পারস্য উপসাগরে মার্কিন মিত্ররা অনেক বছর ধরেই ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে যাওয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে প্রলুব্ধ করেছে। অতি সম্প্রতি দেশ দুটির মধ্যে যুদ্ধের আশঙ্কা অনেক বেড়ে গেছে। কিন্তু উপসাগরীয় দেশগুলো কি চায় তা তারা এখনো বুঝে উঠতে পারেনি। আরব দেশগুলো চায় ইরানের ওপর মার্কিন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞাসহ অন্য চাপগুলো অব্যাহত থাকুক। কিন্তু যুদ্ধ বেধে যাক সেটি তারা সেভাবে বলছে না।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন উপসাগরীয় দেশগুলোর কাছ থেকে মিশ্র সংকেত পাচ্ছে। এমন কি এই দেশগুলো নীতিনির্ধারক মহল নিজেরাই কিছুটা কিংকর্তব্যবিমূঢ়। উপসাগরে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মিত্র যুক্তরাষ্ট্র ও সংযুক্ত আরব আমিরাত। দেশ দুটো বরাবরই ইরান ও তার সমর্থনপুষ্ট পক্ষগুলোকে আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য হুমকি বিবেচনা করে এসেছে। কিন্তু তেহরানকে সবচেয়ে কার্যকর উপায়ে কিভাবে কোণঠাসা করা যাবে তা নিয়ে কুয়েত, কাতার ও বাহরাইনের মতো ছোটো ছোটো দেশগুলোর সঙ্গে রয়েছে তাদের মতপার্থক্য। সৌদি ও আমিরাত যুদ্ধের ব্যাপারে যতটা আগ্রহী ছোটো ছোটো দেশগুলো ততটা নয়। তারা আলোচনাকেই বিরোধ নিরসনের সবচেয়ে ভালো বিকল্প মনে করে।
যুক্তরাষ্ট্র ও তার আঞ্চলিক মিত্ররা কূটনৈতিক পর্যায়ে বিভিন্ন রকম কথা বলছেন যার মধ্যে মিল খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। যুদ্ধ হবে কি না কেউই পরিষ্কার কোনো অবস্থান নিতে পারছে না। হরমুজ প্রণালি সম্প্রতি তেলবাহী ট্যাঙ্কারে একাধিক হামলা হয়েছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে সরাসরি দায়ী করেনি। বরং পরোক্ষভাবে বলেছে তেহরান আগুন নিয়ে খেলছে। বেশিরভাগ উপসাগরীয় দেশ ইরানকে সরাসরি দায়ী করেনি। বরং সংলাপ ও সংযম প্রদর্শনের ওপরই জোর দিয়েছে। ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর প্রতিশ্রুতি মতো ইরানের সঙ্গে করা আন্তর্জাতিক পরমাণু চুক্তি থেকে সরে গেছেন। দেশ দুটির মধ্যে ক্রমাগত বেড়েছে উত্তেজনা। উত্তেজনার পারদ আরো একধাপ চড়িয়ে তেহরান ঘোষণা দিয়েছে চুক্তিতে বেঁধে সীমা ছাড়িয়ে তারা ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ করবে। এতে ওয়াশিংটন ক্ষুব্ধ হলেও ইউরোপীয় দেশগুলো পরোক্ষভাবে ইরানের অবস্থানকে সমর্থন করেছে।
১২ মে ও ১৩ জুন হরমুজ প্রণালিতে দুটো তেল ট্যাঙ্কারে হামলার পর এর জন্য ইরানকে দায়ী করা যায় কি না সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের উত্তরে আমিরাতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ আব্দুল্লাহ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান বলেন, ‘সত্যি বলতে কি প্রমাণ ছাড়া কোনো দেশকে আমরা দায়ী করতে পারি না। এ ঘটনার সঙ্গে কোনো দেশের সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়া গেলে আমি মনে করি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় তার বিরুদ্ধে সরব হবে।’ তিনি আরো বলেন, ‘এখন আমাদের প্রয়োজন স্পষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ।’ যুক্তরাষ্ট্রের উপসাগরীয় মিত্রের এমন মন্তব্য ওয়াশিংটনকে হতভম্ব করেছে নিঃসন্দেহে। এদিকে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়ার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। ট্রাম্প প্রশাসন চাইছে তেহরানের ওপর সর্বোচ্চ চাপ বজায় রেখে দেশটিকে নতুন একটি পরমাণু চুক্তিতে আসতে বাধ্য করতে। যে চুক্তির মাধ্যমে ইরান পরমাণু ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি পুরোপুরি বাদ দিতে বাধ্য হবে। বিনিময় ইরানের ওপর থেকে সব নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া হবে ও দেশটির সঙ্গে পূর্ণ কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করবে যুক্তরাষ্ট্র।
ট্রাম্প সাম্প্রতিক সপ্তাহে বিভিন্ন টুইটে প্রশ্ন তোলেন যে, উপসাগরীয় অঞ্চলে তেল পরিবহন নিরাপদ রাখার দায়িত্ব যুক্তরাষ্ট্র কেন এককভাবে পালন করবে। তিনি এক্ষেত্রে সহযোগিতা করার জন্য মিত্র দেশগুলোকে এগিয়ে আসার আহবান জানান। নিউইয়র্ক ভিত্তিক গবেষণা সংস্থা ইউরেশিয়ার মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক বিশ্লেষক হেনরি রোম বলেন, ‘এর মধ্যদিয়ে ট্রাম্প আঞ্চলিক নিরাপত্তা গ্যারান্টার হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকাকে প্রশ্নবিদ্ধ করার পাশাপাশি আঞ্চলিক মিত্রদের ওপর নতুন এক চাপ তৈরি করলেন। রোম বলেন, ট্রাম্প ইতিপূর্বে নিরাপত্তা ইস্যুতে ইউরোপ, দক্ষিণ কোরিয়া বা জাপানকে যে ধরনের কথা বলেছিলেন উপসাগরীয় মিত্র সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতকে এখন পরোক্ষভাবে সে কথাটিই বললেন।