বাংলাদেশের ন্যায় উন্নয়নশীল দেশসমূহের সমস্যা হইল, এইখানে কোনো একটি কাজ ব্যাপক তোড়জোড় লইয়া শুরু করা হয়; কিন্তু ইহার পর তাহা যেন ঝিমাইয়া পড়ে, রুগ্ন হইয়া যায়। প্রায় প্রতিটি সেক্টরেই এই সংস্কৃতি বিরাজমান। বিশেষ করিয়া বলিতে হয় স্বাস্থ্য খাতের ন্যায় জনগুরুত্বপূর্ণ খাতগুলির কথা। বৎসরের পর বৎসর কী অবস্থার মধ্য দিয়া যাইতেছে আমাদের হেলথ সেক্টর? পার্শ্ববর্তী দেশসমূহ যেইখানে চিকিৎসা ব্যবস্থায় উত্তরোত্তর উন্নতি করিতেছে, সেইখানে আমরা হাঁটিতেছি পিছনের দিকে! বিষয়টি স্পষ্ট হয় খোদ প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের এক সাম্প্রতিক বক্তৃতায়; তিনি বলিয়াছিলেন, 'সরকারি চিকিৎসায় সমস্যা হইতেছে, যাহা চাহিতেছেন, তাহা পাইতেছেন না। আমাদের নিকট বহু হাসপাতাল পড়িয়া রহিয়াছে; কিন্তু ডাক্তার নাই। খামোখা এত টাকা খরচ করিয়া দালান তৈরি করিয়া যন্ত্রপাতি বসাইয়া এত কষ্টের মধ্যে যাওয়ার দরকার কী!' দেশের স্বাস্থ্য খাতের কাহিল অবস্থা বুঝিতে এই একটি মন্তব্যই যথেষ্ট।
গত শনিবার দৈনিক ইত্তেফাকে প্রকাশিত বরিশাল অঞ্চলের একমাত্র বিশেষায়িত বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজের (শেবাচিম) এক করুণ চিত্র আমাদের দৃষ্টিগোচর হইয়াছে। ঐ প্রতিবেদনে উঠিয়া আসিয়াছে যে, আজ হইতে প্রায় পাঁচ যুগ পূর্বে প্রতিষ্ঠিত হাসপাতালটিতে এখনো চিকিৎসাসেবার কাঙ্ক্ষিত মান বাড়েনি, বরং বহুমাত্রিক সংকটে ব্যাপকভাবে ব্যাহত হইতেছে চিকিৎসাসেবা। বর্তমানে প্রতিদিন গড়ে ৫০০ নূতন রোগী এইখানে ভর্তি হন; নিয়মিত ভর্তি থাকেন আড়াই হাজারেরও অধিক রোগী; আর বহির্বিভাগে চিকিৎসা লইতে আসেন গড়ে আড়াই হাজার রোগী।
অথচ ১৯৬৮ সালে ৩৬০ শয্যার অবকাঠামো লইয়া নির্মিত এই হাসপাতালে এত বৎসরেও নাই উন্নতির ছোঁয়া: না অবকাঠামোগত উন্নতি ঘটিয়াছে, না কাঙ্ক্ষিত সেবার মান-ইহা কেমন কথা? জনবলসংকট, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জামাদির ঘাটতি, চিকিৎসক স্বল্পতা তো রহিয়াছেই। ফলে পদে পদে ভোগান্তি পোহাইতে হইতেছে রোগী এবং তাহার পরিবার বা স্বজনদের। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক কিংবা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের নজরদারি না থাকিবার কারণেই চিকিৎসা কার্যক্রম এইভাবে বিঘ্নিত হইতেছে বলিয়া রোগী, স্বজনসহ সচেতন মহলের অভিযোগ।
এই রকম একটি বা দুইটি নহে, দেশের হাসপাতাল-ক্লিনিকগুলির অধিকাংশই এক অবর্ণনীয় করুণ দশায় নিপতিত। খোদ রাজধানী শহর বা ইহার আশপাশের এলাকাগুলি এই রকম মুমূর্ষু চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠানে সয়লাব। উদাহরণস্বরূপ, ঢাকার উপকণ্ঠ ধামরাই উপজেলাস্থ ৫০ শয্যাবিশিষ্ট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং রোয়াইল ইউনিয়নের কৃষ্ণনগরের ২০ শয্যাবিশিষ্ট একটি হাসপাতালের কথা বলিতে হয়। গণমাধ্যমের খবরে জানা যায়, এই দুইটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ডাক্তারদের পোস্টিং থাকিলেও বাস্তবে তাহাদের সেইখানে পাওয়া যায় না। ইহা অতি কমন প্র্যাকটিস বটে। প্রত্যন্ত অঞ্চলের হাসপাতালগুলিতে ডাক্তাররা যাইতে চাহেন না, নানান অজুহাত দেখান। ইহা লইয়া বহু কথা বলা হয়, তথাপি অবস্থার পরিবর্তন ঘটে না।
উপরন্তু বিভিন্ন সময় অভিযোগ উঠে, সমগ্র হেলথ সেক্টরটি চলে সিন্ডিকেটের ইশারায়; প্রতিটি হাসপাতাল-ক্লিনিকে তাহাদের বিচরণ ও দৌরাত্ম্য এতটাই অবাধ যে, ডাক্তারদের বদলি-বাণিজ্য হইতে শুরু করিয়া ঔষধ বা চিকিৎসা সরঞ্জামাদি ক্রয়সহ সকল ক্ষেত্রে তাহাদের কথাতেই যেন সকল কিছু চলে। এমনকি ব্যক্তিস্বার্থে রাজনৈতিক প্রভাবপ্রতিপত্তি বা বলপ্রয়োগ করিবার ঘটনার কথাও শোনা যায় প্রায়ই। প্রশ্ন হইল, সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক নেতৃত্ব কি ইহা চোখে দেখেন না? প্রতিটি অঞ্চলে সচেতন মহল আছেন, তাহাদের কি এই ক্ষেত্রে কোনোই দায়িত্ব নাই?
প্রধান উপদেষ্টা তাহার ঐ বক্তব্যে বলিয়াছিলেন, 'সরকারের হাসপাতাল মানে বিপদের বোঝা আরেক ঘাড়ে চাপিবে। ডাক্তার থাকিবে না, ঔষধ থাকিবে না, বই থাকিবে না।' স্বাস্থ্যসেবা খাতে আসলে কী এমন ঘটিয়া থাকে যে, এই সেক্টরটি ক্রমশ 'বিপদের বোঝা' হইয়া উঠিল, একদমই ঘুরিয়া দাঁড়াইতে পারিল না? ইহা ঠান্ডা মাথায় চিন্তা করিয়া দেখিতে হইবে। সংকট উত্তরণে এই সেক্টরে যেমন ম্যানেজমেন্টের উপর গুরুত্ব দিতে হইবে, তেমনি বাড়াইতে হইবে নজরদারি। স্বাস্থ্য খাতের উন্নতি প্রতিটি বিবেকবান নাগরিকেরই একান্ত কামনা: আর সেই জন্য যথাযথ তদারকিসহ এই খাতে রাষ্ট্রের টাকার সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা জরুরি।