'পরিবর্তন' এক দামি স্লোগান!

এই ধূলির ধরায় পরিবর্তন-বিবর্তন এক স্বাভাবিক ও সহজাত প্রক্রিয়া। পরিবর্তন ছাড়া মানবজাতির উন্নয়ন ও অগ্রগতি অসম্ভব। চেইঞ্জ বা পরিবর্তনের কথা বলিলে মানুষের মন চনমন করিয়া উঠে। ইহা একটি চমকপ্রদ রাজনৈতিক স্লোগানও বটে। বিশ্বের বিভিন্ন সরকার 'পরিবর্তন' আনয়নের কথা বলিয়াই ক্ষমতার মসনদে অধিষ্ঠিত হইয়াছেন। পরিবর্তনের কথা বলিয়া বিপ্লব-প্রতিবিপ্লবও হইয়াছে। যদিও পরিবর্তনের হাত ধরিয়া যাহারা ক্ষমতায় আসেন, তাহারা দেশ ও জাতির পরিবর্তনসাধনে কতটা ভূমিকা পালন করিতে পারেন তাহা প্রশ্নাতীত নহে। আবার পরিবর্তন ভালো ও মন্দ উভয় প্রকারেরই হইতে পারে।

সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার নির্বাচনি স্লোগান ছিল-'চেইঞ্জ, উই ক্যান বিলিভইন'। অর্থাৎ 'পরিবর্তন, আমরা বিশ্বাস করিতে পারি'। তিনি যখন নির্বাচনি প্রচারণায় এই স্লোগান দিতেন, তখন তাহার সমর্থকরা সমস্বরে বলিয়া উঠিতেন- 'ইয়েস উই ক্যান'। অর্থাৎ 'হ্যাঁ, আমরা বিশ্বাস করিতে পারি'। মহাত্মা গান্ধীও চেইঞ্জ বা পরিবর্তনে বিশ্বাসী ছিলেন। তিনি বলিতেন, 'বি দ্য চেইঞ্জ দ্যাট ইউ উইশ টু সি ইন দ্য ওয়ার্ল্ড'। অর্থাৎ 'আপনি বিশ্বে যে পরিবর্তন দেখিতে চান, সেই পরিবর্তন নিজের মধ্যে আনুন'। আর নেলসন ম্যান্ডেলার এই কথাটি জগদ্বিখ্যাত ও গুরুত্বপূর্ণ: 'এডুকেশন ইজ দ্য মোস্ট পাওয়ারফুল উইপন হুইচ ইউ ক্যান ইউজ টু চেইঞ্জ দ্য ওয়ার্ল্ড। অর্থাৎ পৃথিবীর পরিবর্তন আনয়নে শিক্ষা হইল শক্তিশালী হাতিয়ার। এই জন্য প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক হেরাক্লিটাসকে আমরা বলিতে দেখি 'দেয়ার ইজ নাথিং পারমানেন্ট এক্সেপ্ট চেইঞ্জ'। আসলে এই পৃথিবীতে পরিবর্তন ছাড়া কোনো কিছুই চিরস্থায়ী নহে।

এই জন্য আমরা মনে করি, সমাজ, রাষ্ট্র ও বিশ্বের পরিবর্তন হইতে হইবে। এই পরিবর্তন ঘোষণা দিয়া আসিতে পারে। আবার আসিতে পারে অঘোষিতভাবেও। বিশেষ করিয়া প্রশাসনিক বা সাংবিধানিক সংস্কার-পরিবর্তন আমরা সহজেই করিতে পারি; কিন্তু কালচারাল চেইঞ্জ তথা সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের কী হইবে? ইহা সাধন করিতে হইলে তাহা সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। আমরা যতই চেষ্টা করি না কেন, একটি দেশের জনসাধারণের প্রথা, রীতিনীতি ও অভ্যাস রাতারাতি পরিবর্তন করিতে পারিব না। আবার কোনো কোনো পরিবর্তনের জন্য মাশুলও গুনিতে হয়। সমাজে দেখা দেয় সংঘাত-সংঘর্ষ। এই অনিবার্য পরিণতির পর হয়তো একসময় কোনো কিছুর পরিবর্তন কিছু সময়ের জন্য স্থিতি লাভ করিতে পারে; কিন্তু যাহা আমাদের মজ্জাগত হইয়া গিয়াছে, তাহার পরিবর্তন আনয়নে আমরা কতটা আন্তরিক? যেমন- বহু তদবিরের পর এলজিইডি কোনো ব্রিজ তৈরি করিল বটে; কিন্তু অ্যাপ্রোচ বা সংযোগ সড়ক নির্মাণ না করায় তাহা বৎসরের পর বৎসর ধরিয়া অব্যবহৃত অবস্থায় পড়িয়া রহিল। আবার রাজধানীর ফুটপাতে অনেক শিক্ষিত মানুষকেও দেখা যায় প্রকাশ্যে প্রাকৃতিক কার্য সমাধা করিতে। এত পরিবর্তনের কথা বলিলেও ইহার কি কোনো পরিবর্তন হইবে না?

নিডো কিউবিন নামে একজন মার্কিন উদ্যোক্তা বলিয়াছেন, 'চেইঞ্জ ব্রিংস অপোরচুনিটি'। সত্যিই পরিবর্তনের ফলে সুযোগ তৈরি হয়। যাহারা সুযোগসন্ধানী তাহারাই ইহার প্রকৃত সদ্ব্যবহার করিতে পারেন। এই জন্য চেইঞ্জ বা পরিবর্তন এত দামি স্লোগান এই বিশ্ব চরাচরে! পরিবর্তনের কথা বলিয়া মানুষকে সহজেই মোহিত করা সম্ভব। তবে আমরা যাহারা পরিবর্তনপ্রেমী, তাহারা সুফিসাধক মাওলানা রুমির এই কথাটি অনুসরণ করিতে পারি যাহার ইংরেজি ভাবার্থ হইল: 'ইয়েস্টারডে আই ওয়াজ ক্লেভার। সো আই ওয়ানটেড টু চেইঞ্জ দ্য ওয়ার্ল্ড। টুডে আই অ্যাম ওয়াইজ। সো আই অ্যাম চেইঞ্জিং মাইসেল্ফ।' অতএব, নিজেদের পরিবর্তনসাধনে আমরা সেই বুদ্ধিমত্তার পরিচয় আর কখন দিব?