সমন্বয়হীনতা ও ভূমি অধিগ্রহণ জটিলতায় বন্ধ রয়েছে একাধিক সেতু নির্মাণের কাজ

ভূমি অধিগ্রহণ জটিলতায় দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে মাদারীপুর জেলার শিবচর উপজেলার একাধিক নদীর ওপর নির্মাণাধীন ব্রিজের কাজ। এতে ভোগান্তিতে পড়েছে দু’পারের হাজার-হাজার মানুষ। কোটি কোটি টাকার ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে সরকার। জনগণের প্রশ্ন কে নেবে এর দায়? 

সমন্বয়হীনতার কারণে ব্রিজের নির্মাণ কাজ বন্ধ রয়েছে বলে একাধিক সূত্র থেকে জানা যায়। সমস্যা সমাধানের দিকে গুরুত্ব না দিয়ে, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা একে অন্যের ওপর দায় চাপাতেই বেশি ব্যস্ত রয়েছে বলে জানা যায়। উপজেলার সচেতন মহল জানতে চায়, কেন এই জটিলতা?

এদিকে ভূমি অধিগ্রহণকে কেন্দ্র করে উপজেলা থেকে জেলা পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট বিভাগের শরণাপন্ন হয়েও কোনো সমাধান পাচ্ছে না জমির মালিক পক্ষ। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর সমন্বয়ে সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে নির্মাণাধীন সেতুর কাজ। এমনটাই জানিয়েছেন ভুক্তভোগী পরিবার ও এলজিআরডি অফিসের পক্ষ থেকে। এতে চরম ভোগান্তির মধ্যে পরেছে ওই এলাকার জনগণ।

কুতুবপুর নির্মাণাধীন ব্রিজ সংলগ্ন এলাকার ভুক্তভোগী হিমেল মোল্লা বলেন, দীর্ঘদিন ধরে জমি অধিগ্রহণের ন্যায্যমূল্য পাওয়ার আশায় শিবচর-মাদারীপুরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের পেছনে পেছনে ঘুরে আসছি। তাদের পক্ষ থেকে কোনো সুরাহা না পেয়ে ভুক্তভোগী সবার সমন্বয়ে কোর্টে একটা মামলা করা হয়েছে। সেখান থেকে এখনো কোনো সরাহা মেলেনি। জমির অধিগ্রহণ সমস্যার সমাধান না করে, কোনো কাজ করতে দেয়া হবে না বলে তিনি জানান।

আড়িয়াল খাঁ নদের ওপর নির্মিত সেতু এলাকার ভুক্তভোগীদের পক্ষে আফজাল শিকদার বলেন, গত কয়েকবছর পূর্বে এই নদীটির ড্রেজিং করে সমূদয় বালু দুই পরের ওই এলাকার মানুষের ফসলি জমির ওপর রাখা হয়। ওইসময় সব জমিতে ফসল থাকা স্বত্বেও ক্ষতিপূরণের আশ্বাসে এলাকার মানুষ কোনো রকম বাঁধার সৃষ্টি করে নাই। আজ অবধি ভুক্তভোগী সেই পরিবারগুলো কোনো ক্ষতিপূরণ পায়নি। ওই এলাকার অধিকাংশ মানুষ কৃষি কাজের ওপর নির্ভরশীল। ফসলি জমির ওপর বালু রাখার কারণে অনেকেই মানবেতর জীবনযাপন করছে। জীবনধারণের জন্য কৃষিকাজ বাদ দিয়ে অনেকেই অন্য পেশায় চলে গেছে। ওইসব পতিত জমি সরকার কর্তৃক অধিগ্রহণে জমির মালিক পক্ষ ক্ষতিপূরণ পাওয়ার আশায় বুক বেঁধে ছিল কিন্তু দুই বিভাগের সমন্বয়হীনতার কারণে তাও ভেস্তে যেতে শুরু করেছে। কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে একাধিকবার আশ্বাস পেলেও এখনো কোন সুরাহা মেলেনি।

শিবচর উপজেলা প্রকৌশলী কে এম রেজাউল করিম জানান, উপজেলায় প্রায় দেড়শ’ কোটি টাকা ব্যয়ে দুইটি নির্মাণাধীন ব্রিজের কাজ দীর্ঘদিন ধরে ভূমি অধিগ্রহণ সংক্রান্ত জটিলতায় বন্ধ রয়েছে। এর মধ্যে একটি মাদারীপুর, শরিয়তপুর ও রাজবাড়ী জেলার গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প এর আয়তায় মাদারীপুর জেলার শিবচর উপজেলাধীন শিবচর উপজেলা হতে রাজৈর (ভায়া- উৎরাইল জিসি, শিরুয়াইল, বাঘমারা হাট, কবিরাজপুর জিসি) আড়িয়াল খাঁ নদের ওপর ৪০০০ মিঃ চেইনেজে ৫৫০ মিঃ দীর্ঘ পিএসসি গার্ডার সেতু (লিটন চৌধুরী সেতু) নির্মাণ কাজের ভূমি অধিগ্রহণের যাবতীয় তথ্য গত ১৮ জুলাই ২০২২ তারিখে জেলা প্রশাসক বরাবর ২৫০১নং স্মারকে পত্র প্রেরণ করা হয়। যার প্রেক্ষিতে গত ৬ ডিসেম্বর ২০২৩ তারিখে ৪ ধারা নোটিশ জারি করা হলেও আজ অবধি ৭ ধারা নোটিশ জারি করা হয়নি।

অন্যদিকে মাদারীপুর শরিয়তপুর ও রাজবাড়ী জেলার গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প (১ম সংশোধিত) এর আয়তায় মাদারীপুর জেলার শিবচর উপজেলাধীন আরএন্ডএইচ বাইপাস সড়ক হতে কাঁঠালবাড়ি ফেরিঘাট ভায়া কুতুবপুর গ্রোথ সেন্টার এন্ড বাংলাবাজার রাস্তায় ৭২৮০ মিঃ চেইনেজে ১৫০ দীর্ঘ পিএসসি গার্ডার সেতু এর দুই পাশের এ্যাপ্রচ সড়কের ভূমি অধিগ্রহণের জন্য গত ২৯ এপ্রিল, ২০২৪ ইং তারিখে জেলা প্রকৌশলী কর্তৃক জেলা প্রশাসক বরাবর ৫৭২৪ নং স্মারকে প্রেরণ করা হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৩ জুন, ২০২৪ ইং তারিখে ৪ ধারা নোটিশ জারি করেন জেলা প্রশাসক। নোটিশ জারির এক বছর পার হয়ে গেলেও আজ অবধি ৭ ধারা নোটিশ জারি করা হয় নাই। এরি মধ্যে সচিবালয় থেকে জেলা প্রশাসক বরাবর ওই কাজের অগ্রগতি সম্পর্কে তথ্য চেয়ে পত্র প্রেরণ করার প্রায় ৪ মাস অতিবাহিত হলেও এখনো কোনো প্রকার তথ্য প্রেরণ করা হয়নি বলে তিনি জানান। উৎরাইল ব্রিজের নির্মাণ কাল এ বছরের অক্টোবরে শেষ হয়ে যাবে কিন্তু ভূমি অধিগ্রহণ জটিলতায় এখনো পর্যন্ত ৫০ ভাগ কাজও শেষ করা যায়নি।

জেলা নির্বাহী প্রকৌশলী বাদল চন্দ্র কীর্তনীয়া জানান, জেলা প্রশাসক দপ্তরের কাজের দীর্ঘসূত্রিতা এবং সমন্বয়হীনতার কারণে জেলার একাধিক উন্নয়নমূলক কাজ বন্ধ রয়েছে। যতো দ্রুত সম্ভব জেলা প্রশাসকের সাথে সমন্বয় সাধনের মাধ্যমে জটিলতা নিরসন করে কাজ শুরু করা হবে।

অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (উন্নয়ন ও মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা) জুয়েল আহমেদ বলেন, প্রত্যাশা সংস্থার অধিগ্রহণ কার্যক্রম চূড়ান্ত হওয়ার পূর্বে পূর্ত কাজ শুরু করায় ভূমি অধিগ্রহণ সংক্রান্ত ওই জটিলতার সৃষ্টি হয়েছে। তবে ওইসব জটিলতা নিরসনে আমাদের কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। আশা করি দ্রুতই জটিলতা নিরসন হয়ে যাবে।