বাংলাদেশের যেসব হাজারো মানুষ মধ্যপ্রাচ্যে পাড়ি জমান নিজের পরিবারকে একটু ভালো জীবনযাপন দেয়ার আশায়, তাদেরই একজন রাসেল তালুকদার। উনিশ বছর বয়সে কাতার আসার পর কেটে গেছে দীর্ঘ এগারো বছর, এর মধ্যে দেশে গিয়ে বিয়ে করেছেন। বাবা, মা, ছোট বোন আর স্ত্রী ছাড়াও সংসারে দু’টি সন্তানও আছে এখন।
রাসেলের কাতারে নিজস্ব মোবাইলের দোকান আছে, এক বন্ধুর সাথে একটি ফ্ল্যাটে থাকেন। আর এদিকে বাড়িতে সবার সকল চাহিদা পূরণ করতে পারলেও নিজের মানুষগুলো এখনো থাকে গ্রামের টিনশেডের ঘরে। তাই কয়েক মাস আগে তিনি সিদ্ধান্ত নেন যে, গ্রামে একটি দোতলা বাড়ি তুলবেন। যেখানে মা-বাবা নিশ্চিন্তে থাকবে, স্ত্রীর বাইরের রান্নাঘরে যেয়ে কাজ করতে হবেনা, ছেলেটাও রোদে রোদে ঘুরে অসুস্থ হবে না। রাসেলের মত এমন স্বপ্ন বুকে নিয়ে হাজার হাজার প্রবাসী প্রতিদিন ঘাম ঝরান। তবে বিদেশে থেকে বাড়ি বানানোর স্বপ্ন বাস্তবায়ন করা খুব সহজ কাজ নয়।
রাসেল তার বন্ধুকে বলছিলেন, “বাংলাদেশে বাড়ি বানাচ্ছি ঠিকই, কিন্তু কন্ট্রাক্টর কী করছে, লোকজন সময়মতো কাজ করছে কি না, সবকিছু খেয়াল রাখা খুব কষ্টের, এদিকে বাবাও অসুস্থ, তিনি পারেন না সারাদিন কাজের খোঁজ-খবর রাখতে। ফোনে বললে তারা বলে, ‘সব ঠিক আছে’। কিন্তু আসলে ঠিক আছে কি না, তা তো বোঝা যায় না।”
বহু বছর ধরে ইমো ব্যবহার করছেন তিনি। দুর্বল ইন্টারনেট কানেকশন থাকলেও পরিষ্কার ভিডিও কল করতে পারেন তিনি এই অ্যাপের মাধ্যমে। বিদেশে থাকা মানুষ আর আর দেশের মাঝের দূরত্ব অনেকটাই কমিয়ে দিয়েছে এই অ্যাপ। রাসেল এখন দিনে বেশ কয়েকবার ভিডিও কল দিয়ে বাড়ির কাজ সরাসরি দেখেন। মেঝেতে কেমন টাইলস বসবে, সিমেন্টটা কোন দোকান থেকে আনতে হবে, এমনকি ইট-বালু কতটুকু যাচ্ছে প্রতিদিনের কাজে, সে হিসাবও তিনি রাখেন এই ভিডিও কলে। তেমনি, বাথরুমের টাইলস কি রঙের হবে, বেসিনটা কোথায় বসবে আলোচনা করতে পারেন কনট্রাক্টরের সঙ্গে। আবার, দেয়ালের রঙ কিংবা জানালার ডিজাইন কেমন হবে, সব কিছুতেই এখন তিনি সরাসরি মত দিতে পারেন।
দোকানে দৈনন্দিন কাজের ফাঁকে ফাঁকে তিনি ভিডিও কলে বুঝিয়ে দেন কীভাবে কি কাজ করতে হবে। পরিবারের সান্নিধ্য, মমতা থেকে নিজকে বঞ্চিত করে বিদেশে ব্যবসা করে কয়েক বছর ধরে জমিয়েছেন এই টাকা। একদিন ভিডিও কলে দেয়ালে হালকা একটা ফাটল দেখে তিনি সঙ্গে সঙ্গে কন্ট্রাক্টরকে বললেন সেটা ঠিক করতে। দেশের বাড়ির উঠোনে দাঁড়িয়ে মা বলেন, “তুই দেশে না থাকলেও মনে হয় তুই আছিস।” আর এ কথাটাই রাসেলের সব কষ্টকে স্বার্থক করে তোলে।
ইমোর সবচেয়ে চমৎকার দিক হলো এর স্থিতিশীল সংযোগ। ক্রস বর্ডার কলে গ্রামের দুর্বল নেটওয়ার্কেও কথা বলতে কোনো সমস্যা হয় না। এতে রাসেলের মত প্রবাসীরা বাড়ি করার সময় প্রতিটি কাজ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে পারেন।
তবে শুধু নির্মাণের কাজ নয়, ইমো বাংলাদেশের প্রবাসীদের পরিবারের জন্যে একটি আস্থার জায়গা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কষ্টের টাকায় নতুন বাড়ি বানানোর প্রতিটি ধাপে যখন বিদেশে থাকা মানুষটা যুক্ত থেকে নিজের মতামত দিতে পারেন তখন পরিবারও এক ধরনের ভরসা পায়। আর সীমানার ওপারে থাকা মানুষটিও মনে করেন তিনি যেন দেশেই আছেন; স্বপ্নের বাড়ির প্রতিটি ইটে রয়েছে তার স্পর্শ। অ্যাপটি শুধু একটি যোগাযোগের মাধ্যম নয়, এটা অসংখ্য মানুষের জন্য একটি ভরসার নাম। পরিবার থেকে দূরে থাকার কারণে মনে যে শূন্যতার তৈরি হয় তা অপূরণীয়; কিন্তু ভিডিও কলের কারণে এই দূরে থাকা মানুষগুলো যে মানসিক শান্তি পায় তাও আসলে অতুলনীয়। আর তাই, বিদেশে থেকেও রাসেলের মত হাজার হাজার প্রবাসীর মনে হয়, “আমি তো বাড়িতেই আছি।”