বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের মহাসচিব কাদের গনি চৌধুরী বলেছেন, সাংবাদিকতার মূলভিত্তি হচ্ছে সততা। একজন ভালো সাংবাদিক কখনও মিথ্যে বা পক্ষপাতদুষ্ট খবর প্রচার করেন না। সত্য তথ্য যাচাই করে, নিরপেক্ষ অবস্থানে থেকে খবর পরিবেশন করা তার মূল কাজ।
শনিবার (২৭ সেপ্টেম্বর) দুপুরে কুষ্টিয়া শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তনে কুষ্টিয়া সাংবাদিক ইউনিয়নের সাধারণ সভায় তিনি এসব বলেন।
তিনি বলেন, গণমাধ্যমের সবচেয়ে বড় সম্পদ বিশ্বাসযোগ্যতা। যে গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা যত বেশি, দর্শক- শ্রোতা এবং পাঠকের কাছে তার গ্রহণযোগ্যতা তত বেশি। তাই জনস্বার্থে, সংবাদমাধ্যমের স্বার্থে এমনকি নিজ স্বার্থেই সাংবাদিককে তাদের প্রাত্যহিক কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে নৈতিকতার চর্চা করতে হয়।সাংবাদিকতায় প্রতিবন্ধকতা হলো বস্তুনিষ্ঠতার জায়গা। বস্তুনিষ্ঠতায় ঘাটতি পড়লে সাংবাদিকতায় প্রতিবন্ধকতা আসে। তাই বস্তুনিষ্ঠতা খুবই জরুরী।
কাদের গনি চৌধুরী বলেন, সংবাদপত্র একটি দেশ ও জাতিকে যেমন এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে, আবার জাতির সর্বনাশও করতে পারে। এ ক্ষেত্রে সংবাদ পরিবেশনই হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। নিরপেক্ষ বস্তুনিষ্ঠ খবর সমাজে শান্তি আনে, আর মিথ্যা খবর কখনো সমাজকে বিষিয়ে তোলে, অশান্তি ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে। তাই সংবাদপত্র ও সাংবাদিকদের সতর্ক হয়েই লিখতে হয়। তাই সাংবাদিকরা সম্ভবত সবচেয়ে বেশি নীতি-সচেতন। এটি তাদের হতেই হয়।
তিনি বলেন, অসীম ত্যাগ ও পরিশ্রমের মধ্য দিয়ে সাংবাদিকরা সত্য তথ্য জাতির সামনে তুলে ধরেন। তাই সাংবাদিকরা জাতির বিবেক হিসেবে সর্বজন স্বীকৃত। সাংবাদিকরা হলেন মানবতার অতন্দ্র প্রহরী। সাংবাদিকদের সমাজ ও রাষ্ট্রের 'ওয়াচডগ' বলা হয়। সমাজ ও রাষ্ট্রের উন্নয়নে, ন্যায় ভিত্তিক সমাজ তৈরিতে, অন্যায়, দুর্নীতি আর ভ্রষ্টাচারের বিরুদ্ধে জনগণকে জাগ্রত করতে, মানুষের সত্যিকারের কণ্ঠস্বর হয়ে সাংবাদিকরা পারেন সমাজে আলোর প্রদীপ জ্বালাতে। এটিই আমাদের করতেই হবে। না হয় সাংবাদিকদের যে সম্মানসূচক উপাধি দেয়া হয়েছে এসব কলঙ্কিত হবে।স্যামুয়েল ল্যাংহোর্ন ক্লেমেন্স যার কলম নাম মার্ক টোয়েন হিসেবে জগদ্বিখ্যাত একজন আমেরিকান লেখক, উদ্যোক্তা, প্রকাশক এবং প্রভাষক ছিলেন। তিনি সংবাদপত্রকে দ্বিতীয় সূর্যের সাথে তুলনা করেছিলেন।
তার মতে, পৃথিবীতে প্রতিদিন দুটি করে সূর্য উঠে। প্রথমটি পৃথিবীর প্রভাত সূর্য যা প্রকৃতির দান। আর দ্বিতীয়টি সংবাদপত্রের সূর্য। পৃথিবী আলোকে উদ্ভাসিত হয় প্রভাত সূর্যের চিরন্তন আলোয়। আমাদের সকলের জীবন তথা সমাজ আলোকিত এবং সমৃদ্ধ হয় সংবাদপত্রের বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশনের সূর্যের দীপ্ত কিরণে। অন্যদিকে হেনরি ওয়ার্ড এর মতে "সংবাদপত্র মানুষের কাছে অগণিত স্বর্ণের চেয়েও বড়ো সম্পদ।" আমাদের ভুল বা স্বার্থপরতার কারণে যেন গণমাধ্যম তার মর্যাদা না হারায়।
সাংবাদিকদের এ নেতা বলেন, পশ্চিমা দুনিয়ায় গণমাধ্যম মালিকানার সামন্ত প্রভাব থেকে মুক্ত থাকতে পারলেও বাংলাদেশে কনটেন্টের মালিক আসলে মালিকরাই। একটা সময় অল্প অল্প করে মালিকরা তাদের ব্যবসায়িক স্বার্থে গণমাধ্যমকে কিছু কিছু করে ব্যবহার করলেও এখন সেটাই কোনও কোনও গণমাধ্যমের মূল কাজ। এর সাথে নতুন করে বড় আকার যুক্ত হয়েছে রাজনৈতিক স্বার্থ। ফলে অনেকেই বলে থাকেন, ‘সম্পাদকরা আসলে কর্পোরেট এডিটোরিয়াল ম্যানেজার’। সাংবাদিকরা হলেন কর্পোরেট এডিটোরিয়াল এক্সিকিউটিভ। কর্পোরেট পলিসি ও সম্পাদকীয় নীতিতে কোনও পার্থক্য নেই। সাংবাদিকরা সেই নীতির বাস্তবায়ন করেন সাংবাদিকতার নামে। সত্যি বলতে কি দু’একটি বাদ দিলে গণমাধ্যম হাউজগুলোর কোনও প্রাতিষ্ঠানিকতা নেই। তাই তারা সাংবাদিকদের নিরপেক্ষ অবস্থানকে সমর্থন করতে পারে না ও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সুরক্ষাও দিতে পারে না।
দল দাস সাংবাদিকদের সমালোচনা করে তিনি বলেন, বিগত সরকারের সময় দলদাস সাংবাদিকতা এতই বেড়েছিল যে সাংবাদিক আর রাজনৈতিক কর্মীর মধ্যে ফারাক খুঁজে পাওয়া কঠিন ছিল। যা সাংবাদিকতার মর্যাদাকে ম্লান করে দিয়েছে। তাই ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে গত ৫ আগস্ট সরকার পতন হলে সাংবাদিকদের অনেকেই গা ঢাকা দিয়েছেন। কেউ কেউ পালিয়েছেন, আবার কেউ কেউ পালিয়ে যাওয়ার সময় গ্রেফতার হয়েছেন। অনেক সাংবাদিক পদ-পদবি হারিয়েছেন। এগুলো দুঃখজনক ও অস্বাভাবিক বিষয়। তবে যারা পালিয়েছেন, গ্রেফতার হয়েছেন কিংবা পদ হারিয়েছেন তাদের লেজুড়বৃত্তি ও দালালি নিশ্চয়ই অযৌক্তিক পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল। গণমাধ্যমকে তারা গণমানুষের আকাঙ্ক্ষার জায়গায় ধরে রাখতে পারেনি। সরকারকে তুষ্ট করতে গিয়ে তারা জন-আকাঙ্ক্ষার কথা ভুলেই গিয়েছিল। এখানেই গণমাধ্যমকর্মীদের নৈতিক পরাজয় ঘটেছে। অনেকে মালিকপক্ষের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে গিয়ে নিজেদের নৈতিক অবস্থান ধরে রাখতে পারেনি। অনেকেরই নিজের চাকরি ও পরিবারের ভরণ-পোষণের চিন্তা করতে হয়েছে। এ বাস্তবতা অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু অনেক সাংবাদিক লেজুড়বৃত্তি ও সরকারের নির্লজ্জ দালালি করে অনেক অনৈতিক সুবিধা নিয়েছেন। অনেকে একাধিক গণমাধ্যমের মালিক হয়েছেন। সঙ্গে গাড়ি-বাড়ির মালিক হয়েছেন। তাদের বিষয়টি ভিন্ন লেন্সে দেখার যৌক্তিকতা আছে। তারা গণশত্রুদের মুখোশ উন্মোচন না করে গণশত্রুদের দালালি করেছেন। বিনিময়ে পেয়েছেন অনৈতিক সুযোগ-সুবিধা। অনেকক্ষেত্রে তাদের অনৈতিক সুবিধার বলি হয়েছে সাধারণ মানুষ।
বিএফইউজে মহাসচিব বলেন, সাংবাদিকতা হচ্ছে সত্যের আরাধনা। লেখনীর মাধ্যমে সাংবাদিকরা সত্য উদ্ঘাটন, দুর্নীতি উন্মোচন ও জনস্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরে। যার ফলে আমাদের দেশে সাংবাদিকদের কাজের ক্ষেত্রটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। গত দুই দশকে ৬৮ জন সাংবাদিককে জীবন দিতে হয়েছে। আহত হয়েছেন শত শত সাংবাদিক। পত্রিকার পাতা খুললেই প্রতিদিন সাংবাদিক নির্যাতনের খবর দেখতে হয় আমাদের।তাই পেশাগত দায়িত্ব পালনে সাংবাদিকদের স্বাধীনতা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। সাংবাদিকরা অনেক ধরনের হুমকি, হেনস্তা এবং শারীরিক আক্রমণের শিকার হচ্ছে। এতে সাংবাদিকদের কাজ করা কঠিন হয়ে পড়ছে। পেশাগত দায়িত্ব পালনে সাংবাদিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে একটি শক্তিশালী এবং কার্যকর আইন প্রণয়ন করা অত্যন্ত জরুরি।