অসংক্রামক ব্যাধি ও জনস্বাস্থ্যের সুরক্ষা

দেশের ৪ কোটি মানুষ থাইরয়েড সমস্যায় ভুগিতেছে। আক্রান্তের ৬০ শতাংশ রহিয়াছে চিকিৎসার বাহিরে। ইত্তেফাকে প্রকাশিত এই রিপোর্ট হইতে আমাদের জনস্বাস্থ্যের একটি করুণ চিত্র ফুটিয়া উঠিয়াছে। আমাদের দেশের জনসংখ্যা প্রায় ১৮ কোটি। তাহার মধ্যে ৪ কোটি মানুষ যদি একটি রোগে আক্রান্ত হইয়া থাকে, তাহা হইলে এই রোগ নিরাময় ও প্রতিরোধে আমাদের সকলের কি ঝাঁপাইয়া পড়া উচিত নহে? শুধু তাহাই নহে; হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, হাইপ্রেশার, কিডনি রোগ, ক্যানসার, শ্বাসকষ্টসহ বিভিন্ন জটিল ও অসংক্রামক ব্যাধি আমাদের দেশের মানুষকে কাবু করিয়া ফেলিতেছে। একটি জাতি কীভাবে উন্নতি লাভ করিবে এবং উৎপাদনশীলতা বাড়াইবে, যদি তাহার নাগরিকগণ প্রায়শ অসুস্থ থাকেন? তাই জনস্বাস্থ্য রক্ষার বিষয়টিকে আমাদের সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়া বিবেচনা করা উচিত।

বাংলাদেশের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের ওয়েবসাইট হইতে জানা যায়, বাংলাদেশে প্রায় ৩ কোটি ৮০ লক্ষ মানুষ কিডনি রোগে আক্রান্ত। প্রায় ১ কোটি ৮০ লক্ষ মানুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। ২ লক্ষ মানুষ আক্রান্ত ক্যানসারে। ইহা ছাড়া প্রতি বৎসর প্রায় ৩ লক্ষ মানুষ মারা যাইতেছে হৃদরোগে। এই চিত্রটি কি ভয়াবহ নহে? স্বাস্থ্য জরিপ অনুযায়ী দেশের শহর ও গ্রামে বসবাসকারী ১৮ থেকে ৫০ বছর বয়সি নারীর মধ্যে প্রায় ৪০ শতাংশই হাইপোথাইরয়েডিজম বা হাইপারথাইরয়েডিজমে আক্রান্ত: কিন্তু তাহাদের অনেকেই জানেন না যে, তাহারা এই সমস্যায় ভুগিতেছেন। এই জন্য বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলিতেছেন-বয়ঃসন্ধিকালে, নারীদের গর্ভধারণের আগে, শিশুর জন্মের পরে এবং নারীদের বয়স ৪০ হওয়ার পর থাইরয়েড হরমোনের পরীক্ষা করা জরুরি। নিয়মিত চিকিৎসা না লইলে থাইরয়েড হইতে সৃষ্টি হইতে পারে ক্যানসারও। গবেষকরা ইহাও বলিতেছেন যে, প্রতি তিন জন নারীর মধ্যে একজন কোনো না কোনো থাইরয়েড সমস্যায় ভুগিতেছেন। ইহাতে বন্ধ্যত্ব, গর্ভপাত, ত্রুটিযুক্ত শিশুর জন্মদানসহ নানা সমস্যা দেখা দিতেছে। এমন একটি রোগের মোকাবিলায় সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালসমূহে, বিশেষত নারীদের থাইরয়েড পরীক্ষানিরীক্ষা সহজ করা আজ জরুরি হইয়া পড়িয়াছে।

নীরব স্বাস্থ্যঝুঁকি হিসাবে থাইরয়েড, ডায়াবেটিসসহ যেই সকল অসংক্রামক রোগ আমাদের দেশে ক্রমে মহামারি আকার ধারণ করিতেছে, সেই ব্যাপারে মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করা আবশ্যক। এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী উন্নয়নশীল দেশগুলিতে প্রতি ১০টি মৃত্যুর মধ্যে সাতটির কারণ এই সকল রোগ। বাংলাদেশে কর্মক্ষমতা হ্রাসের পশ্চাতে এই সকল রোগ দায়ী ৬১ শতাংশ। আবার এক জরিপ অনুযায়ী ৯৯ শতাংশ মানুষের অন্তত একটি এবং প্রায় ২৯ শতাংশ মানুষের তিনটিরও অধিক অসংক্রামক রোগ রহিয়াছে। এই জন্য এই সকল রোগ-ব্যাধি সম্পর্কে জনগণের মধ্যে সচেতনতা তৈরি, সঠিক খাদ্যাভ্যাস ও নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা-এই তিন বিষয়কে গুরুত্ব দিয়া অগ্রসর হওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করিয়া বাঙালির খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন করা অত্যাবশ্যক। যেইভাবে ঘরে-বাহিরে, রাস্তাঘাটে, ফুটপাথে, রেস্টুরেন্টে ভেজাল ও অস্বাস্থ্যকর খাবারের সয়লাব দেখা যাইতেছে, তাহা বন্ধ করা প্রয়োজন।

অতিরিক্ত চিনি, লবণ, তৈল, চর্বি ইত্যাদি পরিহার করা বাঞ্ছনীয়। পথেঘাটে ভাজাপোড়া তথা ট্রান্সফ্যাট-সমৃদ্ধ খাবারের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করা প্রয়োজন। সরকার এই ব্যাপারে কোনো উদ্যোগ না নিলে সাধারণ মানুষও সচেতন হইবে না। এমনকি হাসপাতালগুলোতেও তথাকথিত চটকদার, ফাস্টফুড, প্রক্রিয়াজাত, প্যাকেটজাত এক কথায় অস্বাস্থ্যকর খাবারের ছড়াছড়ি লক্ষ করা যাইতেছে, যাহা দুঃখজনক। আমরা কি জনগণকে এই সকল খাবারের ব্যাপারে সচেতন না করিয়া পাড়ায় পাড়ায় হাসপাতাল গড়িয়া তুলিব কিংবা তাহাতে উৎসাহ প্রদান করিব? আমরা কথায় কথায় বলি, প্রিভেনশন ইজ বেটার দ্যান কিউর-তথা প্রতিকারের চাইতে প্রতিরোধ উত্তম; কিন্তু জনস্বাস্থ্য রক্ষায় এই নীতি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল কতটা মানিয়া চলে, তাহা লইয়া আমরা সন্দিহান।

মোটকথা, কীভাবে রোগ প্রতিরোধ করা যাইবে, সেই ব্যাপারে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ, ডাক্তার, নার্স, টেকনিশিয়ানগণ তেমন সোচ্চার নহেন। মানুষ যাহাতে বিভিন্ন অসংক্রামক রোগ লইয়া বৎসরের পর বৎসর ধুঁকিয়া ধুঁকিয়া না মরেন, এই জন্য কি জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে গবেষণা বৃদ্ধি পাইবে না? আমাদের টেকসই উন্নয়নের প্রতিবন্ধক এই সকল রোগ। অতএব, সামগ্রিকভাবে এই সকল রোগ-ব্যাধি মোকাবিলায় স্বাস্থ্য, অর্থ, যোগাযোগ, কৃষি, খাদ্য, পরিকল্পনা ইত্যাদি মন্ত্রণালয়কে সমন্বয়সাধনপূর্বক একযোগে কাজ করিয়া যাইতে হইবে।