সাজেকের উঁচু-বাঁকা সড়ক যেন মৃত্যু ফাঁদ

‘সাজেক’ বাংলাদেশের একটি জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র। এটি রাঙামাটি জেলার বাঘাইছড়ি উপজেলার একটি ইউনিয়ন। এটি ‘মেঘের রাজ্য’ নামে বেশ পরিচিতি এবং পাহাড়ের উপর দাড়িয়ে মেঘের লুকোচুরি খেলা দেখার জন্য বিখ্যাত। সাজেক দেশের সবচেয়ে বড় ইউনিয়ন এবং এখানে লুসাই, পাংখোয়া, ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর বসবাস। পর্যটন নগরী সাজেক রাঙামাটি জেলার অন্তর্গত হলেও এখানে যেতে হলে পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়ি মাড়িয়ে যেতে হবে।

সড়ক পথে খাগড়াছড়ি থেকে সাজেকের দূরত্ব প্রায় ৭০কিলোমিটার। খাগড়াছড়ির দীঘিনালা থেকে ৪৯কিলোমিটার এবং রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার বাঘাইহাট থেকে দূরত্ব ৩৪কিলোমিটার।

সাজেকের মূল যে স্থানে পর্যটক বহনকারী যানগুলো দুর্ঘটনার শিকার হয় সেটি হলো ‘রুইলুই’ পর্যটন কেন্দ্র। রুইলুই পাড়াকে কেন্দ্র করে সাজেকের পর্যটন কেন্দ্র গড়ে উঠেছে। এ পাড়াটি সমুদ্র পৃষ্ট থেকে এক হাজার ৭২০ফুট উঁচুতে অবস্থিত। 

অর্থাৎ সিজকছড়া থেকে যখন পর্যটক বহনকারী গাড়িগুলো উঁচু এবং বাঁকা সড়ক মারিয়ে রুইলুই  পর্যটন কেন্দ্রে উঠে অথবা রুইলুই পর্যটন কেন্দ্রে থেকে যখন পর্যটক বহনকারী গাড়িগুলো নেমে আসে তখনি অনেক পর্যটক বহনকারী গাড়িগুলো ওই সড়কে গাড়ি চালানোর দক্ষতার অভাবে অথবা গাড়ির ত্রুটির কারণে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে দুর্ঘটনার কবলে পড়ে। গাড়িগুলো পাহাড়ি খাদে পড়ে যাওয়ার কারণে প্রতি বছর অসংখ্য পর্যটক নিহত হয় এবং জানমালের ব্যাপক ক্ষতি হয়।

এডভেঞ্চার প্রেমী পর্যটকরা পাহাড়ি সড়ক সম্পর্ক সম্যক ধারণা না নিয়ে নিজেদের ব্যক্তিগত গাড়ি এবং মোটরসাইকেল নিয়ে উঁচু এবং বাঁকা সড়কে গাড়ি চালাতে গিয়ে নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে না পেরে দুর্ঘটনায় পতিত হয়।

‘রুইলুই’ পাড়া থেকে কংলাক পাহাড়ে সড়ক পথে যাওয়া যায়। এটি সাজেকের আরেকটি পর্যটন স্পট। এই সড়ক পথটি প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখার জন্য খুব বিখ্যাত। এ পাড়াটি সমুদ্র পৃষ্ট থেকে প্রায় এক হাজার ৮০০ফুট উঁচুতে অবস্থিত। রুইলুই থেকে কংলাক পাড়ায় যেতে উঁচু এবং বাঁকা সড়ক কম থাকায়  সড়ক পথে তেমন দুর্ঘটনা ঘটে না।

গণমাধ্যমে প্রকাশিত এবং পুলিশের তথ্য মতে, ‘‘চলতি বছরে গত ০৭জানুযারী সাজেক পর্যটন কেন্দ্রের সিজকছড়া এলাকায় পর্যটকবাহী চান্দের গাড়ি (জীপ গাড়ি) সাজেক থেকে ফেরার পথে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে গভীর পাহাড়ি খাদে পড়ে ১২ জন পর্যটক আহত হয়েছিলো। 

গত ২৭জানুয়ারী বাঘাইহাট-সাজেক সড়কের এগুজ্জেছড়ি এলাকায় পর্যটকবাহী চান্দের গাড়ি (জীপ গাড়ি) উল্টে আটজন পর্যটক আহত হয়েছিলো। 

গত ১০এপ্রিল বাঘাইহাট সাজেক সড়কের কিয়াংঘাট এলাকায় পর্যটকবাহী শান্তি পরিবহনের বাস ও মাহিন্দ্র পিকআপ গাড়ী মুখোমুখি সংঘর্ষে মাহিন্দ্রা গাড়ির চালকসহ সাতজন গুরুতর আহত হয়েছিলেন।  

গত ১৭সেপ্টেম্বর সাজেক পর্যটন কেন্দ্র থেকে ফেরার পথে হাউজ পাড়া এলাকায় পর্যটক বহনকারী চান্দের গাড়ি (জীপ গাড়ী) নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পাহাড়ি খাদে পড়ে গেলে পর্যটক রিংকি নামের খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের (খুবি) এক শিক্ষার্থী নিহত হয়েছিলেন। এ ঘটনায় আহত হয়েছিলেন আরও ১২ পর্যটক।’’

‘‘গত বছরের ০৮ ফেব্রুয়ারি সাজেকের হাউজ পাড়ায় উঁচু টিলায় উঠার সময় ১৩ আনসার ব্যাটালিয়নের গাড়ি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে উল্টে আনসারের ছয় সদস্য আহত হয়েছিলো।

গত বছরের ২৪ এপ্রিল সাজেকের উদয়পুর সীমান্ত সড়কে নির্মাণ কাজে যাওয়ার সময় ডাম্প ট্রাক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পাহাড়ের গভীর খাদে পড়ে গেলে ঘটনাস্থলে পাঁচজন এবং হাসপাতালে আসার পথে তিনজন এবং চিকিৎসাধীন অবস্থায় একজন শ্রমিক মারা যায়। এ ঘটনায় মোট নয়জন শ্রমিক মারা গিয়েছিলো।

গত বছরের ০৭ডিসেম্বর সাজেক পর্যটন কেন্দ্র থেকে ফেরার পথে পর্যটক বহনকারী চান্দের গাড়ি (জীপ গাড়ি)  উল্টে পাহাড়ি খাদে পড়ে গিয়ে ১০ পর্যটক আহত হয়েছিলো।’’

গত বছর এবং চলতি বছর মিলে সাজেকে সড়ক দুর্ঘটনায় ১০জন নিহত এবং ৫৫জনের অধিক মানুষ আহত হয়েছিলো। 

প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে দীঘিনালা-সাজেক সড়কে পাহাড় ধসের কারণে সাজেকের সাথে সারাদেশের সড়ক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে পড়ে। এছাড়াও বর্ষা মৌসুমে মাইনী নদীর পানি বেড়ে গেলে সাজেকের হাজাছড়া, ফরেস্ট কলোনি এবং খাগড়াছড়ির দীঘিনালা উপজেলার কবাখালী এলাকার সড়ক নদীর পানিতে তলিয়ে যায় এবং সাজেকের সাথে সারা দেশের সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। 

সাজেকে বেড়াতে আসা পর্যটক মোজাম্মেল হক বলেন, আমি পুরো পরিবার নিয়ে ঢাকা থেকে সাজেকে বেড়াতে এসেছি। আমারও নিজের গাড়ি আছে। কিন্তু সাজেকে নিজের গাড়ি আনতে সাহস করেনি। কারণ পাহাড়ি সড়ক সম্পর্কে আমার কোন ধারণা নেই।

আরেক পর্যটক শাহেদ আলী বলেন, আমি মনে করি বেড়াতে এসে জীবন ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিয়ে কি লাভ। যে সড়কে সম্পর্কে আমার কোন অভিজ্ঞতা নেই সেই সড়কে গাড়ি না চালালে ভাল।

চট্টগ্রাম থেকে বেড়াতে আসা পর্যটক নুরুল হুদা বলেন, আমি আমার মোটরবাইক নিয়ে সাজেক এসেছি। পুরো দেশে মোটরবাইক নিয়ে ঘুরি। এ সড়কে পূর্বের অভিজ্ঞতা আছে বলে নিজের মোটরসাইকেল নিয়ে বেড়াতে এসেছি। যেহেতু সড়কটি উঁচু-বাঁকা। তাই যারা এ সড়কে অভিজ্ঞ নয়  তারা যেন নিজের গাড়ি নিয়ে এখানে না আসার পরামর্শ দেন তিনি।

খাগড়াছড়ি সড়ক পরিবহন জীপ মালিক সমিতি সাজেক কাউন্টারের দায়িত্বে থাকা মো. আরিফ বলেন, দুর্ঘটনার মূল কারণ হলো বাইরে থেকে আসা পরিবহনগুলোর চালকরা পাহাড়ি সড়ক সম্পর্কে কোন ধারণা থাকে না। এছাড়াও তিন চাকার মাহিন্দ্র গাড়িগুলো দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। কারণ গাড়িগুলো পাহাড়ি গিরিপথের সড়কে উঠতে এবং নামতে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পেলে। যে কারণে প্রায় সময় সাজেকে দুর্ঘটনা লেগে থাকে এবং অসংখ্য পর্যটক নিহত ও আহত হন।

তিনি বলেন, দুর্ঘটনা এড়াতে পাহাড়ি সড়ক সম্পর্কে অজানা এমন কোন চালক যেন পর্যটক নিয়ে সাজেকে না আসে এবং এ গুরুত্বপূর্ণ সড়কে দুর্বল এবং ছোট গাড়ির চলাচল সীমিত করতে হবে। তাহলে দুর্ঘটনা অনেকাংশে কমানো যাবে।

খাগড়াছড়ি সড়ক জনপদ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মাকসুদুর রহমান বলেন, খাগড়াছড়ি থেকে দীঘিনালা সড়ক সাজেকের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সকল প্রকার দুর্ঘটনা এড়াতে খাগড়াছড়ি-দীঘিনালা সড়ক প্রশস্তকরণের কাজ হাতে নেওয়া হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, দীঘিনালা থেকে সাজেক পর্যন্ত সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ারিং কন্সট্রাকশন ব্রিগেড (ইসিবি) দেখাশুনা করেন। সড়ক উন্নয়নে আমরা তাদের ফান্ড দিয়ে থাকি।