রাষ্ট্রশক্তির আসল উৎস কোথায়—এই প্রশ্নের উত্তর মানবসভ্যতা বহু সহস্রাব্দে খুঁজিয়া পাইয়াছে। উত্তর একটাই—জনগণ। রাজা, সম্রাট, শাসক কিংবা গণতান্ত্রিক নির্বাচনে বিজয়ী নেতা-যেই হউন না কেন, রাষ্ট্রক্ষমতার মূল ভিত্তি জনগণের অনুমোদনেই গঠিত হয়। সেই কারণে, রাষ্ট্র নামক জীবন্ত কাঠামোর প্রাণশক্তি নিহিত আছে নাগরিকের আস্থায় ও তাহার স্বাধীন জীবনযাপনের অধিকারে।
আজিকার পৃথিবীতে কে ক্ষমতায় রহিয়াছে, কোন দল শাসন করিতেছে, বিরোধীরা কোন ধরনের ষড়যন্ত্রে ব্যস্ত-এই সকল বিষয় একটি দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর ‘কাপ অব টি’ নহে। বৃহত্তর জনগোষ্ঠী তথা সাধারণ মানুষ চাহে তাহাদের জীবন চলুক মুক্তভাবে, তাহাদের সন্তান বিদ্যালয়ে যাউক নিশ্চিন্তে নির্বিঘ্নে। সাধারণ জনগণ মুক্তভাবে চলিতে চাহে, বাকস্বাধীনতা তাহার জন্মগত অধিকার। মানুষ রাজনীতির দাবার ঘুঁটি নহে, তাহার যেই মৌলিক অধিকার-তাহার বাস্তবায়নই রাষ্ট্রের প্রধান দায়িত্ব। বস্তুত, সাধারণ নাগরিকের এই সরল অথচ গভীর চাহিদাই রাষ্ট্রের মেরুদণ্ড। যখন কোনো রাষ্ট্রে নাগরিকদের স্বাধীনতা সংকুচিত হইয়া পড়ে, তখন সেই রাষ্ট্রের অস্তিত্বই বিপন্ন হইতে থাকে। ভয়ের উপর প্রতিষ্ঠিত শাসন কখনো স্থায়ী হয় না। যেই শাসক মনে করেন, ভয় দেখাইয়া মানুষকে চুপ করাইয়া রাখা যায়, তিনি ইতিহাসের প্রাথমিক পাঠও গ্রহণ করেন নাই। কারণ, ভয় যত গভীর হয়, বিদ্রোহের অগ্নিও ততই ভিতরে ভিতরে তুষের চাপা আগুনের ন্যায় জ্বলিতে থাকে।
ইহা যুগে যুগে দেখা গিয়াছে যে, রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতার মাপকাঠি কখনই জিডিপি, বাজেটের পরিমাণ বা প্রকল্পের সংখ্যা দ্বারা নিরূপণ করা যায় না। তাহা মাপা যায় নাগরিকের মুখের হাসিতে, তাহার নির্ভয়ে রাস্তায় চলিবার এবং কথা বলিবার স্বাধীনতায়। যেই দেশে নাগরিকের মনে ভয়, মুখে তালা, পথে আতঙ্ক-সেই দেশে ঊর্ধ্বগামিতা নিস্তব্ধ, নিঃসাড় হইয়া পড়ে। রাষ্ট্র তখন আর জনগণের নহে, কেবল কিছু মানুষের সম্পত্তিতে পরিণত হয়। মনে রাখিতে হইবে, বৃহত্তর জনগোষ্ঠী কখনো লুটতরাজের রূপকথা লইয়া পড়িয়া থাকিতে চাহে না। যাহা হইবার তাহা তো ৫৪ বৎসর ধরিয়া হইতেছেই। জনগণ এখন চাহে, স্বাধীনভাবে, মুক্তভাবে চলিতে। নিরাপদে চলাচল করা, কোনো রোষানলে না পড়া জনগণের অধিকার। জনগণ যেইহেতু রাষ্ট্রের মালিক, সুতরাং যাহারা জনগণের এই ধরনের অধিকার দিতে পারে না কিংবা পদে পদে বিঘ্ন ঘটায়, তাহারা জনমানসে ক্রমশ নিন্দনীয় ও ধিক্কৃত হইতে থাকে।
ইতিহাসের প্রতিটি কঠোর শাসকই একসময় বিশ্বাস করিয়াছেন—কঠোরতার মাধ্যমে ও মৌলিক অধিকারকে স্তব্ধ করিবার মাধ্যমে ক্ষমতা কুক্ষিগত করা যায়; কিন্তু ইতিহাসের পাঠ এক ও অভিন্ন-তাহা ফ্রান্সের রাজতন্ত্র, রোমের সাম্রাজ্য, কিংবা বিশ শতকের বিভিন্ন দেশের স্বৈরতন্ত্র-সকল জায়গায় তাহা দৃশ্যমান। অতএব, শাসকদের মনে রাখিতে হইবে-রাষ্ট্রের অস্তিত্ব তাহাদের বল বা কৌশলে নহে, বরং জনগণের আস্থায় প্রতিষ্ঠিত। যেই মুহূর্তে সেই আস্থা হারায়, ক্ষমতা তখন শূন্য মঞ্চের ন্যায় দাঁড়াইয়া থাকে-আলোকমঞ্চ আছে; কিন্তু দর্শক নাই। রাষ্ট্র তখন কেবল যন্ত্রবৎ চলে; আত্মা হারায়। এই জন্য বিশ্বের প্রতিটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের এই সত্য স্মরণে রাখা প্রয়োজন-জনগণের স্বাধীনতাই রাষ্ট্রের মূল স্বাস্থ্য। রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা নির্ভর করে জনগণের মৌলিক অধিকার প্রাপ্তি ও স্বাধীনতার উপর। এই কারণে, নাগরিকের মুখের উপর চাপা দেওয়া তালা যেই দিন খুলিয়া যায়, সেই দিনই রাষ্ট্র সত্যিকারের শক্তিশালী হয়।
সুতরাং রাষ্ট্রের স্থিতি, উন্নয়ন ও মর্যাদা-সকলই নির্ভর করে একমাত্র এই মূলনীতির উপর: ‘জনগণের স্বাধীনতা যত পূর্ণ, রাষ্ট্র তত স্থিতিশীল’। এই চিরন্তন সত্য ভুলিলে রাষ্ট্র অসুস্থ হয় এবং জনগণকে শৃঙ্খল পরাইয়া যে রাষ্ট্রশক্তি রক্ষা করা যায়, তাহা কেবল স্বল্পকালীন; দীর্ঘ মেয়াদে ইহা সর্বনাশ ডাকিয়া আনে। জনগণ একদিন অনিবার্যভাবে তাহার মুক্তির পথ ঠিকই তৈরি করিয়া লয়।