আন্তর্জাতিক আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবস

'মানব জনম সার, এমন পাবে না আর'

ইন্টারন্যাশনালতে অ্যাসোসিয়েশনদর ফর সেপ্টেম্বর বিশ্বব্যাপী 'বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবস' পালন করে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, প্রতি বছর প্রায় ৮ লাখ নারী-পুরুষও আত্মহত্যা করেন, অর্থাৎ প্রতি ৪০ সেকেন্ডে এক জন নারী বা পুরুষ আত্মহত্যা করছেন। এ লেখাটি যখন পাঠক পড়ছেন, তখন হয়তো ১০ জন আত্মহত্যা করে ফেলেছেন আর প্রায় ৪০ জনের বেশি আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন। দুশ্চিন্তার বিষয় হলো, প্রতি বছরই এ হার বৃদ্ধি পাচ্ছে। সাধারণত দরিদ্র দেশগুলোতে আত্মহত্যার হার বেশি হলেও উন্নত বিশ্বের দেশগুলোর মধ্যে জাপানে আত্মহত্যার হার সবচেয়ে বেশি। পৃথিবীর সুন্দর সব কিছুকে প্রত্যাখ্যান করে স্বেচ্ছায় নিজ জীবনাবসানের নাম আত্মহত্যা। আত্মহত্যা মানে নিজেকে নিজে খুন করা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সংজ্ঞানুসারে আত্মহত্যা হলো সজ্ঞানে এমন একটি ভয়ানক কাজ করা, যা কোনো ব্যক্তির মৃত্যু ঘটায় এবং ব্যক্তি ঐ কাজের প্রত্যাশিত ফলাফল সম্পর্কে আগে থেকেই পুরোপুরি অবগত থাকে।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে আত্মহত্যা একটি প্রতিরোধযোগ্য ভয়াবহ মেডিক্যাল এবং সামাজিক ব্যাধি। এটি কোনো সমাধান নয়, বরং সমস্যার কারণ। মায়ের সঙ্গে অভিমান করে দূর গাঁয়ের কিশোরী মেয়ে যেমন কীটনাশককে অবলম্বন করে পালিয়ে যায় জীবন থেকে, তেমনি মেগাসিটির অভিজাত উচ্চশিক্ষিত ব্যক্তিও তার অন্তর্জগতের তাড়িত বোধ থেকে রেহাই পেতে বেছে নেয় আত্মহননের পথ। এ তালিকা থেকে মুক্তি পায়নি ইউনিভার্সিটির প্রবীণ শিক্ষক, চিকিৎসক, প্রতিষ্ঠিত সাংবাদিক, অভিনয়শিল্পী, সরকারি কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী, পুলিশ থেকে শুরু করে স্কুলে পড়া ছোট শিশুও। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০১৯ সালে দেশে আত্মহত্যা করেছে ১০ হাজারের বেশি মানুষ। বিবিএসর জরিপ বলছে, বাংলাদেশে বছরে গড়ে আত্মহত্যা করছে প্রায় ১৩ হাজার মানুষ। বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি আত্মহত্যার ঘটনা ঘটছে ঝিনাইদহে।

সাধারণত কিশোর-কিশোরীদের (টিনএজ) মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা বেশি দেখা যায়। আত্মহত্যার পেছনের অন্যতম কারণ ডিপ্রেশন বা বিষণ্ণতা, একাকিত্ব, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, দারিদ্র্য, সামাজিক বৈষম্য, বেকারত্ব, দাম্পত্য কলহ, সম্পর্কে টানাপড়েন, অভাব-অনটন, দীর্ঘস্থায়ী শারীরিক ও মানসিক রোগ, পারিবারিক দ্বন্দ্ব-কলহ, সম্পর্কের অবনতি, মাদকাসক্তি, প্ররোচনা, হঠাৎ রেগে গিয়ে নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারানো এবং দৈহিক, মানসিক ও যৌন নির্যাতন। আত্মহত্যার চেয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করার পরিসংখ্যান বহুগুণ বেশি। কেউ একবার আত্মহত্যার চেষ্টা করলে, আত্মহত্যার কথা বললে কিংবা আত্মহত্যার চিন্তা করলে তার মধ্যে এ দুর্ঘটনা ঘটানোর শঙ্কা অনেক অনেক বেশি থাকে।


জীবনটাকে যখন অর্থহীন মনে হয়, তখন কেউ চায় জীবন থেকে মুক্তি। তবে অনেক মনোবিজ্ঞানী এর পেছনে 'Bipolar Disorder'-কে দায়ী করেন। তাদের মতে যারা বিষণ্ণতা এবং একই সঙ্গে হর্ষোন্মত্ততায় পালাক্রমে ভোগেন তাদের মধ্যেই এই প্রবণতা অধিক হারে দেখা যায়। Neurochemist-^`i gGZ Serotonin (যা বিপাক ক্রিয়ার একটি উপজাত)-এর সঙ্গে আত্মহত্যার একট গভীর সম্পর্ক রয়েছে। যারা আত্মহত্যা করেছে তাদের ব্রেইনে অস্ত্রোপচার করে এই Serotonin-এর ঘাটতি লক্ষ করা গেছে। অন্য কিছুসংখ্যক গবেষণায় দেখা গেছে, যারা আত্মহত্যা করতে চেষ্টা করে, তারা সাধারণত সমস্যা সমাধানের ব্যাপারে অন্যদের চেয়ে বেশি rigid এবং চিন্তাধারায় তারা কম নমনীয় থাকেন।

জটিল মানসিক রোগ সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্তরা অন্যদের তুলনায় অনেক বেশি আত্মহত্যাপ্রবণ হয়ে থাকে। ১০ শতাংশ সিজোফ্রেনিক রোগী আত্মহত্যা করে। গবেষণায় দেখা গেছে, ২০-৪০ শতাংশ রোগী অসুস্থ থাকা অবস্থায় অন্তত একবার আত্মহত্যার চেষ্টা চালায়। সিজোফ্রেনিক রোগীদের মধ্যে যাদের বিষণ্ণতার উপসর্গ থাকে, তারা আত্মহত্যাপ্রবণ হতে পারে। অনেক সিজোফ্রেনিক রোগী 'গায়েবি আওয়াজ' শোনে, চিকিৎসা শাস্ত্রের পরিভাষায় যাকে 'Auditory Hallusination' বলা হয়। অনেক সিজোফ্রেনিক রোগীর মধ্যে অস্বাভাবিক সন্দেহ ও ভয় থাকে, যা তাকে সাধারণত দরিদ্র দেশগুলোতে আত্মহত্যার হার বেশি হলেও উন্নত বিশ্বের দেশগুলোর মধ্যে জাপানে আত্মহত্যার হার সবচেয়ে বেশি। পৃথিবীর সুন্দর সব কিছুকে প্রত্যাখ্যান করে স্বেচ্ছায় নিজ জীবনাবসানের নাম আত্মহত্যা। আত্মহত্যা মানে নিজেকে নিজে খুন করা পর্যায়ক্রমে সমাজ থেকে দূরে ঠেলে দেয়, একাকী করে রাখে। আবার কোনো কোনো রোগী সুস্থ হওয়ার পর্যায়েও আত্মহত্যার ঝুঁকিতে থাকতে পারে।

সবচেয়ে যে কারণে বেশি মানুষ আত্মহত্যা করে তার নাম বিষণ্ণতা। বিষণ্ণতা মানসিক রোগগুলোর মধ্যে কমন এবং ধ্বংসাত্মক একটি রোগ। এ রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি জীবন চলার ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়ে এবং কোনো কোনো রোগী অবলীলায় আত্মহত্যার মাধ্যমে মুক্তি পেতে চায়। তাই আর কিছু দিনের মধ্যেই হয়তো বিষণ্ণতা রোগটি পৃথিবীতে এক নম্বর 'কিলার ডিজিজ' হিসেবে পরিচিতি পাবে। যে কোনো লোক যে কোনো সময়ে বিষণ্ণতা রোগে আক্রান্ত হতে পারে। সঠিক সময়ে সঠিক চিকিৎসার মাধ্যমে শতকরা ১০০ ভাগ রোগীই ভালো হয়ে যেতে পারে। সারা বিশ্বে ক্রমবর্ধমান ডিপ্রেশনের এই ভয়াবহতা উপলব্ধি করেই ২০১৭ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবসের স্লোগান করা ছিল-'ডিপ্রেশন: লেটস টক' অর্থাৎ 'আসুন, ডিপ্রেশন নিয়ে আলোচনা করি'।

তরুণদের মৃত্যুর অন্যতম কারণ বিষণ্ণতাজনিত আত্মহত্যা। ডিপ্রেশনের ভয়াবহ দিকটি হচ্ছে রোগী নীরবে-নিভৃতে নিজেকে শেষ করে দেওয়ার (আত্মহত্যা) পথ বেছে নেন। ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সি তরুণ-তরুণীদের মৃত্যুর অন্যতম কারণ এই ডিপ্রেশনজনিত আত্মহত্যা। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে গেছে আত্মহত্যাকারীর সংখ্যা। সাধারণত দুভাবে আত্মহত্যা সংঘটিত হয়ে থাকে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে পরিকল্পনার মাধ্যমে আত্মহত্যা করে আর একটি হলো তাৎক্ষণিক উত্তেজনা বা তাড়নায় ইমপালসিভ আত্মহত্যা। পরিকল্পনাকারীদের মনে প্রথমে আত্মহত্যার ইচ্ছা জাগে, ইচ্ছার পর পরিকল্পনা করে, তারপর আত্মহত্যার জন্য attempt গ্রহণ করে।

ইন্টারেস্টিং বিষয় হলো, আইনের চোখেও আত্মহত্যার প্রচেষ্টা গ্রহণকারী একজন অপরাধী। আত্মহত্যার পর যেমন থানায় খবর দিতে হয়, তেমনি আত্মহত্যার চেষ্টা করলেও থানায় খবর জানানোর কথা বলা হয়েছে। আত্মহত্যার চেষ্টা করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। যদিও আইনটির প্রয়োগ নেই দেশে। পেনাল কোড ৩০৯ ধারায় বলা আছে, যে ব্যক্তি আত্মহত্যা করার উদ্যোগ করে এবং অনুরূপ অপরাধ অনুষ্ঠানের উদ্দেশ্যে কোনো কাজ করে, সেই ব্যক্তি বিনাশ্রম কারাদণ্ডে যার মেয়াদ এক বছর পর্যন্ত হতে পারে বা অর্থদণ্ড বা উভয়বিধ দণ্ডে দণ্ডিত হবে। বাংলাদেশে প্রচলিত দণ্ডবিধির (পেনাল কোড) ৩০৬ ধারায় আত্মহত্যা প্ররোচনার শাস্তির কথা বলা হয়েছে। আত্মহত্যা অনুষ্ঠানে সহায়তাকারী ব্যক্তির ১০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে। অন্যদিকে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ (সংশোধিত ২০০৩)-এর ৯ক ধারায় নারীর আত্মহত্যায় প্ররোচনার শাস্তির বিধান উল্লেখ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, কোনো নারীর সম্মতি ছাড়া বা ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোনো ব্যক্তির ইচ্ছাকৃত কোনো কার্য দ্বারা সম্ভ্রমহানি হওয়ার প্রত্যক্ষ কারণে কোনো নারী আত্মহত্যা করলে ঐ নারীকে অনুরূপ কার্য দ্বারা আত্মহত্যা করতে প্ররোচনা দেওয়া হয়েছে বলা হবে। এ আইনেও ১০ বছর শাস্তির বিধান করা হয়েছে।

আত্মহত্যা কখনো প্রতিবাদের অস্ত্র হতে পারে না, প্রতিবাদের ভাষা হতে পারে না। আত্মহত্যার ইচ্ছা, আগ্রহ জয় করতে হবে। জয় করার নামই জীবন। জীবন থেকে পালিয়ে যাওয়া হচ্ছে কাপুরুষতা। আত্মহত্যা মানে খুব সহজে হার মানা। আত্মহত্যার ঝুঁকি শনাক্ত করতে হবে স্বজনদের। ঝুঁকির আগেই ভূমিকা রাখতে হবে। কোনো বিষণ্ণতা বা প্রতিবাদ নয়, আসুন একসঙ্গে সবাই পৃথিবীতে বেঁচে থেকে বিষণ্ণতাকে জয় করি বা অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করি। আর আত্মহত্যা নয়, আত্মোপলব্ধি করি পৃথিবীর সব সুন্দরের। বাসযোগ্য পৃথিবী গড়ে তুলি হাতে রেখে হাত। ধর্ম, বর্ণ বা গোষ্ঠী নয়, আমাদের পরিচয় হোক আমরা সবাই মানুষ। চাই স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি, স্বাভাবিক মৃত্যুর জন্য আমরা আমাদেরকে প্রস্তুত করি। নিজেকে ভালোবাসতে শিখি, যারা আপনাকে নিয়ে ভাবছে-ভালোবাসছে তাদেরকে ভালোবাসতে শিখি, অন্তত তাদের জন্য হলেও বাঁচতে শিখি। কবি হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের অমর উক্তি 'মানবজনম সার, এমন পাবে না আর' মনে রাখি।

লেখক: ফিকামলি তত্ত্বের জনক, শিক্ষাবিদ, গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক