এই উপমহাদেশে ব্রিটিশরা ব্যবসার সুবিধার্থে কোম্পানির মাধ্যমে শাসনব্যবস্থা চালু করে। রাষ্ট্র পরিচালনার মূল লক্ষ্য ছিল মুনাফা অর্জন, জনগণের স্বার্থ সেখানে উপেক্ষিত ছিল। স্বাধীনতার পরও ব্রিটিশদের রেখে যাওয়া নীতিমালা ও আইন অনেকাংশে আমাদের বাণিজ্য ব্যবস্থায় বিদ্যমান, বিশেষ করে মূল্য নির্ধারণ ব্যবস্থায়। কিছু খাদ্য পণ্যের ক্ষেত্রে সরকারিভাবে মূল্য নির্ধারিত হলেও অধিকাংশ বাণিজ্যিক পণ্যের ক্ষেত্রে কোনো নির্ভরযোগ্য ব্যয় ভিত্তিক মূল্য নির্ধারণ ব্যবস্থা নেই।এর ফলে বাজারে পণ্যের অস্বাভাবিক মূল্য, অতিরিক্ত মুনাফা এবং ভোক্তার শোষণ একটি প্রচলিত চিত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ভোক্তার অধিকার ও আইনি দুর্বলতা: ভোক্তার কয়েকটি মৌলিক অধিকারের মধ্যে অন্যতম হলো: (১) ন্যায্যমূল্য (২) সঠিক পরিমাপ (৩) পণ্য নকল না হওয়া (৪) সঠিক গুণগত মান। ভোক্তার মৌলিক অধিকারসমূহের মধ্যে ‘ন্যায্য মূল্য’ প্রধান বিষয় হওয়া সত্ত্বেও “ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন ২০০৯” এ ন্যায্য মূল্যের সংজ্ঞা কিংবা সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা কোনটাই নাই । বর্তমানে মুক্ত বাজার ব্যবস্থার নামে চলছে অতি মুনাফার প্রতিযোগিতা ও সিন্ডিকেট বাণিজ্য , ফলে তৈরি হচ্ছে অস্থিতিশীল বাজার ব্যবস্থা। তাই দেশীয় বাজার ব্যবস্থাপনায় প্রয়োজন মুক্ত বাজার ব্যবস্থার পরিবর্তে ব্যয় ভিত্তিক মূল্য নির্ধারণ ব্যবস্থা । কর্মকর্তারা অনেক সময় বাজারে গিয়ে পণ্যের বিক্রয়মূল্য নিয়ে প্রশ্ন তোলেন, কিন্তু আইনি কাঠামোর অভাবে সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা নিতে পারেন না। ফলে তারা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের উপর দৃষ্টি রাখেন, বড় কোম্পানিগুলো নজরদারির আওতার বাহিরে থাকে।
উৎপাদন ব্যয় নিরূপণের বাস্তবতা: পণ্যের প্রকৃত মূল্য নির্ধারণে উৎপাদন ব্যয়ের সঠিক হিসাব অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু বাস্তবে:
উৎপাদন ব্যয় শুধু কাঁচামালের মূল্য নয়, এর সঙ্গে রয়েছে ওভারহেড খরচ, অপচয়, উৎপাদন দক্ষতা, উৎপাদনের পরিমাণে পরিবর্তন ইত্যাদি।
এগুলোর সঠিক ব্যবহার এবং সঠিক বণ্টন ছাড়া ন্যায্য মূল্য নির্ধারণ সম্ভব নয়।
প্রস্তাবনা: এখন সময় ব্রিটিশ শাসন ব্যবস্থা থেকে বের হয়ে দেশীয় বাজারে খাদ্য পণ্য, পণ্য ও ঔষধ বিক্রয়ের ক্ষেত্রে জনগণের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠা করা এবং এ লক্ষে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন-২০০৯ এ জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরকে মূল্য নির্ধারণ ক্ষমতা এবং ন্যায্য মূল্যের সংজ্ঞার অন্তর্ভুক্তি সহ নিন্মোক্ত প্রস্তাবনা:
১. ন্যায্য মূল্যের সংজ্ঞা অন্তর্ভুক্তি করণ :
- ন্যায্য মূল্যের নির্ধারণ প্রক্রিয়া নির্দিষ্টকরণ
- ন্যায্য মূল্যে নির্ধারণ প্রক্রিয়ায় সিএমএ পেশাজীবী প্রত্যায়ন বাধ্যতামূলককরণ
- অনুমোদিত মূল্য পরিবর্তনের সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ।
২. জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরকে মূল্য নির্ধারণ ক্ষমতা ও মূল্য নির্ধারণ প্রক্রিয়া বাস্তবায়নের ক্ষমতা প্রদান :
- খাদ্য পণ্য: সরকারী নিয়ন্ত্রণ সংস্থা কর্তৃক যে সকল খাদ্য পণ্যের মূল্য নির্ধারিত তাহা ব্যতীত অন্য সকল খাদ্য পণ্যের মূল্য অধিদপ্তর কর্তৃক নির্ধারিত অথবা আমদানিকৃত খাদ্য পণ্যের ক্ষেত্রে সিএমএ কর্তৃক বিক্রয়মূল্য প্রত্যায়নের সহিত সামঞ্জস্যপূর্ণ।
- পণ্য : উৎপাদনকারী কর্তৃক মোড়কীকরণ / ব্রান্ড সম্মিলিত পণ্য সরবরাহ করা হলে, সে সকল পণ্যের মূল্য সিএমএ কর্তৃক বিক্রয়মূল্য প্রত্যায়ন সাপেক্ষে সরকারী নিয়ন্ত্রণ সংস্থা অথবা অধিদপ্তর কর্তৃক নির্ধারিত।
- ঔষধ : ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের প্রদত্ত নির্দেশনা অনুযায়ী জনস্বার্থ বিবেচনা করে সিএমএ কর্তৃক বিক্রয়মূল্য প্রত্যায়ন সাপেক্ষে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর কর্তৃক নির্ধারিত মূল্য
৩. ন্যায্য মূল্য বলতে বুঝায়, কোম্পানি আইন ১৯৯৪ এর ধারা ২২০ অনুযায়ী স্বাধীন নিরীক্ষক কর্তৃক ন্যায্য মূল্য নির্ধারণ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে প্রত্যায়িত মূল্য অথবা সরকার কর্তৃক নির্ধারিত মূল্য ।
সিএমএ এর অন্তর্ভুক্তি কেন গুরুত্বপূর্ণ: স্বাধীন রাষ্ট্রায়ত্ত হিসাববিজ্ঞান প্রতিষ্ঠান আইসিএমএবি প্রতিষ্ঠিত হয় রাষ্ট্রের ব্যয় ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণের জন্য, তাই রাষ্ট্রের দক্ষতা বাড়াতে উৎপাদন ব্যবস্থাপনায় আইসিএমএবি এর সদস্যদের অন্তর্ভুক্তি অপরিহার্য। শিল্প প্রতিষ্ঠানসমূহের পণ্যের মূল্য নির্ধারণের জন্য প্রয়োজন উৎপাদন কার্যক্রম বিশ্লেষণ, ব্যবহৃত কাঁচামালের পরিমাণ, ওভারহেড খরচের সঠিক ব্যবহার ও বণ্টন এবং অপচয়ের নির্ভুল তথ্য । উৎপাদন মেট্রিক্সের মতো জটিল তথ্যের বিশ্লেষণের জন্য প্রয়োজন উচ্চস্তরের পেশাদারিত্ব যা আইসিএমএবি এর সদস্যরা নির্ভুল ও বস্তুনিষ্ঠার সাথে পালন করে থাকেন। যাহা প্রতিবেদনের অধিকতর স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে। এর ফলে যে সুবিধা পাওয়া যেতে পারে তা হলো:
১. ভোক্তা ন্যায্য মূল্যে পণ্য পাবেন, ফলে ভোক্তার অধিকার রক্ষা নিশ্চিত হবে।
২. ফটকা বাজার বা অতিরিক্ত মুনাফার প্রবণতা বন্ধ হবে।
৩. সরকার ও জনগণের মাঝে বিশ্বাস গড়ে উঠবে এবং বাজার ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা বজায় থাকবে।
৪. একই প্রতিষ্ঠানে একাধিক শ্রেণির পণ্য উৎপাদনের ক্ষেত্রে উৎপাদন ব্যয়ের সঠিক বা ন্যায্য বণ্টনের ফলে মুনাফার সুষম বণ্টন হবে।
৫. খাদ্য নিরাপত্তার আলোকে গুণগত মানের সহিত খাদ্য পণ্যের মূল্যের সামঞ্জস্যতা।
৬. বিভিন্ন সংস্থার কমপ্লায়েন্স সমূহ বাস্তবায়নের সমন্বয় সাধন।
আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি: ভারতে অত্যাবশ্যকীয় পণ্য ও সেবাসহ কিছু পণ্যের মূল্য নির্ধারণে সিএমএ এর অন্তর্ভুক্তি বিদ্যমান।
বর্তমানে পণ্যের দাম মনিটরিং, বিশেষ করে ঔষধ, কীটনাশক, অন্যান্য অত্যাবশ্যকীয় পণ্য ও সেবা এবং ব্রান্ড সম্মিলিত পণ্যের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা প্রতিষ্ঠায় সিএমএ পেশাজীবীদের অন্তর্ভুক্তি অপরিহার্য। ন্যায্য মূল্য জনগণের সাংবিধানিক অধিকার। এটি কেবল বাজার নিয়ন্ত্রণ নয়, বরং সামাজিক ন্যায় ও অর্থনৈতিক ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার একটি কার্যকর হাতিয়ার। তাই ব্যবসায়িক স্বার্থের পাশাপাশি জনস্বার্থে বিদ্যমান আইনের প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তন আনা এবং প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সিএমএ পেশাজীবীদের সম্পৃক্ত করা প্রয়োজন ।
লেখক: এফসিএমএ, চিফ ফিনান্সিয়াল অফিসার
কোহিনুর কেমিক্যাল কোং (বিডি ) লি: