আগুনের ভাষা কী ইঙ্গিত বহন করে?

আ গুন শুধু পোড়ায় না, কখনো কখনো ভবিষ্যতের জন্য বার্তাও পাঠায়। সময়ে তা বুঝতে না পারলে অনেক বড় ক্ষতি হয়ে যায়, যা আর কখনো পূরণ হয় না। দেশ স্বাধীন হওয়ার অব্যবহিত পর, ১৯৭২ সালে প্রায়শই বিভিন্ন উপজেলার (তখনকার থানা সদরে) পাটগুদামে আগুন লাগার খবর পাওয়া যেত। অনেকেরই নিশ্চয়ই মনে আছে, সে সময়ে পাট ব্যবসাই ছিল দেশের প্রধান ব্যবসা। সে কারণেই প্রায় প্রতিটি থানা সদরেই ন্যূনতম চার-পাঁচটা করে পাটগুদাম ছিল।

তখনকার দিনে আজকের মতো এমন আধুনিক ও উন্নতমানের অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা ছিল না। তাই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটলে স্থানীয় লোকজনই কলস-বালতি দিয়ে কাছাকাছি কোনো পানির উৎস থেকে পানি এনে আগুন নেভানোর চেষ্টা করতেন। (নেত্রকোনার মোহনগঞ্জে এমন অন্তত দুটি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় আমি নিজেও আগুন নেভানোর কাজে অংশ নিয়েছি।) অবস্থাটা এমন ছিল যে, আজ এই থানায় আগুন লেগেছে, তো কাল আরেক থানায়। মানুষের মধ্যে রীতিমতো আগুন-আতঙ্ক। সাধারণ মানুষের মধ্যে যত না, ব্যবসায়ীদের মধ্যে সেই আতঙ্ক ছিল অনেক বেশি। কয়দিন পরপর আগুনকাণ্ডের কারণে একপর্যায়ে ধীরে ধীরে পাট ব্যবসায়ীরা তাদের ব্যবসা গুটিয়ে নেওয়া শুরু করে। কয়েক দশকের মধ্যেই একসময় পাটশিল্পটা মরে যায়।

গত কয়দিনে বাংলাদেশে বেশ কয়েকটি স্থানে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। প্রথম ঘটনাটি ঘটে ১৪ অক্টোবর রাজধানীর মিরপুরে। একটি কেমিক্যাল গোডাউনে লাগা ভয়াবহ আগুনে অন্তত ১৬ জনের প্রাণহানি ঘটে সেদিন। দুর্ঘটনায় নিহতদের স্বজনদের কান্না থামার আগেই ১৭ অক্টোবর চট্টগ্রাম রপ্তানি প্রক্রিয়াজাতকরণ এলাকায় (সিইপিজেড) একটি ভবনে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। সেটি থামতে না থামতেই একই দিনে সোনারগাঁওয়ের ঝাউচর এলাকায় মেঘনা গ্রুপের চিনিকারখানায় আগুন লাগে।

সর্বশেষ ঘটনাটি ঘটেছে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের এয়ার কার্গো কমপ্লেক্সে, যা নিয়ে এখন চলছে দেশ-বিদেশে আলোচনা। ২৬ ঘণ্টা ধরে চলা এই অগ্নিকাণ্ডের ফলে সরাসরি ক্ষতির সঠিক পরিমাণ এখনো নির্ধারণ করা হয়নি। তবে ব্যবসায়ীরা আশঙ্কা করছেন যে, এই ঘটনা দেশের আমদানি ও রপ্তানি কার্যক্রমে ১০০ কোটি ডলারেরও বেশি প্রভাব ফেলতে পারে।

ইন্টারন্যাশনাল এয়ার এক্সপ্রেস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি কবির আহমেদ খান জানিয়েছেন, 'প্রত্যক্ষ ক্ষতির পরিমাণ অনুমান করা এখনো সম্ভব নয়। তবে আমদানি ও রপ্তানির ওপর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ উভয় ধরনের সামগ্রিক প্রভাব ১০০ কোটি ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে।'

বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিকেএমইএ)-এর নির্বাহী সভাপতি এবং তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক ফজলি শামীম এহসানও একই উদ্বেগের প্রতিধ্বনি করেছেন-'আমরা আশঙ্কা করছি, রপ্তানি ক্ষতি ১ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে।' অন্যদিকে এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ইএবি) দাবি করেছে, এ ঘটনায় প্রাথমিকভাবে ১২ হাজার কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

হযরত শাহজালাল বিমানবন্দরে এবারের অগ্নিকাণ্ড নিয়ে গত ১২ বছরে পাঁচটি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। ২০১৩ সালের ৫ এপ্রিল বিমানবন্দরের কার্গো সেকশনের কুরিয়ার সার্ভিস অংশের একটি গুদামে আগুন লাগে। এরপর ২০১৫ সালের ২০ ডিসেম্বর আবার অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। ২০১৭ সালের ১১ আগস্ট বিমানবন্দরের মূল ভবনের ২ নম্বর টার্মিনালের তৃতীয় তলায় আরেকটি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। ২০২২ সালের ১৪ ডিসেম্বর নির্মাণাধীন তৃতীয় টার্মিনালে দুটি তেলবাহী ট্যাংকারে আগুন ধরে যায়। সে সময়ে ফায়ার সার্ভিস সদস্যরা প্রায় ৪০ মিনিটের চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন।

গত দেড় দশক ধরে অগ্নিদুর্ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে অনেকটা রুটিন ঘটনা। ২০১০ সালের ঢাকার নিমতলী ট্র্যাজেডির কথা এখনো অনেকের স্মৃতিতে গেঁথে আছে। ঘিঞ্জি এলাকায় রাসায়নিক গুদামে বিস্ফোরণ ও আগুনে ১২৪ জন নাগরিকের মৃত্যু ঘটেছিল সেদিন। ২০১২ সালে আশুলিয়ার তাজরীন ফ্যাশন কারখানায় আগুনে প্রাণ হারান কমপক্ষে ১১৭ শ্রমিক।

২০১৯ সালে চকবাজারের চুড়িহাট্টা অগ্নিকাণ্ডে ৭১ জনের মৃত্যু, ২০২১ সালে নারায়ণগঞ্জের হাশেম ফুড কারখানায় আগুন, যেখানে ৫৪ জন শ্রমিকের জীবন শেষ হয়। এই ঘটনাগুলোর পর কয়েকটি মানবাধিকার ও শ্রমিকসংগঠন জনস্বার্থে মামলা করেছিল। তাজরীন, নিমতলী ও হাশেম ফুড ট্র্যাজেডির ঘটনায় সংগঠনগুলোর দায়েরকৃত মামলাগুলোতে মহামান্য হাইকোর্ট রুলও জারি করেছিল। কিন্তু কিছুই হয়নি।

সব সময়ই দেখা যায়, দুর্ঘটনার পর সরকারের পক্ষ থেকে একটা তদন্ত কমিটি করা হয়। দুর্ঘটনা প্রতিরোধে কিছু আশ্বাসও দেওয়া হয়। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয় না। আগুন তার নিয়মেই কিছুদিন পরপর ধেয়ে আসে-বার্তা দেয় ভবিষ্যতের আগুনের।

আরো একটা কাজ হয়-দুর্ঘটনার দায় প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক শক্তির ওপর চাপিয়ে বিবৃতি প্রদান। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। বিমানবন্দরের অগ্নিকাণ্ডের পর পরই সরকার নিয়মমাফিক বিবৃতি দিয়েছে। ঐ বিবৃতিতে বলা হয়েছে-'নাশকতা বা অগ্নিসংযোগের কোনো বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ পাওয়া গেলে সরকার তাৎক্ষণিক ও দৃঢ় পদক্ষেপ নেবে। কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বা উসকানির মাধ্যমে জনজীবন ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়াকে বিঘ্নিত করার সুযোগ দেওয়া হবে না।'

অনেকে আবার এটাও মনে করছেন, চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবস্থাপনার মতো হযরত শাহজালাল বিমানবন্দর ব্যবস্থাপনাও বিদেশি কোম্পানির হাতে তুলে দেওয়ার অজুহাত সৃষ্টির জন্যই এই অগ্নিকাণ্ড। কাকতালীয়ভাবে, যেদিন বিমানবন্দরে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে, সেদিনই (১৮ অক্টোবর) স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ বিভাগ থেকে এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয় যে, বাংলাদেশ ও ইতালির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মধ্যে ইতালির রোমে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের পক্ষে স্বরাষ্ট্র ও কৃষি উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী (অব.) এবং ইতালির পক্ষে সে দেশের ইন্টেরিয়র মিনিস্টার মাতিও পিয়ানতিদোসি নেতৃত্ব দেন।

বিজ্ঞপ্তিতে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার বরাত দিয়ে জানানো হয়, বাংলাদেশের অগ্নিদুর্ঘটনায় তদন্তসক্ষমতা বাড়াতে ইতালি প্রযুক্তিগত সহায়তা ও প্রশিক্ষণ প্রদানের আশ্বাস দিয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই সরকারের এই বিজ্ঞপ্তি বিরোধী মহলের অভিযোগকে আরো সংহত করতে সহায়ক ভূমিকা রাখবে।

দুর্ঘটনা দুর্ঘটনাই। এটি কখনো বলেকয়ে ঘটে না। কিন্তু নিয়মিত বিরতিতে যখন দুর্ঘটনা ঘটতে থাকে, তখন একে আর দুর্ঘটনা হিসেবে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশে যে অগ্নিদুর্ঘটনা ঘটে চলেছে, তাকেও হালকাভাবে নেওয়ার কোনো কারণ নেই। লক্ষণীয় বিষয় এই যে, আওয়ামী লীগ শাসনামলে যতবারই এই ধরনের ঘটনা ঘটেছে, সরকার তাতে নাশকতার সন্দেহ করেছে। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারও নাশকতার সন্দেহ করছে। যদিও দুই সরকারের সন্দেহের তীর দুই দিকে ধাবমান, একটা বিষয়ে অন্তত মিল আছে-দুই পক্ষই এ জাতীয় ঘটনায় ষড়যন্ত্রের গন্ধ পাচ্ছেন।

তাহলে কি কোনো তৃতীয় শক্তি বাংলাদেশকে একটি ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত করার জন্য কাজ করছে? যেমনটি তারা করেছে আফগানিস্তান, সোমালিয়া, কঙ্গো বা দক্ষিণ সুদানের ক্ষেত্রে? আগুনের ইঙ্গিত কোন দিকে?

লেখক: সাবেক জাতিসংঘ কর্মকর্তা ও কলাম লেখক