শিক্ষকের মর্যাদা রক্ষা : আমাদের করণীয়

গ্রিক দার্শনিক এরিস্টটল বলেছেন-"Those who educate children well are more to be honored than parents, for these give only life, those the art of living well.'
শিক্ষকদের সব সময় সর্বজনীনভাবে যথোপযুক্ত সম্মান করতে না শিখলে জাতি হিসেবে আমরা অন্ধকারে নিমজ্জিত হব: শিক্ষার্থীরা বঞ্চিত হবে আদর্শগত শিক্ষা থেকে এবং উচ্ছৃঙ্খল ও নীতিহীন সমাজের দিকে ধাবিত হবে পুরো সামাজিক ব্যবস্থা। ফলস্বরূপ ভালো মানুষ, সুনাগরিক, দায়িত্ব পালনে সক্ষম নেতৃত্ব গড়ে উঠতে প্রতিকূলতা সৃষ্টি হবে। যে সমাজে শিক্ষক অবহেলিত, সে সমাজে উন্নয়ন আশা করা যায় না; কারণ শিক্ষকরাই আলোকিত উদীয়মান সমাজ গঠনের বীজ বপন করেন। শিক্ষা যদি জাতির মেরুদণ্ড হয়, তাহলে যে জাতি শিক্ষকের মর্যাদা নিশ্চিত করবে, সে জাতির আলোকিত ভবিষ্যৎ নিশ্চিত।

একজন শিক্ষক শুধু শ্রেণিকক্ষের অভ্যন্তরে শিক্ষার্থীকে পাঠ্যপুস্তকভিত্তিক জ্ঞান প্রদান করেন না, পাঠ্যপুস্তক ও সিলেবাস-বহির্ভূত যে জীবনবোধ, জীবনের আদর্শ, মূল্যবোধ, মনুষ্যত্ববোধ-এসবের মাধ্যমে শিক্ষার্থীর মধ্যে আদর্শের উন্মেষ ঘটান একজন শিক্ষক। পরিবারে পিতামাতার পর একজন শিক্ষার্থীর জীবনে সবচেয়ে বড় অভিভাবক হলেন শিক্ষক। কাজেই একজন শিক্ষকের দায়িত্বভার যেমন বেশি, ঠিক তেমনি সামাজিকভাবে তার পেশার গুরুত্ব ও মর্যাদাও অতুলনীয়। একজন শিক্ষার্থীর মধ্যে মানবিকতাবোধ, নৈতিকতাবোধ ও সুকুমারবৃত্তি চর্চার ক্ষেত্রে পিতামাতা, শিক্ষকসহ সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

একজন শিক্ষার্থী একাডেমিক পরীক্ষায় সর্বোচ্চ নম্বর পেয়ে মেধার ভিত্তিতে সার্টিফিকেট অর্জন করে সফলতা লাভ করলেও মানুষ হিসেবে যদি তার মধ্যে মনুষ্যত্ববোধ ও বিবেকবোধ না থাকে, তাহলে সে মানুষ হিসেবে সার্থকতা লাভ করতে পারেনি। একজন শিক্ষিত মানুষ তার ব্যবহার, কথাবার্তা, আচার-আচরণে বিনয়ী ও মার্জিত হয়। শিক্ষকের প্রতি অসম্মান প্রদর্শন করা, অশালীনভাবে কথা বলা, অবজ্ঞাসূচক ব্যবহার প্রদর্শন-একজন শিক্ষার্থীর কাছ থেকে কোনোভাবেই কাম্য নয়। সম্প্রতি, কতিপয় শিক্ষার্থীর এ ধরনের অশোভন আচরণের পাশাপাশি খারাপ ও কটূক্তিপূর্ণ ভাষায় শ্লোগান দেওয়া নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপারে পরিণত হয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়ার কারণে এগুলো মহামারির মতো ছড়িয়ে পড়েছে দ্রুত গতিতে। সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠের শিক্ষার্থীদের এসব আচরণ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। শিক্ষিত বিবেকবোধসম্পন্ন সব মানুষ শঙ্কা প্রকাশ করছেন, ব্যথিত হচ্ছেন। যে শিক্ষার্থীরা এহেন কাজ করছে, তাদের অভিভাবকরা কীভাবে বিষয়টি দেখছেন, অথবা শিক্ষকদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করছেন কিনা অজানা।

শুধু শিক্ষকই নয়-বরং পিতামাতা, আত্মীয়স্বজন, বড়-ছোট তথা মানুষ হয়ে মানুষের সঙ্গে কীভাবে ব্যবহার করতে হবে-এটা যদি আমরা না শিখতে পারি, তাহলে বিদ্যার্জনের মূল উদ্দেশ্য চরমভাবে ব্যাহত হবে এবং অর্জিত জ্ঞান হবে ভিত্তিহীন, অন্তঃসারশূন্য। কথিত আছে 'ব্যবহার বংশের পরিচয়', তবে এটা শিক্ষারও পরিচয় বহন করে। দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠে জ্ঞানার্জন করে যদি কেউ বিবেকবোধসম্পন্ন মানুষ হতে না পারে, তাহলে এ বিষয়টি গভীর চিন্তার উদ্রেক করে। পবিত্র হাদিস গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে-'তোমাদের মধ্যে তারাই সর্বোত্তম, যাদের চরিত্র ও আচার-ব্যবহার সবচেয়ে ভালো' (বুখারি: ৬০৩৫)। এজন্য শুধু শিক্ষার্থী নয়, বরং সব মানুষেরই মার্জিত আচার-ব্যবহারে দীক্ষিত হওয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

শিক্ষকের প্রতি শিক্ষার্থীর মধ্যে কোনো কারণে বিরূপ মনোভাব তৈরি হতে পারে, কিন্তু এর বহিঃপ্রকাশ কীভাবে করতে হবে, শিক্ষার্থীদের সে আদব ও জ্ঞান থাকার প্রয়োজন রয়েছে। এ ধরনের পরিস্থিতি যে কোনো সমাজেই হতে পারে; তবে তার সমাধান সামাজিক ও সংস্কৃতিগতভাবে প্রচলিত নিয়মানুযায়ী করা বাঞ্ছনীয়। আমেরিকান লেখক আনিতা হিল তার বই 'Speaking Truth to Power'-এ উল্লেখ করেছেন যে, তিনি Oral Roberts University তে একমাত্র নারী এবং আফ্রিকান-আমেরিকান শিক্ষক ছিলেন। সেখানে কিছু শিক্ষার্থী আদর্শিক ও ধারণাগত মত-পার্থক্যের কারণে তাকে পাঠদানে সহযোগিতা করত না। মূলত বর্ণবৈষম্যের কারণে এবং নারী শিক্ষক হিসেবে শিক্ষার্থীদের কর্তৃত্বের ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করাই ছিল এর মূল কারণ। পরবর্তী পর্যায়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকর্মী ও স্টাফদের সহযোগিতায় বর্ণবৈষম্যের দ্বিচারী আচরণ থেকে মুক্ত হয়ে তিনি নিজেকে শিক্ষক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছিলেন। হয়তো-বা শিক্ষার্থীরা তাদের ভুলও বুঝেছিল। কিন্তু আমাদের সমাজে এ ধরনের আচরণের যে প্রকটতা এবং ভুল সংশোধিত না হওয়ার যে প্রবণতা রয়েছে, তা পীড়াদায়ক। সুন্দর সম্পর্ক স্থাপন করার জন্য তুল স্বীকার করার মানসিক পরিপক্কতা অর্জন করা খুব প্রয়োজন। এটাও প্রকৃত শিক্ষার বহিঃপ্রকাশ। অধৈর্য, অসহিষ্ণুতা, অস্থিরতা সব সময় ভালো ব্যবহারের অন্তরায়। ধৈর্যধারণ ও ক্ষমা করতে পারার মহৎ গুণের শিক্ষালাভ করাও অত্যন্ত প্রয়োজন। পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ ধৈর্য ধারণ করার জন্য নির্দেশনা দিয়েছেন- 'নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গে আছেন'- (আল-বাকারা ২: ১৫৩)।

লক্ষণীয় যে, আমাদের শিক্ষার্থী ও সন্তানেরা জীবনের কোনো একটা পর্যায়ে এসে শুধু শিক্ষকই নয়, বরং পিতামাতা বা গুরুজনদের সঙ্গে যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করতে ব্যর্থ হচ্ছে। এর জন্য শিক্ষার্থীকে সমাজ নেতিবাচকভাবে মূল্যায়ন করবে-এটাই স্বাভাবিক। তবে এ সন্তানকে যে পিতামাতা লালন-পালন ও পারিবারিক শিক্ষা দিয়ে বড় করেছেন এবং যে শিক্ষকবৃন্দ তাকে জীবনের বিভিন্ন স্তরে জীবনবোধের শিক্ষা দিয়েছেন, তাদের ভূমিকাও প্রশ্নবিদ্ধ। একজন শিক্ষকের মূল্যায়ন শুধু তার উচ্চতর ডিগ্রি, পাঠদানের পদ্ধতি এবং জানচর্চার মধ্যে সীমিত করা যাবে না, বরং তিনি তার শিক্ষার্থীদের শিষ্টাচার, ব্যবহার, মানবিক গুণাবলিতে গড়ে তুলতে পারছেন কিনা, সেটাও বিবেচ্য বিষয়। আমাদের মনে রাখতে হবে-শিক্ষার ভিত্তিসমূহের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে শিষ্টাচার, নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধ, যা মূলত পাঠ্যপুস্তকবহির্ভূত। পারিবারিক, সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সমন্বয়ে এই ভিত্তি মজবুতভাবে গড়ে ওঠে।

একজন মেধাবী উচ্চশিক্ষিত মানুষ স্বার্থান্বেষী মহলের প্ররোচনার ফলে স্বাধীনভাবে চিন্তা করার শক্তি হারিয়ে ফেলতে পারে। আর চিন্তাশক্তির স্বাধীন চর্চা না-থাকলে একজন শিক্ষিত মানুষও জ্ঞানহীনতা, নির্বুদ্ধিতা বা মুর্খতায় নিমজ্জিত হয়; তখন খুব সহজেই সে অন্যের ব্যক্তিস্বার্থ বা গোষ্ঠীস্বার্থের কার্যক্রম বাস্তবায়নের মূল হাতিয়ারে পরিণত হয়। মানবিক মূল্যবোধ বিসর্জন দিয়ে সে হয়ে যায় নির্জীব, চিন্তাশক্তিহীন, অসাড় মানব। আমাদের শিক্ষার্থীরা এমন স্বাধীন চিন্তাশক্তিহীন, মানবিক মূল্যবোধহীন যেন না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখা প্রয়োজন। একজন স্বাধীন চেতনাসম্পন্ন শিক্ষার্থী বা বিবেকবান মানুষ কখনো শিক্ষকের সঙ্গে খারাপ আচরণ করতে পারে না। জ্ঞান ও স্বাধীন চিন্তাচেতনা যেমন চর্চার মাধ্যমেশানিত হয়, তেমনি নির্বুদ্ধিতা, অসহিষ্ণুতা, মুর্খতাও নিজের অভ্যন্তরে অজান্তে লালিত হয় এবং বিভিন্ন ঘটনাক্রমে প্ররোচনার মাধ্যমে তার বহিঃপ্রকাশ ঘটে। কবি শেখ ফজলল করিম লিখেছেন-'রিপুর তাড়নে যখনই মোদের বিবেক পায় গো লয়, আত্মগ্লানির নরক-অনলে তখনই পুড়িতে হয়'। বিবেকহীন মানুষ নীতিহীন কাজ করার পরও আত্মগ্লানিতে জর্জরিত হবে না, যদি না তার মধ্যে আত্মোপলব্ধি জাগ্রত হয়। আর এই আত্মোপলব্ধি জাগ্রত করার একমাত্র মাধ্যম হচ্ছে নিজস্ব চিন্তাচেতনায় সঠিক শিক্ষাকে ধারণ করা, চিন্তাশক্তির সক্ষমতাকে স্বাধীন রাখা। সুন্দর উপদেশের মাধ্যমে অনেকে উপলব্ধি করতে শেখেন, নিজেকে শুধরে নেন। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তার নবিকে উপদেশ দেওয়ার জন্য নির্দেশনা দিয়েছেন 'এবং উপদেশ দাও, নিশ্চয় উপদেশ মুমিনদের উপকারে আসে' (আজ-জারিয়াত ৫১:৫৫)। শিক্ষকসহ সবাইকে পারিবারিক ও সামাজিকভাবে সঠিক উপদেশ প্রদানের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের সঠিক পথে পরিচালনা করার প্রয়াস বর্তমানে অতি প্রয়োজন।

পিতামাতা, ছোট-বড়, ধনী-গরিব কোনো ভেদাভেদ না করে একজন শিক্ষার্থীর বিবেকবোধসম্পন্ন মানুষ হয়ে অন্যদের সঙ্গে মানবিক আচরণ করা প্রয়োজন; যেখানে সহনশীলতা, ধৈর্য, বিনয় কোনো কিছুর অভাব থাকবে না। এটা পারিবারিক, সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে গণ্য করে যথেষ্ট গুরুত্বের সঙ্গে আমাদের জীবনে প্রয়োগ করা দরকার। কাজেই মনুষ্যত্ববোধসম্পন্ন এবং বিবেকবান মানুষ হিসেবে আমাদের পরবর্তী প্রজন্মকে তৈরি করার কোনো বিকল্প নেই। মানবিক গুণাবলিসম্পন্ন সচেতন একজন মানুষ কখনো অন্যের স্বেচ্ছাচারী কর্মকাণ্ড ও হীনস্বার্থ চরিতার্থ করার সহায়ক হবে না। এই মানুষ গড়ার কর্মযজ্ঞে শিক্ষকের পাশাপাশি পিতামাতা, গুরুজন ও সমাজের সর্বস্তরের নিঃস্বার্থ অংশগ্রহণ প্রয়োজন। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আমাদের শিক্ষার্থী ও সন্তানেরা যখন ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে উঠবে, তখনই সেখানে একজন শিক্ষক সার্থক, পিতামাতা সার্থক। 'শিক্ষাগুরুর মর্যাদা' কবিতার শেষ লাইনের মতো শিক্ষক তখন সব অভিভাবকের প্রতি তুষ্ট হয়ে বলবেন-'সত্যিই তুমি মহান উদার, বাদশাহ আলমগীর'।

লেখক: বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একজন কর্মকর্তা এবং বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস-এর উপাচার্য।