ভুলটা ভাঙে তাঁর। তিনি যখন আসল পাত্রকে শনাক্ত করেন, ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। পাত্রপক্ষ চলে গেছে। এমনকি তিনি নাকি পাত্রপক্ষকে ঠিকঠাক দেখেনওনি!

শেষমেশ দ্বিতীয়বারের মতো কনে দেখার আয়োজন করলেন মুরব্বিরা। হিরুর মতে, এই পর্বের নাম কনে দেখা না দিয়ে ‘পাত্র দর্শন’ দেওয়া উচিত ছিল।

হিরুর ছোটকুর আনন্দ তখন দেখে কে! একে তো আগেরবার পাত্রী হিরুকে অপছন্দ করেছে, তাই এখন তার মনের আনন্দ দ্বিগুণ। আর, এবার স্বয়ং কনেপক্ষ তাদের ডেকেছে দেখে ছোটকু মোটামুটি শিওর হয়ে গেছে, পাত্রীর বাড়ির সবাই তাকে হেভভি পছন্দ করেছে। বিয়ে এখানে হবেই।

হিরুরা দলবলে পাত্রীর বাড়িতে পৌঁছানোর পূর্বেই সেখানে খবর রটে গেল। পাত্র আহত!

—কিভাবে?

—পাত্রের মুখে রক্ত দেখা গেছে।

চারদিকে খবর ছড়িয়ে পড়ল, আসতে গিয়ে পথে পাত্র আহত হয়েছে। ভয়ংকর অ্যাক্সিডেন্ট। পাত্রের মুখ দিয়ে কলকলিয়ে রক্ত ঝরে পড়ছে। তাড়াতাড়ি অ্যাম্বুলেন্স ডাকার কথাও বলল কেউ কেউ।

কিছুক্ষণের মধ্যে ঘটনা অন্য মাত্রা নিল। জানা গেল, পাত্রের গাড়ি অ্যাক্সিডেন্ট করেনি। আসার পথে পাত্র একটা ঝোপের পাশে গাড়ি থামাতে বলেছিল। তারপরই তার ঠোঁটে রক্ত! সম্ভবত পাত্র ওই ঝোপের কাছে কোনো সাপেকাটা বালিকাকে পড়ে থাকতে দেখেছে। দুই ঠোঁট দিয়ে চুষে সেই বিষ বের করেছে!

—মেয়েটি কে?

—পাত্রের দয়ার শরীর। অচেনা কাউকে বিবেকের তাড়নায় বাঁচিয়েছে।

—না না, এই যুগে কেউ এভাবে নিজের জীবনকে ঝুঁকিতে ফেলে অপরিচিত কোনো মেয়েকে বাঁচাতে যায় না। নিশ্চয়ই মেয়েটি পাত্রের সাবেক প্রেমিকা হবে। ব্রেকআপ হলেও প্রেম শেষ হয়নি। সাপেকাটা গার্লফ্রেন্ডকে দেখে প্রেম উথলে উঠেছে!

এসব আলোচনার মাঝেই হিরুরা ও বাড়িতে পৌঁছাল। ছোটকু সগৌরবে ঘোষণা দিলেন, ‘এটা রক্ত নয়।’

—তাহলে?

‘ও কিছু নয়।’ ছোটকু লাজুক বদনে বললেন।

মুহূর্তেই রটে গেল, পাত্র ঠোঁটে লিপস্টিক মাখে। খবরটা পাত্রীর কানে পৌঁছাতেও সময় নিল না। হিরুর হবু তণু কাকি তখন গর্জে উঠলেন, ‘না, আমি কোনো লিপস্টিক মাখনেওয়ালা ছেলেকে বিয়ে করব না। ছেলের চেহারাও দেখতে চাই না। ওদের চলে যেতে বল।’

একটু পরে গুজব ঘুরে আবার যখন ছোটকু অব্দি এল, তিনি তব্দা খেয়ে গেলেন। মিনমিন করে বললেন, ‘এটা তো লিপস্টিক নয়।’

—তাহলে?

—পাত্র পান খায়!

‘এই বয়সেই পান খেয়ে ঠোঁট লাল করে ফেলেছে। ও ঠোঁটে কী করে ঠোঁট ছোঁয়াবে দিদি?’ কথাটা হিরুর তণু কাকিকে তাঁর ছোট বোন মৌ মজার সুরে বলল।

মুহূর্তের মধ্যেই তণু গর্জে উঠলেন, ‘এমন হাঁদারামকে বিয়ে করার প্রশ্নই আসে না। যে পাত্রী দেখতে আসে পান খেতে খেতে! বলি এ বাড়িতে কি তাকে মানুষ নাস্তা দিত না? পানটা তো সে নাস্তা খাবার পরেও খেতে পারত!’

সম্পর্ক পাকা হওয়ার আগেই মোটামুটি ভেঙে যাওয়া কনফার্ম। পাত্রপক্ষ, আই মিন, হিরুদের সামনে নাস্তা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সবাই দ্বিধায় আছে। নাস্তাটা কি খাওয়া ঠিক হবে? আবার এতদূর অব্দি এসেছে, বেরিয়েছেও সেই সাতসকালে, ওদিকে ক্ষুধাও লেগেছে চরম, না খেয়ে যাওয়াটা চরম বোকামি হবে!

হিরু বিড়বিড় করে তার ছোটকুকে বলল, ‘তোমার আর আক্কেল বুদ্ধি হলো না। শেষপর্যন্ত ঠোঁটে লিপস্টিক মাখার অভ্যাসও করলে!’

ছোটকু ইতস্তত বললেন, ‘আরে, ঘটনা কী হয়েছে শোন। বাসা থেকে ফেসিয়াল টিস্যু আনতে ভুলে গেছিলাম। এদিকে বিয়ে করতে যাচ্ছি, বুঝিসই তো, একটু বেশিই এক্সাইটেড ছিলাম। ঘনঘন ঘামছিলাম। শেষে তোদের চোখের আড়ালে, আই মিন, ওই ঝোপের ভিতরে গিয়ে পকেটে থাকা টয়লেট টিস্যু দিয়েই মুখটা মুছে নিই।’

‘টয়লেট টিস্যুতে ঠোঁট লাল হয় কী করে?’

‘জানিসই তো অধিকাংশ টয়লেট টিস্যু হয় লালরঙা।’

‘তো?’

‘চলন্ত গাড়িতে বসে পানি খেতে গিয়ে প্যান্টে পানি পড়ে যায়। সেই পানিতে পকেটে থাকা ওই টিস্যুগুলো যায় ভিজে। আর ভিজে টিস্যু যখন ঠোঁটে ছোঁয়াই, তখন...’

‘থাক থাক, আর বলতে হবে না।’ এই বলে হিরু নাস্তার দিকে হাত বাড়াল।

 

নাস্তা শেষ। এবার ওঠার পালা। কারণ, এতক্ষণেও পাত্রীর দেখা মেলেনি। বিয়ে আর এখানে হচ্ছে না, ছোটকুরা এমনটাই ধরে নিচ্ছে।

তখন হিরু ছোটকুর কানে কানে বলল, ‘একটু পরিপাটি হয়ে বসো। পাত্রী আসবে একটু পরেই।’

‘তুই কী করে বুঝলি?’

‘গুজব!’

‘মানে?’

‘মানেটা হলো, এতক্ষণ ধরে তোমার ঠোঁটের ওই রং নিয়ে বিস্তর গুজব ছড়াচ্ছিল এদিক-ওদিক। একটু আগে আমাদের আলাপ, আই মিন, তোমার ঠোঁট রাঙা হওয়ার আসল ঘটনাও আর গোপন নেই। পাত্রী আসল ঘটনা শুনে আবার মেকআপ নিচ্ছে। একটু ধৈর্য সহকারে বসো। মেয়েদের একবার মেকআপ ছেড়ে আবার মেকআপ নেওয়াটা যে কী যন্ত্রণার তা জানো তো?’

‘এই, তুই তো আমার পাশেই বসা। এখানে বসে এত এত খবর পেলি কী করে?’

হিরু মুচকি হেসে বলল, ‘যখন একটা ভুয়া খবর ছড়ায়, সেটা হয় গুজব। আর একটা ভালো খবর ছড়ালে সেটা হয় গুড-জব। এতক্ষণ ধরে চলা গুজব শেষে দুটো ভালো খবর ছড়াল। একটা তোমার লিপস্টিক সম্পর্কিত। আরেকটা পাত্রীর সাজগোজ সম্পর্কিত। একটু আগে আমাদের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় একজনকে বলতে শুনলাম, ‘মেয়ের ঢং দেখে বাঁচি না। বলে কিনা মেকআপ ছাড়াই পাত্রের সামনে যাবে! আর আমাদেরও হয়েছে ঘাট। এখন তাকে মেকআপ করাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে সকলে।’’

ছোটকুর মুখে বিস্তৃত হাসি।

‘কী হলো, কনে মেকআপ পছন্দ করে না শুনে তোমার মনের ঘণ্টা বেজে উঠেছে যেন!’

ছোটকু কিছু না বলে কেবল হেঃ হেঃ করতে লাগল। তার মুখের হাসি আরও বিস্তৃত হলো, যখন কনেকে আসতে দেখা গেল।

আনন্দের আতিশয্যে ছোটকু হিরুকে জড়িয়ে ধরে ওর গালে চুমু খেল। হিরু স্মিত হেসে বলল, ‘দিলে তো আমার গালে লিপস্টিক লাগিয়ে!’

ছোটকু হিরুর হাত চেপে ধরে বলল, ‘তোর পায়ে পড়ি, গুজব ছড়িয়ে বিয়েটা ভেঙে দিস না!’

 

দুই.

এলাকায় হিরুর জনপ্রিয়তা অনেকেই নিতে পারেন না। এদের একজন মুহিত কেবলাপুরি। কেবলাপুরি খেয়াল করেছে, হিরুকে দেখলে অপরিচিত শিশুরাও খুশি হয়। হিরুর সঙ্গে খুনসুটি শুরু করে দেয় ওরা। কেবলাপুরি খুব করে চায় হিরুকে জব্দ করতে। নিজের দলবল নিয়ে পাশের গ্রামে গেল ওরা। সেই সঙ্গে কোনো একটা কাজের উছিলায় হিরুকেও সঙ্গে নিল।

পাশের গ্রামে গিয়ে হিরু দলটা থেকে একটু পিছিয়ে পড়ে একটা স্কুলের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। কোলে করে একটা শিশুকে নিয়ে অদূরের আইসক্রিম বিক্রেতার নিকট গেল। শেষের দৃশ্যটা কেবলাপুরির চোখে পড়তেই চোখজোড়া নেচে উঠল ওর। আরে, এ যে মেঘ না চাইতেই বৃষ্টি! চেয়েছিল হিরুকে অন্যভাবে ফাঁসাবে। আর হিরু কিনা নিজে থেকেই ফেঁসে গেল। কেবলাপুরির কথামতো ওর পুরো দলটা চিক্কুর দিয়ে উঠল, ‘ছেলেধরা! ছেলেধরা!’

মুহূর্তেই এলাকার লোকজন দা-বটি-লাঠি, মোদ্দাকথা হলো, হাতের কাছে যা কিছু পেল, তাই নিয়ে ছুটে এল।

‘কই, ছেলেধরা কই?’ সকলে উত্তেজিত।

কেবলাপুরি কোলে একটা শিশুসহ হিরুকে দেখিয়ে দিল।

মুহিত কেবলাপুরি ভেবেছিল, এই বুঝি সকলে মিলে হিরুর ওপরে অতর্কিত হামলা চালাবে। তারপর হিরুর অবস্থা হয়ে যাবে আলুভর্তা টাইপ। কিন্তু তার আশায় গুড়েবালি। সকলে দেখল, পিচ্চিটা হাতে আইসক্রিম নিয়ে অদূরে দাঁড়ানো এক হাস্যোজ্জ্বল মহিলার দিকে দৌড়ে গেল।

‘ওটা তো হিরুর বোনের মেয়ে। ওই তো ওর বোন।’একজন বলে উঠল।

 

হিরু এতক্ষণের ঘটনা সম্পর্কে কিছুই জানত না। ও মুহিত কেবলাপুরির দিকে এগিয়ে এল। আরো অনেক লোকজনকে এভাবে উত্তেজিত অবস্থায় দেখে তাদের কাছে জানতে চাইল, ‘কী হয়েছে?’

‘ছে-ছে-ছেলেধরা!’ লোকজনের মধ্য থেকে একজন বলল।

হিরু জানতে চাইল, ‘কই? কোথায় ছেলেধরা? চলুন তাকে ধরে পুলিশে দিই।’

‘ওই যে...’ লোকজন মুহিত কেবলাপুলিকে দেখিয়ে দিল।

এর পরপরই মুহিত কেবলাপুরির সঙ্গের লোকজনই তাকে মারতে শুরু করে দিল। হিরু উপস্থিত ওই লোকগুলোকে সঙ্গে নিয়ে কেবলাপুরিকে উদ্ধার করল।

একটু ধাতস্থ হওয়ার পরে কেবলাপুরি তার লোকদের কাছে জানতে চাইল, ‘তোমরা আমাকে এভাবে মারলে কেন?’

‘কেন, ওনারাই তো তোমাকে দেখিয়ে বলল, ওই ছেলেধরা!’

মুহিত কেবলাপুরির তখন ‘ছেড়ে দে মা, কেঁদে বাঁচি’ অবস্থা! সে বলল, ‘ভাইসাব, গুজবে কান দিবেন না। এমনকি হাত-পাও দিবেন না।’ মাইর খেয়ে নিজের ঝিমধরা হাত-পা একটু ঝাঁকিয়ে ফের বলল, ‘কাউকে ছেলেধরা বললেই সে অপরাধী হয়ে যায় না। আগে যাচাই করুন। সত্যিকার অপরাধী হলে তাকে আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর কাছে সোপর্দ করুন। আইন নিজের হাতে তুলে নিবেন না।’

পাশ থেকে মুহিত কেবলাপুরির একজন চ্যালা বিড়বিড় করে উঠল, ‘হাঃ হাঃ, এ যে ভূতের মুখেই রাম নাম!’   g