মাদক নিয়ে সহিংস ঘটনায় আতঙ্কিত পল্লবীবাসী

যুবকের নাম রিফাত খান। গত সোমবার প্রকাশ্য দিবালোকে  (৩০ সেপ্টেম্বর) বাবার সামনে ছুরিকাঘাতে নিহত হন। আহত হন তার বাবা সাগর খান। বাসা পল্লবীর ১২ নম্বর সেকশনের ‘ডি’ ব্লকের ২৫ নম্বর সড়কে।    তাদের গ্রামের বাড়ি শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার উত্তর সালদর গ্রামে।

পুলিশ জানিয়েছে, মাদক নিয়ে বিরোধের জেরে এ খুনের ঘটনা ঘটে। এ ব্যাপারে পল্লবী থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আবু কাইয়ুম জানিয়েছেন, পল্লবী পুরাতন থানার পেছনে রেনেসাঁ মোড়ে বন্ধুদের ছুরিকাঘাতে আহত হন রিফাত। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পর মৃত্যু হয় তার।

তিনি জানান, গাঁজা সেবন নিয়ে রিফাতের সঙ্গে তার বন্ধুদের বিতণ্ডা হয়। বন্ধুরা রিফাতকে আটকে রেখে মারধর ও ছুরিকাঘাত করে। পরে তার বাবা খবর পেয়ে সেখানে গিয়ে রিফাতের বন্ধুদের সঙ্গে বিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়েন।  এসময় রিফাতের বন্ধুরা তার বাবাকেও ছুরিকাঘাত করেন। দুজনকে হাসপাতালে নেওয়ার পর রিফাতের মৃত্যু হয়। রিফাতের বাবা সাগর খান হাসপাতালে গণমাধ্যমে জানিয়েছিলেন, ছেলেকে আটকের খবর পেয়ে সেখানে গেলে তারা টাকা-পয়সার লেনদেন নিয়ে ঝামেলা বলে জানায়। কথা বলার এক পর্যায়ে ঐ যুবকরা তার ওপরও হামলা চালায় বলে সাগর খান বলেছেন। 

এ ব্যাপারে পল্লবী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) শফিউল ইসলাম  জানিয়েছেন, মাদক সেবনের সময় ভাগে কম পড়ায় কারণে তার বন্ধুদের সঙ্গে বিরোধের জেরে এ হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। মামলা হয়েছে। আসামিরা পলাতক। তাদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে। অপর এক প্রশ্নের জবাবে ওসি বলেন, আমরা পল্লবী থানা এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে তত্পর আছি। মাদকবিরোধী অভিযান চলমান আছে।

নিরাপত্তাহীনতায় এলাকাবাসী : শুধু রিফাতই নয়। রাজধানীর পল্লবীতে আধিপত্য বিস্তার ও মাদক কারবারকে কেন্দ্র করে একের পর এক সহিংস ঘটনা ঘটে চলেছে। এর আগে কয়েক সপ্তাহে পল্লবীর বিভিন্ন এলাকায় সন্ত্রাসী হামলা, গুলি ও কুপিয়ে জখমের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় জনমনে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে, নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন এলাকাবাসী।

গুলি ছুড়ে আতঙ্ক সৃষ্টি : প্রত্যক্ষদর্শী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সূত্র জানায়, গত ১৭ সেপ্টেম্বর রাতে পল্লবী এলাকার মিরপুর-১২ নম্বর সেকশনের বেগুনটিলা বস্তিতে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে  সন্ত্রাসী মাসুম গ্রুপ গুলি চালায়। এ সময় অস্ত্রধারী জীবন, সাহেব আলী, নাদিম ও মাসুম এলাকার দোকান লুটপাট করে, গুলি ছুড়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করেন।

মাদকবিরোধী অবস্থানের কারণে হামলা : গত ৪ সেপ্টেম্বর  রাতে সেকশন-১১-এর মিল্লাত ক্যাম্প এলাকায় ছাত্রদল নেতা ও পল্লবী থানা ছাত্রদলের আহ্বায়ক সৈয়দ হাসান সোহেলকে কুপিয়ে গুরুতর জখম করে স্থানীয় মাদক কারবারিরা। হামলায় তার ভাই সৈয়দ হাসান রনি, ছাত্রদল নেতা হূদয় ও ডলারও আহত হন।

এলাকাবাসী জানান, দুই দিন আগে সোহেল এলাকায় মাদকের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ায় আলোচিত মাদক সম্রাজ্ঞী ‘পৃথিবী’র ভাই-বোন এবং শীর্ষ সন্ত্রাসী হুদা মামুনসহ শতাধিক কারবারি ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। পুলিশের মাদক নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার কারণেই এ হামলা সংঘটিত হয়েছে।

পল্লবী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) শফিউল ইসলাম  জানিয়েছেন, মিল্লাত ক্যাম্প এলাকায় ছাত্রদল নেতা সোহেলের ওপর হামলার ঘটনায় একটি মামলা হয়েছে। বেগুনটিলা এলাকায় গোলাগুলির ঘটনায় ঘটনাস্থলে গিয়েছিলাম। তবে সেখানে গোলাগুলির কোনো আলামত পাওয়া যায়নি।

মাদক কারবারিকে কুপিয়ে জখম : গত ১৩ সেপ্টেম্বর রাত সাড়ে ১০টার দিকে কালশী ২২ তলা গার্মেন্টস সংলগ্ন আদর্শনগর ডুইপ এলাকায় চাঁদা দাবিকে কেন্দ্র করে মাদক কারবারি লাভলীকে  কুপিয়ে ও তার ভাই সুমন মিজিকে  গুলি করে রক্তাক্ত জখম করে সন্ত্রাসীরা।

স্থানীয় সূত্র জানায়, সেনাবাহিনীর কাছে তথ্য দেওয়ার সন্দেহে দীর্ঘদিন ধরেই লাভলী ও সুমনকে হত্যার হুমকি দেওয়া হচ্ছিল। হামলার পর সেনাবাহিনীর একটি টিম ঘটনাস্থল থেকে ৮-১০ জনকে গ্রেফতার করে। বর্তমানে গুরুতর আহত সুমন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিত্সাধীন এবং লাভলী চিকিত্সা শেষে বাসায় ফিরেছেন।

গুলিবিদ্ধ ভুক্তভোগী সুমনের ভাই মামুন অভিযোগ করে বলেন, গুলিবিদ্ধ হওয়ার পরে আমরা তাকে (সুমন) হাসপাতালে নিয়ে যাই চিকিত্সার জন্য। এই হামলার ঘটনার দুই দিন পরে পল্লবী থানায় মামলা করতে গেলে মামলা নেয়নি পুলিশ। থানায় মামলা করতে যাওয়ার তথ্য হামলাকারীরা কীভাবে যেন পেয়ে যায়। থানার কোনো কর্মকর্তা তাদের জানিয়ে দেন। আমার ভাই গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনায় এখন পর্যন্ত মামলা করতে পারিনি!

মাদকের টাকা ভাগাভাগি নিয়ে সংঘর্ষ : চলতি বছরের ১৪ ফেব্রুয়ারি মধ্যরাতে রাজধানীর মিরপুরে পল্লবী থানা এলাকায় মাদকের টাকা ভাগাভাগি নিয়ে রাস্তায় গুলিবিদ্ধ হয়েছেন দুজন। মিরপুর ১১ নম্বর সেকশনের ‘ই’ ব্লকের ১ নম্বর সড়কে এ ঘটনা ঘটে। এ সময় আহত হন মো. জসিম উদ্দিন ও তার বোন শাহিনুর বেগম।

 সংঘর্ষের ব্যাপারে পুলিশ জানায়, মাদক ব্যবসার টাকা ভাগাভাগি নিয়ে ঐ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। মিরপুর ১১ নম্বর সেকশন এলাকার শহীদুল ও তুহিন গ্রুপের সঙ্গে জসিম ও তার বোন শাহিনুর মাদক ব্যবসা করেন। তাদের মধ্যে টাকা ভাগাভাগি নিয়ে দ্বন্দ্ব বাঁধে। এক পর্যায়ে তাদের মধ্যে গুলি বিনিময় হয়। এতে জসিম ও তার বোন শাহিনুর গুলিবিদ্ধ হন।

মাদক কারবারিদের গুলিতে গৃহবধূ নিহত : ২০২৪ সালের ৩০ অক্টোবর বিকালে পল্লবী থানাধীন মিরপুর ১১ নম্বরের বাউনিয়াবাঁধ ‘বি’ ব্লকে চিহ্নিত মাদক কারবারি মমিন, শাবু, সম্রাট, শামিম, জয়নাল, ইদ্রিস কালা মোতালেব, কামাল, জাহাঙ্গীর, আল ইসলাম, ভেজাল মামুন, জয়, ইউনুস, রুবেলসহ অজ্ঞাতনামা ১৪-১৫ জন এলাকার শীর্ষ মাদক কারবারি মামুনের কাছে চাঁদা দাবি করেন। এ নিয়ে দুই গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষ ও গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। এতে বাউনিয়াবাঁধ ‘বি’ ব্লকের একটি বাসার দ্বিতীয় তলার সিঁড়ির করিডোরে দাঁড়িয়ে থাকা আয়েশা আক্তার গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলেই মারা যান।

প্রতিনিয়ত সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ঘটছে : স্থানীয়রা অভিযোগ করে বলেন, পল্লবীতে আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি ও মাদক কারবারিকে  কেন্দ্র করে প্রতিনিয়ত সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ঘটছে। এতে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। তারা দ্রুত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

ঢাকা মহানগর পুলিশ সূত্র জানায়, মিরপুর বিভাগের মধ্যে সবচেয়ে সন্ত্রাসী কার্যক্রম হচ্ছে পল্লবী থানায়। গত আগস্ট মাসে এ থানায় দুই শতাধিক মামলা হয়েছে। আর চলতি মাসে আগের মাসের তুলনায় মামলার সংখ্যা আরো বেশি।