সম্প্রীতির মিলনে কক্সবাজার সৈকতে প্রতিমা বিসর্জন

বৃষ্টি আর চোখের জলে একাকার হয়ে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে সম্পন্ন হলো দুর্গাপূজার চূড়ান্ত আনুষ্ঠানিকতা—মা দুর্গার বিসর্জন। বিজয়া দশমীর দিনে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে লাখো মানুষের উপস্থিতিতে পরিণত হয় এক সম্প্রীতির মহামেলায়।

বৃহস্পতিবার (২ অক্টোবর) সকাল থেকেই বৈরি আবহাওয়ার মাঝে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টির মধ্যে জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রতিমা নিয়ে আসতে থাকেন পূজার্থীরা। লাবণী পয়েন্ট থেকে শুরু করে কয়েক কিলোমিটারজুড়ে সৈকতজুড়ে ছিল ঢাক-ঢোল, উলুধ্বনি ও আনন্দের রঙে রাঙানো উৎসবমুখর পরিবেশ।

সনাতন ধর্মাবলম্বীদের এই বার্ষিক ধর্মীয় উৎসবের শেষ দিনটি শুধু তাদেরই নয়—পরিণত হয় সার্বজনীন উৎসবে। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের পাশাপাশি মুসলিম, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীসহ সাধারণ পর্যটকরাও অংশ নেন এই বর্ণিল আয়োজনে। কক্সবাজার শহরের বাসিন্দা সাজু বড়ুয়া বলেন, 'বিজয়া দশমী এখন কেবল হিন্দুদের নয়, এটি বাঙালির একটি অসাম্প্রদায়িক উৎসবে পরিণত হয়েছে।'

কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে প্রতিমা বিসর্জন। ছবি: ইত্তেফাক

বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে পূজার পুরোহিতের মন্ত্রপাঠের মাধ্যমে শুরু হয় প্রতিমা বিসর্জন। ঢাকের তালে তালে, রঙে রাঙানো মুখে, ভিজে শরীর ও মন নিয়ে একে একে সাগরে বিসর্জন দেওয়া হয় প্রতিমা। বিসর্জনের সময় শিশু-কিশোর ও যুবারা প্রতিমার সঙ্গে সাগরে নেমে পড়ে আনন্দে মেতে ওঠে।

প্রতিমা বিসর্জনে আসা জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের নেতা বুলবুল তালুকদার বলেন, 'দেবী দুর্গা বছরে একবার আসেন, কিন্তু তাকে এত দ্রুত বিদায় দিতে হয়—এই ব্যথাই বিসর্জনের বেদনা।' 

তিনি আরও বলেন, 'দীর্ঘ সৈকতের কোথাও একটি নিরিবিলি জায়গায় স্থায়ী মন্দিরের দাবি জানাই।'

বিসর্জন ঘিরে ছিল নজিরবিহীন নিরাপত্তা ব্যবস্থা। সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, র‍্যাব, পুলিশ, আনসার, কোস্টগার্ড, দমকল ও লাইফগার্ডদের সমন্বয়ে গঠিত ছিল কয়েক স্তরের নিরাপত্তা বলয়। পুলিশ সুপার মো. সাইফুদ্দিন শাহীন জানান, 'গোপনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নারী সদস্যরাও কাজ করেছেন, যাতে যেকোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়ানো যায়।'

কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের সহায়তায় সৈকতের মুক্তমঞ্চে আয়োজিত বিসর্জন পূর্ববর্তী অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন জেলা পূজা উদযাপন কমিটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি উদয় শংকর পাল মিঠু। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন জেলা প্রশাসক এম এ মান্নান।

বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিএনপি নেতা সাবেক এমপি লুৎফর রহমান কাজল, জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট শামীম আরা স্বপ্না, র‌্যাব-১৫ এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. কামরুল হাসান, ট্যুরিস্ট পুলিশের প্রধান অতিরিক্ত ডিআইজি আপেল মাহমুদ, পুলিশ সুপার মো. সাইফুদ্দিন শাহীন, সাবেক মেয়র সরওয়ার কামালসহ জেলা প্রশাসনের অন্যান্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।

জেলা পূজা উদযাপন কমিটি সূত্রে জানা গেছে, এবছর কক্সবাজার জেলায় মোট ৩১৭টি পূজামণ্ডপে দুর্গোৎসব পালিত হয়। এর মধ্যে ১৫২টি ছিল প্রতিমা পূজা এবং ১৬৬টি ঘট পূজা।