দেশপ্রেম থিমধর্মী টি-শার্টে অনন্য

দেশীয় ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রিতে ‘নিত্যউপহার’ ফ্যাশনপ্রেমীদের কাছে একটি স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠান। দেখতে দেখতে এই ফ্যাশন হাউসটি আঠারো বছরে পর্দাপণ করেছে। ক্রেতাদের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি টি-শার্ট দিয়ে দেশের নাম সমুজ্জ্বল করেছে প্রতিষ্ঠানটি। সম্প্রতি কড়চার আয়োজনে এই ফ্যাশন হাউসের কর্ণধার ও ডিজাইনার বাহার রহমানের সঙ্গে এক আড্ডার আয়োজন করা হয়। সেই আড্ডার চুম্বকীয় অংশ তুলে ধরেছেন খালেদ আহমেদ ও ছবি তুলেছেন তন্ময় মির্জা

নিত্য উপহারের আঠারোতম বসন্তে আপনার অনুভূতির কথা জানতে চাই।

১৮ বছর তখনই গুরুত্ব পেল, যখন মানুষ আমাদের কর্মকাণ্ডকে গ্রহণ করল। মানুষ নিত্যদিন নিত্য উপহারের পোশাক ব্যবহার করছে। নিত্য উপহারের প্রতি এসব মানুষের ভালোবাসা যখন প্রকাশিত হয়, তখন আমরা গর্বিত হই। তখনই আসলে ১৮ বছর উদযাপনের ছোট একটি সুযোগও তৈরি হয়। আমাদের পোশাকশিল্প রপ্তানিমুখী। এ শিল্পে দিনের ৮ ঘণ্টায় যে পরিমাণ টি-শার্ট উত্পাদন করা হয় বা ১ ঘণ্টা বা ১ মিনিটে যে পরিমাণ উত্পাদন করে বা রপ্তানি করে, নিত্য উপহার হয়তো ১৮ বছরেও তা তৈরি করেনি। অথচ নিত্য উপহারের প্রতি মানুষের যে প্রত্যাশা, তার মধ্য দিয়েই আমরা এই ১৮ বছরের বিশেষত্ব বুঝতে পারি। ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রি অনেক বড় বিষয়। আমরা ফ্যাশনের একটি বিশেষ দিক নিয়ে কাজ করি, যে দিকটা আসলে আমাদের জন্য সহজে করা সম্ভব। আমরা শুধু টি-শার্ট নিয়ে কাজ করি, ফ্যাশনের অন্যান্য কর্মকাণ্ডের সঙ্গে আমরা কমই জড়িত। নিত্য উপহার যে কাজ করে, তা একটা ধরন বা মডেল। এটা একটা কাজের পদ্ধতি। এটার বিশেষ ধরন হলো, আমরা আমাদের কাজের সঙ্গে মানুষকে সম্পৃক্ত করতে ভালোবাসি, আমাদের ইতিহাস-ঐতিহ্যকে সম্পৃক্ত করতে পছন্দ করি। এই বিশেষ দিকগুলোই আসলে নিত্য উপহারকে আলাদা করেছে।

আপনার পোশাকের ডিজাইনে শিল্পীদের আঁকা ছবির ব্যবহার বেশি হয়। এর কারণটা জানতে চাই।

নিত্য উপহারের এটি একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য। আমরা শিল্পীদের আঁকা ছবি নিয়ে টি-শার্ট বানাই। ছোটদের আঁকা ছবি নিয়ে টি-শার্ট বানাই। আমরা শিল্পীদের অংকনশৈলীগুলোকে টি-শার্টের মাধ্যমে উপস্থাপন করি। আমাদের কাজে শিল্প-সাহিত্যের বিশেষ বহিঃপ্রকাশ ঘটে। আমরা চেষ্টা করি, আমাদের ঐতিহ্যকে মানুষের কাছে টি-শার্টের মাধ্যমে পৌঁছাতে। আসলে সৃষ্টিশীল মানুষের কাজের মধ্যে রয়েছে অসীম শক্তি। আমরা মনে করি, আমাদের বাইরের মোটিফ ধার করার প্রয়োজন নেই। আমাদের শিল্পীরা এই দেশের ঐতিহ্য ও রূপকে তুলে ধরছে, তাই বাইরের ঐতিহ্য ব্যবহার করার প্রয়োজন হচ্ছে না। বাইরের মোটিফ আমাদের উজ্জীবিত করে, কিন্তু সেটা আমাদের পরিচায়ক নয়। এই কথা বিবেচনা করে আমরা আমাদের শিল্পীদের কাজগুলো নিয়ে টি-শার্ট তৈরি করছি।

দেশীয় ফ্যাশন শিল্পের প্রসার ঘটলেও কোনো কোনো উদ্যোক্তার অভিযোগ করেন ‘ব্যবসা নেই’। আবার বিদেশি ডিজাইনাররা আমাদের এখানে এসে প্রদর্শনীর নামে তাদের পোশাক বিক্রি করছেন। যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে আমাদের ফ্যাশন সেক্টরে। এই দুটি বিষয় আপনি কিভাবে দেখছেন?

আমাদের গার্মেন্টস সেক্টরের প্রসারের জন্য আসলে সরকারের নজরদারি দরকার। আমরা ২০১৭ সালে নারী ও শিশুদের পোশাক আমদানির সময় দেখেছি যে আমদানি শুল্ক কমেছে। এটা যে রকম সত্যি, সে হিসেবে ১০/১১ কোটি মানুষের কাপড়ের চাহিদা এভাবে পূরণ সম্ভব না। আমার মনে হয় এটাও একটা কারণ। যে পোশাকগুলো আমদানি করা হয়, তার প্রতিটাই আলাদা গুণগত মান নিয়ে আসে। আরেকটা বড় বিষয় হলো, আমাদের পাশের দেশগুলো আমাদের থেকে অনেক বেশি অগ্রগামী। এ কারণে আসলে তারা আমাদের দেশে জায়গা করে নিয়েছে। এই দিকগুলো সরকারের একটু ভেবে দেখতে হবে। বাইরের ডিজাইনাররা আমাদের দেশে শো করে, এটার চেয়ে বড় সমস্যা হলো আমাদের প্রস্তুতি দরকার। প্রত্যেকের আরো ভালোভাবে কাজ করার দরকার বলে আমি মনে করি। প্রত্যেকের আসলে নিজেদের ভাষা খুঁজে পাওয়া দরকার। আমি যেটুকু দেখছি তাতে বেশ কিছু ডিজাইনারের কাজ আমার চোখে পড়েছে। ফ্যাশন ডিজাইন কাউন্সিল যে কাজ করছে, আমার মনে হয় তারা ভালো করছে। ডিজাইনারদের আগামী দিনের ভালো কাজের জন্য এগুলো বড় অবদান রাখবে। আমাদের দেশে যেসব ডিজাইনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আছে, সেগুলো আমাদের গার্মেন্টসগুলোকে সাহায্য করার জন্যই করা। কিন্তু তাদের অধিকাংশই দেশের বাইরের ডিজাইন নিয়ে কাজ করতে বেশি পছন্দ করছেন। এতে করে আমাদের দেশের ডিজাইনগুলো হারিয়ে যাচ্ছে।

আমাদের ফ্যাশন শিল্পের উন্নতিকল্পে উদ্যোক্তা ও ফ্যাশন ডিজাইনারদের যৌথ প্রচেষ্টা থাকতে হবে। এ বিষয়ে সরকারের সহযোগিতার কতটুকু প্রয়োজন বলে মনে করেন।

বিশ্ব পাঠশালা বা বাংলাদেশি পাঠশালায় পোশাকশিল্প এখন উন্মুক্ত। মানুষ কাজ করতে করতে শিখছে। ব্যক্তি উদ্যোগে ও ব্যক্তি চর্চায় আসলে দেশীয় কুটিরশিল্প এগিয়ে যাচ্ছে। পোশাকের উপরিতলের অলঙ্করণ নির্দেশক বা পরিচায়ক হিসেবে কাজ করে। এই বিষয়ে বেশ কয়েকটি গবেষণামূলক বইয়ের কথা বলা যেতে পারে। একটা চিত্রকল্পকে আমরা কত রকমের রূপ ও রেখা দিতে পারি, তা নিয়ে অনেক কথা আছে এসব বইয়ে। আর নতুনদের কাজ আর অভিজ্ঞদের কাজের পার্থক্য আমরা এই বইগুলো পড়লে বুঝতে পারব। আমি মনে করি, এই বইগুলো ফ্যাশন ডিজাইনারদের জন্য পাঠ্যপুস্তক হিসেবে রাখা উচিত। আমরা বিশ্বাস করি যে, আসলে অন্য কোথাও থেকে ধার করার প্রয়োজন নেই। আমরা নিজেরা অনেক ভালো কাজ করতে পারব, শুধু কাজের প্রতি ভালোবাসা থাকতে হবে। ভালো কাজ করার জন্য আমরা আমাদের নিজেদের সংস্কৃতির দিকে খেয়াল করলে দারুণ কাজ বের করে আনতে পারব। এছাড়া প্রাচীন স্থাপনাগুলোতে যে নকশা আছে, তা আমাদের নতুন ভাবনার জন্য যথেষ্ট। প্রতিটি হাউসের নিজেদের সক্ষমতা আছে। তবে সবাইকে সম্মিলিত হতে হবে। প্রত্যেককে নিজের কাজ করার ধরন কাজের ভিতর দিয়েই প্রকাশ করতে হবে। কাজের ধরনকে নবায়ন করা উচিত। ফ্যাশন এমন একটা বিষয় যে, এখন যেটা আছে, আগামীতে সেটা পুরনো হয়ে যায়। এই সেকশনে প্রায়ই পরিবর্তন সাধিত হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নিজেদের পরিবর্তন করা, কাজের দক্ষতা বাড়ানোর চেষ্টা করতে হবে। সবশেষে বলতে চাই, নিজেদের কাজের ধরনগুলো, কাজের বৈশিষ্ট্যগুলো মূল্যায়ন করা উচিত।