মা হ বু ব আ ল ম
সাংস্কৃতিক বিকাশের অভাব বেশ টের পেয়েছিল মানুষ যখন গুলশানের হলি আর্টিজানে জঙ্গি হামলা হয়েছিল। তখন নানা গণমাধ্যমে এ নিয়ে বিশ্লেষণ শুরু হয়েছিল। কেন এমনটা ঘটছে? এর ফলে একটি বিষয় সবার কাছে পরিষ্কার হলো—সাংস্কৃতিক বিকাশ ঘটছে না। বাতিঘরের ‘ঊর্ণাজাল’ নাটকেও তেমনি একটি কাহিনির বিস্তৃতি ঘটিয়েছেন নাট্যকার-নির্দেশক বাকার বকুল।
খালেদ গ্রামের ছেলে। ধর্মীয় উচ্চশিক্ষা নিতে বিদেশে গিয়েছিল। সেখান থেকে ফিরে এসে বদলে যায় সে। গ্রামের মানুষ তার সাথে পূর্বের খালেদকে মেলাতে পারে না। যে জমি খালেদের বাবা স্কুল নির্মাণের জন্য দিয়ে গিয়েছিল, সেই জায়গায় খালেদ তৈরি করে মাদ্রাসা। কাঞ্চনডাঙা গ্রামের মানুষ ধর্মীয় শিক্ষায় শিক্ষিত হতে থাকে। অথচ এই গ্রামের মানুষই হাজার বছরের পরম্পর মেনে গান-বাজনা করে, চৈত্রমাসের শেষে মেলা বসায়। আজকের খালেদও ছোটবেলায় সাঁইজির কাছে গানের শিক্ষা নিয়েছে, কিন্তু তাকে বদলে দিয়েছে ধর্মীয় গোঁড়ামি। এই গোঁড়ামির ঊর্ণাজালে আটকে অন্ধ হয়ে যায় সে ও তার সমাজ। সেই অন্ধত্বের কারণে সে তার ছোটবেলার বন্ধু সয়ফুলকেও অস্বীকার করে। কেননা সয়ফুল বাউল গান করে। বাউল গানের আবেশে সে অনেক অনেক শ্রোতাকে আটকে রাখতে পারে দীর্ঘক্ষণ। এই ক্ষমতার প্রশংসা করে খালেদ, কিন্তু সাথে সাথে সে এটাও তাকে বোঝায় যে, সয়ফুল নিজের ক্ষমতাকে ভুল পথে চালিত করছে। নাফরমানি কাজ করছে সে। সয়ফুলকে ধর্মের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে নিজের দলে টেনে নেয় খালেদ। অবশ্য ধর্মের এই ভুল ব্যাখ্যার আঁচ আমরা পাই নাটকের শুরু থেকেই। ধর্মীয় অপব্যাখ্যা ও অজ্ঞতাই নাটক ‘ঊর্ণাজাল’-এর মূল বিষয়।
নাটকে খালেদ যাকে পিতা বলে সম্বোধন করে তার বাচনভঙ্গিতে উর্দু বলার ঢং লক্ষ করা যায়। আর যেহেতু উর্দু ও আরবির একটি গণ্ডগোল নাটকের শুরু থেকেই আছে, সেহেতু আরও একটি বিষয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়। নাট্যকার বাকার বকুল কি জঙ্গিবাদের উত্থানকে পাকিস্তানের সৃষ্ট বলে ইঙ্গিত করছেন? আবার খালেদের সাথে সয়ফুলের কথোপকথনে বোঝা যায় সে ধর্মের উচ্চশিক্ষা নিতে যেখানে গিয়েছিল সেটি আরব দেশ হবে। তাহলে জঙ্গিবাদের উত্থান আসলে কোথায় এবং বিস্তার কোন অঞ্চল থেকে হচ্ছে! খালেদ ধর্মের নানা ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে বিভ্রান্ত করে সয়ফুলকে। একদিন যখন সাঁইজির কবরে সাপের ফোঁস ফোঁস আওয়াজ শুনতে পাওয়া যায় আর গ্রামের লোক যখন সেই মেরে ফেলতে যায় তখন বাঁধ সাধে খালেদ। তার মতে, কোনো ভালো মানুষের কবরে কখনো সাপ ঢোকে না। আবার যখন তাদের একজন জিহাদির লাশ কবরের ভিতর থেকে শিয়াল তুলে নিয়ে আসে তখন খালেদকে সয়ফুল প্রশ্ন করে—জিহাদির লাশ শিয়ালে খায় কেন? এই প্রশ্নের কোনো উত্তর সে দিতে পারে না। পরে তারা উঠে পরে লাগে কাঞ্চন ডাঙার চৈত্র মাসের মেলা বন্ধ করতে। খালেদ তার নানা সংশয়ের প্রকাশ করে তার কথিত পিতার কাছে।
যা হোক, আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে কাঞ্চনডাঙার চৈত্রমাসের মেলা বন্ধ করা সহজ কাজ নয়। প্রশ্ন ও সংশয় জাগে সকলের মনে—খালেদের মনে। খালেদ যাত্রা দলের অধিকারীকে ডেকে মৃত্যুর ভয় দেখায়—দল নিয়ে চলে যেতে বলে। ঘটনাক্রমে খালেদের চোখদুটো দান করা এই অধিকারীর বাবার। সে ফেরত চায় তার বাবার চোখ। দ্বন্দ্ব তৈরি হয় খালেদের মধ্যে। বিধর্মীর চোখ নিয়ে সে বাঁচতে পারবে কি না? খালেদের কথিত পিতা আরেক ব্যাখ্যা দিয়ে তার চোখ উপরে ফেলতে নির্দেশ দেয়। মূলত সে তার পথের কাঁটা সরিয়ে ফেলে। এভাবেই জঙ্গিবাদের ঊর্ণাজালে জীবনের আলো হারিয়ে যায় তার। উল্লেখিত কয়েকটি চরিত্রের মধ্যে সয়ফুলের সাবলীল অভিনয় নজর কাড়ে। খালেদের অভিনয় কোথাও কোথাও অতিরঞ্জিত মনে হয়।
ঊর্ণাজাল নাটকের বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেছেন—মুক্তনীল, সাদ্দাম রহমান, ফিরোজ মুনীর, সঞ্জয় হালদার, শাফিন আহমেদ অশ্রু, সঞ্জয় গোস্বামী, শিশির সরকার, সাবরিনা শারমিন, সাদিয়া ইউসুফ বৃতা, ফয়সাল মাহমুদ, স্মরণ বিশ্বাস, অপূর্ব কুমার, তামিম, সাবিত, অয়োমী, রুম্মান সারু, অঞ্জনসহ আরও অনেকে।