সঠিক পরিকল্পনার অভাবে ত্রাণ পৌঁছাতে দেরি হচ্ছে দুর্গম এলাকায়

গাইবান্ধায় শনিবার নদ-নদীর পানি কমা অব্যাহত ছিল। তবে ধীর গতিতে। ফলে এখনও বিপদসীমার উপরে ব্রহ্মপুত্র ও ঘাঘট নদীর পানি প্রবাহিত হচ্ছে। এ কারণে সরকারি আশ্রয় কেন্দ্র, সড়ক, বাঁধ ও উঁচু স্থানে আশ্রয় নেওয়া বানভাসিদের বাড়ি ফেরা শুরু হলেও, সংখ্যায় তা নগণ্য।

বেশির ভাগ বানভাসি মানুষ এখনও নানা দুর্ভোগ নিয়ে দুই সপ্তাহ ধরে সড়ক, উঁচু স্থান ও বাঁধসহ ও বিভিন্ন আশ্রয় কেন্দ্রে মানবেতর জীবন যাপন করছে। এসব মানুষকে সহায়তার জন্য সরকার ছাড়াও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও ব্যক্তি পর্যায় থেকে ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। কিন্তু সঠিক পরিকল্পনার অভাবে অনেক এলাকাতেই এই সহায়তার সুফল আসছে না। কিছু কিছু দুর্গম এলাকায় ত্রাণ পৌঁছাতে দেরি হচ্ছে। আবার অনেক এলাকায় কোন ত্রাণেই পৌঁছাচ্ছে না। 

খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, বন্যা কবলিত অনেক এলাকাতেই ত্রাণ পৌঁছাতে দেরি হচ্ছে সঠিক পরিকল্পনার অভাবে। ত্রাণ কার্যক্রম নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে মূলত জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে। জেলা প্রশাসন উপজেলা প্রশাসনের মাধ্যমে তালিকা প্রণয়নের মাধ্যমে কাজ করে থাকে। উপজেলা প্রশাসন ইউনিয়ন পর্যায় এবং ওয়ার্ড পর্যায়ের প্রতিনিধিদের মাধ্যমে করে থাকে এই কার্যক্রম। এ ক্ষেত্রে ইউপি চেয়ারম্যান ও ইউপি সদস্যদের মধ্যে ব্যক্তিগত দ্বন্দ্বের কারণে অনেক সময় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিরা এই তালিকার বাইরে থেকে যাচ্ছেন। অন্যদিকে স্বজনপ্রীতি বা যে কোনও ভাবে প্রভাবিত হয়েও এই তালিকা প্রণয়ন করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

ফুলছড়ির ভাষারচরের বাঁধে আশ্রয় নেওয়া ছকু মিয়া জানান, বাড়িঘর ছেড়ে পরিবার নিয়ে দুই সপ্তাহ হয় এই বাঁধে আশ্রয় নিয়েছি। এখন পর্যন্ত কোন ত্রাণ পাইনি। সাঘাটা উপজেলার মথরপাড়া বানভাসিদেরও একই অভিযোগ, তারাও এখন পর্যন্ত ত্রাণ পাননি। 

এদিকে গাইবান্ধার বোয়ালী ইউনিয়ন পরিষদে ত্রাণের চাল বিতরণের কথা বলে গত ২০ জুলাই সকালে ওই ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ড মেম্বার আব্দুর রহিম মিয়া হরিপুর গ্রামের কয়েকজন বানভাসিদের হাতে স্লিপ দিয়ে চাল তুলতে পরিষদে পাঠান। কিন্তু সারাদিন না খেয়ে অপেক্ষার পর নিরাশ হয়ে তারা বাড়ি ফিরেন। পরে বিষয়টি জেলা প্রশাসকের হস্তক্ষেপে গত ২৩ জুলাই সমাধান হয়।

জানা গেছে, সংশ্লিষ্ট ইউপি চেয়ারম্যান ও মেম্বারের মধ্য ভাগ নিয়ে দ্বন্দ্ব চলে আসছে। সে কারণে বানভাসিরা চারদিনেও স্লিপ থাকার পরেও চাল পাননি। তবে ইউপি চেয়ারম্যান এমএ মাজেদ উদ্দিন খান আবদুল্লাহ ভাগ নিয়ে দ্বন্দ্বে অভিযোগ অস্বীকার করেন বলেন, দেরিতে আসার কারণে এই সমস্যা সৃষ্টি হয়েছিল।

আরও পড়ুন:  বন্যায় কষ্টে মানুষ, নেই সরকারের পর্যাপ্ত ত্রাণ: জিএম কাদের

অপরদিকে বাদিয়াখালি রেলস্টেশনে আটকে পড়া পদ্মরাগ ট্রেনে আশ্রিত রিফাইতপুর গ্রামের শেফালী খাতুন জানান, তার স্বামী লাবলু মিয়া দিনমজুর। এখন কোনো কাজ নেই। ধারও দিতে চান না কেউ। চরম সংকটে পড়েছি। কিন্তু কোন ত্রাণ সহায়তা এখনও পাইনি। একই ট্রেনে আশ্রয় নেওয়া একই গ্রামের সুমি বেগম জানান, রেল লাইন ভেঙ্গে হঠাৎ বাড়িঘর  ডুবে যায়। জীবন বাঁচাতে কোন রকমে এক কাপড়ে এখানে এসে ট্রেনে আশ্রয় নিয়েছি। পানি কমে গেলে ১০ দিন পর বাড়ি গিয়ে দেখি বস্তায় রাখা চাল পচে গন্ধ বের হয়েছে। খাওয়ার মতো অবস্থায় নেই। সুমি আক্ষেপ করে বললেন, '১০ দিন হল একবেলা খেয়ে বেঁচে আছি। মরে যাওয়ার পর সরকারি ত্রাণ এসে কি হবে ?'

সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা উত্তম কুমার রায় জানান, রেললাইন তো বাদিয়াখালী ইউনিয়নের পাশেই। দুই দিন আগেই ওই ইউনিয়ন পরিষদে ত্রাণ দেওয়া হয়েছে। সেখানকার বাসিন্দারা ত্রাণ পাননি, এই বিষয়টি কেউ জানাননি। এ বিষয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আবার অনেকেই আশ্রয় কেন্দ্রে আসতে চায় না। জোর করে নিয়ে আসতে হয় কোনও কোনও ক্ষতিগ্রস্তকে। বাড়ি ছেড়ে আসলে হয়তো নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে। একেবারেই যারা ডুবে যান তারা হয়তো আশ্রয়কেন্দ্রে আসেন। 

ফুলছড়ির ভাষারপাড়া গ্রামের নৌকায় আশ্রয় নেওয়া ওই গ্রামের অমিছা বেওয়া বলেন, 'ছোলগুলেক নিয়া বিপোদোত পড়চি। শুকনা জাগা নাই। বাড়ির জিনিসপাতি থুয়া কোনটে যামো। ১৫ দিন থাকি নায়ের (নৌকা) মদ্দে থাকপার নাগচি। এখন পর্যন্ত কেউ কোন ত্রাণ দেয় নাই।'

বানভাসিদের এসব সমস্যার কথা জেনে ত্রাণ তৎপরতা বাড়ানোর আশ্বাস দেন গাইবান্ধার ফুলছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আবদুল হালিম।

স্থানীয় সমাজসেবকরা জানান, ত্রাণের পর্যাপ্ততা এবং কর্মকর্তাদের সদিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও মূলত সঠিক তালিকা ও তদারকি না থাকার কারণে ত্রাণ কার্যক্রমের বাইরে থেকে যেতে পারে মানুষ। যেমন, এক এলাকায় সবাই হয়তো পানি বন্দি নয়, যারা প্রকৃত পানি-বন্দি তাদের সঠিক তালিকা দরকার। আবার যোগাযোগ ব্যবস্থাসহ বিভিন্ন কারণে শুধু শহরের নিকটবর্তী এলাকা ও সরকারি আশ্রয় কেন্দ্রগুলোতেই সবাই ত্রাণ দিচ্ছেন। দুর্গম এলাকায় নানা কারণে কেউ যেতে চাচ্ছে না। 

অন্যদিকে একই এলাকায় একাধিক সংস্থা বা ব্যক্তি ত্রাণ দিচ্ছেন। এ ক্ষেত্রে সরকারি, বেসরকারি সংস্থা বা ব্যক্তিগত পর্যায়ে যারা ত্রাণ সহায়তা দেন, তাদেরকে সমন্বয় করতে জেলা পর্যায়ে একটি মনিটরিং সেল থাকা প্রয়োজন। ওই মনিটরিং সেলের প্রদত্ত তালিকা মেনে তারা এগুলো দিলে ত্রাণ সবার কাছে পৌঁছিবে। 

জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, সরকারি হিসাবেই জেলার দুটি পৌরসভা এবং ৫১টি ইউনিয়নের ৪২৪টি গ্রামের ৬ লক্ষাধিক বন্যা কবলিত মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত । এ পর্যন্ত জেলায় ১ হাজার ২৪৫ মে. টন চাল, ২১ লাখ টাকা বিতরণ করা হয়েছে। 

ইত্তেফাক/জেডএইচডি