সাধারণত কোনো বিষয় বা ঘটনাকে দুটি দৃষ্টিকোণ থেকে আলোচনা করা যেতে পারে। এর একটি হলো ইতিবাচক এবং অপরটি হলো নেতিবাচক। আমি আমার চারপাশে থাকা বেশিরভাগ মানুষের ক্ষেত্রে দেখেছি, কোনো একটি ঘটনা ঘটার সঙ্গে সঙ্গে তারা প্রথমেই এর নেতিবাচক আলোচনা তুলে ধরেন। অথচ সেই বিষয়টা নিয়ে আরো যাচাই-বাছাই এবং চিন্তাভাবনা করার প্রয়োজন ছিল। যখন অধিকাংশ মানুষের চিন্তা-চেতনা নেতিবাচক হয়ে যায়, তখন একটি সমাজ কিংবা দেশের মধ্যেও এর একটা প্রভাব পড়ে যায়। কোনো বিষয়ে আশাহত হওয়া কিংবা নেতিবাচক চিন্তা করার আগে যদি আমরা একটু ঠান্ডা মাথায় বিষয়টা নিয়ে ভাবতে পারি, তাহলে হয়ত এই সমস্যা থেকে উত্তরণ পাওয়া সম্ভব। বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক আবুল কাশেম ফজলুল হক একটি লেখায় বলেছেন, ‘শূন্যবাদী (Nihilist) ও নৈরাশ্যবাদীদের (Pessimistic) জীবনদৃষ্টি একপেশে। সবদিকে দৃষ্টি প্রসারিত করলে বোঝা যায়, হাজার সমস্যার মধ্যেও জীবন ও জগত্ মানুষের জন্য অন্তহীন সম্ভাবনায় পূর্ণ।’
কদিন আগেই এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে। এখানে দেখা যাবে অনেকেই প্রত্যাশা অনুযায়ী ভালো ফলাফল করেছে আবার অনেকের প্রত্যাশাই পূরণ হয়নি। স্বাভাবিকভাবেই যারা ভালো ফলাফল করেছে তারা উল্লসিত এবং পুরোমাত্রায় আশাবাদী। আবার যাদের রেজাল্ট তাদের প্রত্যাশা পূরণ করতে ব্যর্থ হয়েছে তারা হয়ত মন খারাপ করে বসে রয়েছে। আমরা যদি এই বিষয়টিকে একটি সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করি তাহলে এখান থেকেও ইতিবাচক কিছু পেতে পারি।
অনেকের ধারণা রয়েছে, উচ্চশিক্ষা গ্রহণ কিংবা জীবনে সফলতার চূড়ায় পৌঁছাতে হলে ভালো ফলাফল করা বোধহয় চিরায়ত নিয়ম! আমি মনে করি, এটি একটি নেতিবাচক চিন্তাধারা। কারণ, আমি আমার বিশ্ববিদ্যালয়ে অসংখ্য বন্ধুদের ক্ষেত্রে দেখেছি, তারা এইচএসসিতে ভালো ফলাফল না করেও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভালো বিষয়ে পড়াশোনা করছে। অনেককেই দেখেছি, যারা পড়াশোনা পরবর্তী জীবনে গর্ব করার মতো সফলতা অর্জন করতে পেরেছেন।
অল্প পেয়ে সন্তুষ্ট হতে পারা মানবজীবনের অন্যতম বড়ো সফলতা। কিন্তু অধিকাংশ মানুষের মধ্যে আমরা এই বিষয়টা দেখতে পাই না। কিছু মানুষ শুধুই পেতে চান; তারা পানও বটে। কিন্তু জীবনের একেবারে প্রান্তে এসে উপলব্ধি করেন, তারা আসলে কিছুই পাননি। প্রখ্যাত লেখক ক্লাইভ বেল Zvui Civilization গ্রন্থে লিখেছেন, ‘যারা ‘আরো চাই, আরো চাই’ মন্ত্র জপ করেন, দেখতে পাওয়া যায়, কিছুতেই তাদের ক্ষুধা নিবৃত্তি হয় না এবং যত তারা পান ততই যেন তাদের সংসারের অনটন বেড়ে যায়।’ জীবনে অল্প পেয়েও সন্তুষ্ট থাকতে পারা হলো ইতিবাচকতা। সব মানুষ এই লোভ সংবরণ করতে পারেন না। ফলে জীবনে তাদেরকে কঠিন ভোগান্তির সম্মুখীন হতে হয়। আমি একদিন আমার শিক্ষককে জিগ্যেস করেছিলাম, ‘স্যার, আপনার জীবনের সবচেয়ে বড় ইতিবাচক বিষয় কী?’ তিনি আমার দিকে চেয়ে মৃদু হেসে বললেন, ‘এই যে বেঁচে আছি, বুক ভরে শ্বাস টেনে নিতে পারছি, পৃথিবীকে উপলব্ধি করতে পারছি দুই চোখ দিয়ে; এর চেয়ে বড় ইতিবাচক বিষয় আর কী হতে পারে!’
জীবন চলার পথে আত্মবিশ্বাস ধরে রাখার পাশাপাশি অন্তরে ইতিবাচক ধ্যানধারণা লালন করাও অপরিহার্য। আমরা সব সময় অতি দ্রুত সময়ে সাফল্যের মুখ দেখতে উদগ্রীব থাকি। এহেন নেতিবাচক চিন্তা আমাদের চলার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। কোনো কাজে সফলতা পেতে হলে ধৈর্য এবং একাগ্রতা নিয়ে কাজ করে যাওয়ার কোনো বিকল্প নেই। আমি একটা কথা মনেপ্র্রাণে বিশ্বাস করি, আমাদের চারপাশে মেধাবী মানুষের কোনো কমতি নেই। কিন্তু তারপরও আমাদের উন্নতির গ্রাফ কেন ঊর্ধ্বমুখী নয়? চিন্তা করার মতো বিষয়ই বটে। আমরা আমাদের কাজগুলোতে ইতিবাচক ছোঁয়া দিতে ব্যর্থ হই। সব সময় মনে করি, চাক্ষুষ দেখতে পাওয়া সাফল্যই বুঝি সবচেয়ে বড়ো। কিন্তু এই ধারণা সঠিক নয়। জীবনকে দেখতে হবে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে, নানা দৃষ্টিকোণ থেকে। তবেই জীবনের প্রতি ইতিবাচক ধারণা তৈরি হবে।
n লেখক :শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়